ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

কাউন্সিলর জনি একাই একশ'

কাউন্সিলর জনি একাই একশ'
×

বিশেষ প্রতিনিধি

প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০১৯ | ১৬:৩৩ | আপডেট: ২৬ অক্টোবর ২০১৯ | ১৬:৪৪

শেওড়াপাড়া বাসস্ট্যান্ডসংলগ্ন বহুতল মামুন টাওয়ার। পাশ দিয়ে সরু গলির মতো পশ্চিম শেওড়াপাড়ার ভেতরে ঢুকে গেছে একটি সড়ক। প্রধান সড়ক থেকে ভেতরে ঢোকার মুখে সড়কের এ অংশটি অস্বাভাবিক সরু। কিন্তু মামুন টাওয়ার পার হয়ে কয়েক গজ এগোলেই রাস্তাটি আবার চওড়া হয়ে গেছে। এর কারণ খুঁজতে গিয়ে এলাকার কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, স্থানীয় ওয়ার্ড কমিশনার (১৪ নম্বর ওয়ার্ড, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন) হুমায়ুন রশীদ জনি এই মামুন টাওয়ারের প্রকাশ্য মালিক না হলেও তিনি নেপথ্যের মালিক। এ কারণেই টাওয়ারের দখলে থাকা প্রায় ২২ ফুট রাস্তার জায়গা থাকলেও রাস্তা প্রশস্তকরণের সময় তা উদ্ধার করা যায়নি।

যদিও এলাকার অনেকেরই বাড়ি, স্থাপনা ভেঙে রাস্তা চওড়া করা হয়েছে, যা করতে গিয়ে ৩৭০/১ হোল্ডিং নম্বরের বাড়িটি একপ্রকার ভেঙেই ফেলা হয়েছে। বাড়িটি জাহানারা বেগম নামের এক নারীর। এলাকাবাসী জানান, ১৯৮০ সালে যখন এই সড়ক তৈরি করা হয়, তখনও এই বাড়ির জমি থেকে জায়গা নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ওই সময় এলাকার প্রভাবশালী অলি মিয়ার বাড়ি থেকে জায়গা নেওয়া হয়নি। এত বছর পর সেই অলি মিয়ার ছেলে হুমায়ুন রশীদ জনি এলাকার ওয়ার্ড কাউন্সিলর। এখনও সেই নারীর বাড়িটির দিকেই তার নজর। এলাকাবাসী জানান, ২০১৮ সালের এপ্রিলে জাহানারা বেগমের বাড়ি ভাঙা নিয়ে একটি জাতীয় দৈনিকে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। এরপর কাউন্সিলর জনি তার বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করেন। সেখানেই থেমে না থেকে দিতে থাকেন একের পর এক হুমকি। এখন ভয়ে জাহানারা বেগম কারও সঙ্গেই আর এ বিষয় নিয়ে কথা বলেন না। গতকাল শনিবার সমকালের পক্ষ থেকে তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কথা বলা সম্ভব হয়নি।

রাজধানীর পশ্চিম শেওড়াপাড়া থেকে পীরেরবাগের দিকে যেতে আবাসিক এলাকার ভেতরে পড়ে একটি কাঁচাবাজার। এর পাশ দিয়েও উল্লিখিত রাস্তাটি ছোট হয়ে গেছে। এই অংশটি 'অলি মিয়ার টেক' নামে পরিচিত। এলাকাবাসীর অভিযোগ, পুরো বাজারটিই কাউন্সিলর জনি ও তার আত্মীয়স্বজনের। নিজেদের বাজার থাকার কারণে এখানেও সড়কটি পরিকল্পনা অনুযায়ী ৩০ ফুট চওড়া করা যায়নি। আবাসিক এলাকার ভেতরে অপরিকল্পিত কাঁচাবাজারটিও এলাকায় দুর্বিষহ অবস্থা তৈরি করেছে।

