মোহাম্মদপুরে কবরস্থানের ঘাস-বাণিজ্যেও রাজীব!
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০১৯ | ১৩:৪২
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর তারেকুজ্জামান
রাজীব ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে কবরস্থানের ঘাস-গাছ বিক্রির
অভিযোগ পাওয়া গেছে। আবার পশু খামারের মালিকের কাছ থেকে ৯ লাখ টাকা নিয়ে ঘাস
সরবরাহ না করার ঘটনাও আছে। এদিকে, মোহাম্মদপুরের বছিলা রোডের একটি খাল
দখলে নিয়ে ভরাট করে ট্রাকস্ট্যান্ড তৈরি করেছেন গ্রেপ্তারের পর রিমান্ডে
থাকা এই কাউন্সিলর। আর সেই স্ট্যান্ড থেকে তার সহযোগীরা আদায় করেছেন মোটা
অঙ্কের চাঁদা।
মোহাম্মদপুরে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে বসা রাজীবকে গত শনিবার রাতে
রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার একটি বাসা থেকে গ্রেপ্তার করে র্যাব।
রোববার ভাটারা থানায় তার বিরুদ্ধে অস্ত্র ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে
মামলা হয়। ওই দিন মধ্যরাতে তাকে আদালতে হাজির করে দুই মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের
জন্য মোট ১৪ দিনের রিমান্ডে নেয় পুলিশ।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) উপকমিশনার মশিউর রহমান সমকালকে বলেন,
'তারেকুজ্জামান রাজীবকে বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তার
দেওয়া তথ্যগুলো যাচাই-বাছাই করে দেখছে পুলিশ।'
মোহাম্মদপুরের প্রায় সব জায়গায় থাবা বসিয়েছিলেন গ্রেপ্তারের পর বহিস্কৃত
যুবলীগ নেতা রাজীব। স্থানীয় বিভিন্ন মসজিদ, স্কুল ও বাজার কমিটিতে তিনি জোর
করে ঢুকে পড়েছেন অথবা বসিয়েছেন স্বজন ও পছন্দের লোকজনকে। প্রতিষ্ঠানগুলোর
নানা খাতের আয় পকেটস্থ করা ছাড়াও চাঁদা আদায় করেছেন। প্রচুর জায়গা দখলের
অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তার কথা না শুনলে নেমে আসত নির্মম নির্যাতন।
মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধের জাকের ডেইরি ফার্মের মালিক আনোয়ার হোসেন জানান, তার
দুটি খামারে প্রায় ৫০০ গরু আছে। এ জন্য তার পশুখাদ্যের প্রয়োজন হয়।
রায়েরবাজার শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধের পেছনে তৈরি করা নতুন কবরস্থানের
জায়গা থেকে আগে তিনি ঘাস কেটে আনতেন। সেখানে তিনি অনেক গাছও লাগিয়েছিলেন।
রাজীব কাউন্সিলর নির্বাচিত হওয়ার পর তার লোকজন ঘাস কাটতে বাধা দেন। তারা
জানান, এখন কবরস্থান সিটি করপোরেশনের অধীনে। তাই কাউন্সিলরের অনুমতি ছাড়া
কিছু করা যাবে না। এরপর রাজীবের কাছে গেলে তিনি তার সহযোগী শাহ আলমের কাছে
আনোয়ারকে পাঠান। শাহ আলম তাকে স্পষ্ট করে বলে দেন, ঘাস নিতে হলে রাজীবকে
টাকা দিতে হবে। এক বছরের জন্য ১০ লাখ টাকা দাবি করেন তিনি। বাধ্য হয়ে
আনোয়ার এতে সম্মত হন। তিনি নিজে শাহ আলমকে চার লাখ এবং তার পরামর্শ অনুযায়ী
রাজীবের আরেক সহযোগী শাহজাহানকে পাঁচ লাখ টাকা দেন। যুবলীগ নেতা পলাশের
মাধ্যমে শাহজাহানের কাছে টাকা পাঠানো হয়। কিন্তু ঘাস পাননি আনোয়ার। পিকআপ
ভ্যান নিয়ে ঘাস আনতে গেলে তাকে আটকে মামলা দেওয়া হয়। জব্দ করা হয়
পিকআপভ্যান। তবে তাকে ঘাস না দিলেও অন্য খামারির কাছে তা ১২ লাখ টাকায়
বিক্রি করা হয়েছে। এত কিছুর পরও আনোয়ার ভয়ে রাজীব বা তার লোকজনের বিরুদ্ধে
কিছু বলার সাহস করেননি। কারণ, সে ক্ষেত্রে তাকে প্রাণে মেরে ফেলাও অসম্ভব
ছিল না।
আনোয়ার হোসেন আরও জানান, রাজা নামের এক ঠিকাদার মোহাম্মদপুরের ওই
কবরস্থানের ইজারা পেয়েছেন। কিন্তু রাজীবের সহযোগীরা তাকে এলাকায় ঢুকতেই দেয়
না। আর তারা অবৈধভাবে প্রতিটি লাশ দাফনের জন্য অন্তত আট হাজার টাকা করে
আদায় করছে। কবর খোঁড়া, বাঁশ-চাটাইয়ের দাম ও কবরে ঘাস লাগানোর কথা বলে তারা
নিচ্ছে ওই টাকা। রাজীব গ্রেপ্তারের পর থেকে অভিযুক্ত শাহ আলম ও শাহজাহান
এলাকায় নেই। তাদের মোবাইল ফোন নম্বরও বন্ধ রয়েছে।
এদিকে, বছিলা রোডের নামাবাজারসংলগ্ন লাউতলা কালভার্টের নিচে বয়ে যাওয়া
খালটি দখল করেছেন রাজীব। তিনি নির্বাচিত হওয়ার কিছুদিন পর তার সহযোগীরা
খালটি দখলে নিয়ে মাটি ভরাট করে। ফলে বন্ধ হয়ে যায় পানির প্রবাহ। সেখানে গড়ে
তোলা হয়েছে একটি ট্রাকস্ট্যান্ড। এখন সেখানে ট্রাক রাখার ফি বাবদ চাঁদা
আদায় করা হচ্ছে। স্থানীয়দের তথ্যমতে, সেই টাকা নানা হাত ঘুরে রাজীবের
পকেটেই যায়।
