ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২৬

করোনাযোদ্ধা

শেষ বিদায়ে স্বজন হয়ে পাশে দুই সহোদর

শেষ বিদায়ে স্বজন হয়ে পাশে দুই সহোদর
×

আতাউর রহমান

প্রকাশ: ০৭ মে ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ০৭ মে ২০২০ | ১৪:৩২

অন্য প্রান্ত থেকে মোবাইল ফোন রিসিভ করতেই অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেনের শব্দ পাওয়া গেল। পরিচয় দেওয়ার পর মুফতি মোহাম্মদ ফয়সাল বলছিলেন, 'এখন ব্যস্ত আছি, পরে কথা বলব। হাসপাতাল থেকে কল এসেছে, দুইটা লাশ নিয়ে ইফতারের আগে জানাজা-দাফন করতে হবে।' চলমান করোনাভাইরাসজনিত ভয়াবহ সংকট মোকাবেলায় যে যেভাবে পারছেন ভূমিকা রাখছেন। মুফতি মোহাম্মদ ফয়সাল এবং তার ছোট ভাই মুফতি মোহাম্মদ হানজালাও বিশেষ দায়িত্ব পালন করছেন এই সংকটকালে-ভাইরাস সংক্র-মণের আশঙ্কায় কিংবা স্বাস্থ্যবিধি মানতে স্বজনরা যখন শেষ সময়ে প্রিয়জনের পাশে থাকতে পারছেন না, শেষ বিদায়টুকু দিতে পারছেন না, তখন স্বজন হয়ে শেষ বিদায় দিচ্ছেন দুই সহোদর। করোনাভাইরাস সংক্রমণে মৃত ব্যক্তিকে হাসপাতাল থেকে নিয়ে গোসল, জানাজা আর দাফনের কাজ করে চলেছেন তারা।

মোহাম্মদ ফয়সাল ঢাকার মোহাম্মদপুরে আল মারকাজুল ইসলাম থেকে পড়ালেখা শেষ করেছেন। তিনি হাফেজ, মাওলানা এবং মুফতিও। একই প্রতিষ্ঠান থেকে তার ছোট ভাই হানজালাও পেয়েছেন একই সনদ। তাদের বাড়ি শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলায়।

মুফতি ফয়সাল বলছিলেন, দেশে করোনা আক্রান্ত হয়ে যখন মানুষ মরতে শুরু করল, তখন আতঙ্কে আপনজনও পাশে যাচ্ছিল না। টেলিভিশনে এমন দৃশ্য দেখে তার মন কেঁদে ওঠে। তিনি সিদ্ধান্ত নেন, মানুষের এমন দুঃসময়ে পাশে থাকবেন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে। বিষয়টি তিনি তাদের প্রতিষ্ঠান প্রধানকে জানালে মানুষের শেষ বিদায়ে সেবা করার সুযোগ পান তিনি। এমন মহৎ কাজে তার ছোট ভাইও যোগ দেন তার সঙ্গে।

ফয়সাল বলছিলেন, শুরুর দিকে তারা কয়েকজন হাসপাতাল থেকে লাশ নিয়ে ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী গোসল, জানাজা দাফন দিতেন। কিন্তু দিন দিন লাশের সংখ্যা বাড়ছে। এ জন্য তাদের প্রতিষ্ঠান থেকে এসব কাজের জন্য দুটি টিম করা হয়েছে। প্রতি টিমে সাতজন করে সদস্য রয়েছেন। দু'জন করে নারী সদস্যও রয়েছেন এতে। তারা সবাই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, আইইডিসিআর এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত প্রশিক্ষকদের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। সরকারের পক্ষ থেকে তাদের সব ধরনের সুরক্ষা সামগ্রী দেওয়া হচ্ছে।

নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে মুফতি ফয়সাল বলছিলেন, এ পর্যন্ত তিনি প্রায় দেড়শ' মৃত ব্যক্তির জানাজা থেকে দাফন পর্যন্ত সব কার্যক্রমে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। একাধিক ঘটনার বিবরণ দিয়ে তিনি বলেন, নিজেকেই ওই লাশের স্বজন ভেবে শেষ বিদায় জানান তিনি।

একটি অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে মুফতি ফয়সাল বলেন, ঢাকার একটি হাসপাতাল থেকে ফোন এসেছিল হিন্দু ধর্মাবলম্বী একজন মৃত ব্যক্তির দেহ নিতে হবে। তিনি তখন কী করবেন বুঝতে পারছিলেন না। এ সময় তাদের সিনিয়র মুফতিরা বসে সিদ্ধান্ত দেন, মহামারিতে অন্য ধর্মের কেউ মারা গেলেও সৎকার করা মানবিক কাজ। তিনি তখন লাশটি গ্রহণ করে চিতা পর্যন্ত পৌঁছে দেন। এ পর্যন্ত ২০-২৫ জন হিন্দু ব্যক্তির মরদেহ পোস্তগোলা শ্মশানে চিতা পর্যন্ত তিনি তুলে দিয়েছেন বলে জানান। এরপর ওই ধর্মের লোকজন তা দাহ করেছে।

মুফতি ফয়সালের ছোট ভাই মুফতি হানজালা বলছিলেন, দাফন কাজের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। কোন গোরস্তানে দাফন হবে, কোন হাসপাতালে কয়টি লাশ রয়েছে- স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে এসব বিষয় জেনে তিনি তাদের টিমকে তা জানিয়ে দেন। পাশাপাশি টিমের সদস্যদের জন্য সুরক্ষা সামগ্রী গ্রহণ থেকে শুরু করে সামগ্রিক দায়িত্ব পালন করেন।

আরও পড়ুন

×