এলাকার একাধিক আওয়ামী লীগ ও যুবলীগ নেতা সমকালকে জানান, জনির ডান হাত হিসেবে আছেন দু'জন। এর একজন কবীর, অন্যজন ল্যাংড়া নুরু। এ দু'জনই আগে যুবদল করতেন। এই যুবদল ক্যাডারদের কাঁধে ভর দিয়েই এলাকায় প্রবল আধিপত্য বিস্তার করেছেন ঢাকা মহানগর (উত্তর) যুবলীগের সহসভাপতি হুমায়ুন রশীদ জনি। হুমকি-ধমকি এবং দাপটের কারণে কেউই প্রকাশ্যে তার অপকর্মের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে চান না। নিজস্ব বাহিনী দিয়ে এমনভাবে এলাকায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে রেখেছেন যে সেখানে জনির প্রতিপক্ষ বলে কেউ নেই। ঢাকা উত্তরের ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর জনি একাই একশ'।

যেভাবে আধিপত্য জনির: এলাকায় সরেজমিন গিয়ে জানা যায়, পশ্চিম শেওড়াপাড়া থেকে পীরেরবাগ হয়ে ১০ নম্বর গোলচত্বর পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় রয়েছে অসংখ্য অবৈধ পানির সংযোগ। এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এ এলাকায় অবৈধ পানির সংযোগের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে 'ল্যাংড়া নুরু'। এখন এলাকায় তার পরিচয় কাউন্সিলর জনির ঘনিষ্ঠজন এবং আওয়ামী লীগ কর্মী হিসেবে। প্রতিটি অবৈধ সংযোগের জন্য এই সিন্ডিকেটকে দিতে হয় ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা। প্রায় ছয় মাস আগে ঢাকা ওয়াসার একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে এই অবৈধ পানির সংযোগের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হয় এবং প্রায় ২০০ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। কিন্তু অভিযানের তিন-চার দিন পর থেকেই রাতের বেলা আবারও বিভিন্ন গলির রাস্তা খুঁড়ে শুরু হয় পানির অবৈধ সংযোগ দেওয়া। এখনও তা অব্যাহত রয়েছে।

ভুক্তভোগীরা জানান, এলাকায় যে কোনো স্থাপনা নির্মাণ করতে গেলে কবীর আহমেদ নামের একজন স্থানীয় সন্ত্রাসীকে বাধ্যতামূলকভাবে গ্রিল লাগানো, থাইগ্লাস লাগানো, ইট-বালু সরবরাহ প্রভৃতি কাজ দিতে হয়। তারা কাজের জন্য বাজারমূল্যের চেয়ে দেড় গুণ থেকে দ্বিগুণ মূল্য ধরে। কবীরকে কাজ না দিলেই নানা অজুহাতে তার বাহিনী এসে কাজ বন্ধ করে দেয়। স্থানীয়রা জানান, কবীরের নেতৃত্বে একটি বাহিনী এলাকায় 'জনি কাউন্সিলরের বাহিনী' হিসেবে পরিচিত। জনির পাশে কবীরের নাম ও ছবিসংবলিত রঙিন পোস্টার এলাকার বিভিন্ন ভবনের দেয়ালেও দেখা যায়। সে যুবলীগ কর্মী পরিচয়ে কাউন্সিলর জনির পক্ষে পুরো এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে।

এই কবীরের বিরুদ্ধে শেওড়াপাড়া থেকে কাজীপাড়া পর্যন্ত রাস্তার পাশে ফুটপাতে অবৈধ দোকান বসিয়ে চাঁদাবাজি এবং এলাকা দিয়ে চলাচল করা টেম্পো ও হিউম্যান হলার থেকেও চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে।

সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, একটি জমিতে 'জালালউদ্দিন মণ্ডল' নামের এক ব্যক্তির মালিকানার সাইনবোর্ড রয়েছে। এই বাড়ির সামনে কিছুদিন আগে আরও একটি সাইনবোর্ড থাকার কথা জানান এলাকাবাসী। তাদের তুলে রাখা সেই সাইনবোর্ডের ছবিতে দেখা যায়, জমির প্রকৃত মালিক খোঁজার জন্য সাইনবোর্ডটি দিয়েছিলেন কাউন্সিলর জনি। 'বিশেষ বিজ্ঞপ্তি' আকারে টানানো সাইনবোর্ডটিতে লেখা আছে, জায়গাটি স্থানীয় ১৪ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলরের হেফাজতে রয়েছে। প্রকৃত মালিককে তার দলিলপত্রসহ কাউন্সিলরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হচ্ছে। এলাকাবাসী জানান, বিরোধপূর্ণ জমি দখল কিংবা অর্থ আদায়ের জন্য এটাই জনির কৌশল। তিনি নিজের হেফাজতে জমি নেন, তারপর এক পক্ষের কাছ থেকে টাকা নিয়ে তাকেই বুঝিয়ে দেন।

এলাকায় একটি পানির পাম্প নির্মাণ নিয়েও জনির বিরুদ্ধে জমি আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসী জানান, পাম্পটি নির্মাণে প্রায় দেড় কাঠা জমি কেনার জন্য জনি এলাকাবাসীর কাছ থেকে টাকা তোলেন। কিন্তু সেই জমি রেজিস্ট্রি করেন তার স্ত্রীর নামে। এ নিয়ে ক্ষোভের সৃষ্টি হয় এলাকাবাসীর মধ্যে।

একটি রহস্যময় খুন ও গুঞ্জন: ২০১৭ সালের ২৬ আগস্ট শেওড়াপাড়া এলাকার ইকবাল রোডে দুই মুখোশধারীর গুলিতে নিহত হন আনিসুর রহমান আনিস নামের একজন ঠিকাদার। এলাকাবাসী জানান, তিনি জনির বন্ধু এবং 'বডিগার্ড' হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। ঠিকাদারি কাজ পেতে আনিসের দৌরাত্ম্য এত বেড়ে যায় যে তার সঙ্গে জনিরও বিরোধ সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে তিনি রহস্যজনক হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। স্থানীয় একজন আওয়ামী লীগ নেতা জানান, এ খুনের নেপথ্যে প্রকৃতপক্ষে কাউন্সিলর জনিই ছিলেন- এমন গুঞ্জন রয়েছে এলাকায়। কারণ, আনিসের কর্মকাণ্ডে জনি অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছিলেন। তাদের মতে, এমন দাপুটে কাউন্সিলরের এলাকায় ঢুকে অন্য কারও খুন করে যাওয়ার সাহস হওয়ার কথা নয়। এ ঘটনায় পরবর্তী সময়ে পুলিশের তদন্তে ন্যাটা বিল্লাল নামের এক সন্ত্রাসীকে ধরা হয়। পরে জনির পিএস রিপনকেও গ্রেপ্তার করে পুলিশ। মামলাটি এখন কোন অবস্থায় আছে, তা জানেন না এলাকাবাসী।

কাউন্সিলর জনির বক্তব্য: সরেজমিন গিয়ে পাওয়া বিভিন্ন অভিযোগ সম্পর্কে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে কাউন্সিলর জনি বিস্তারিতভাবে জবাব দেন। তিনি সমকালকে বলেন, যে নারীর বাড়ি ভাঙার কথা বলা হচ্ছে, তিনি ১৯৮০ সালে এ এলাকায় জায়গা কেনার পর থেকেই এলাকার বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়েছেন। যখন রাস্তা চওড়া করার কাজ হাতে নেওয়া হয়, তখন ওই নারী তাতে বাধা দেন এবং জায়গা ছাড়তে রাজি হননি। এরপর রাজউকের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে অভিযানে রাস্তার জায়গা বের করা হয়। এ সময় তিনি এলাকার কাউন্সিলর হিসেবে কেবল সহায়তা দিয়েছেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ওই নারী সংবাদমাধ্যমে তার বিরুদ্ধে অসত্য বক্তব্য দিলে তিনি মানহানির মামলা করেন। পরে নারীর বয়স বিবেচনায় মানবিক কারণে তিনি আর মামলাটি চালাননি। মামুন টাওয়ারের সামনে এবং অলি মিয়ার টেকে কাঁচাবাজারের কাছে রাস্তার জায়গা কেন ছাড়া হয়নি- জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রথমে ২৪ ফুট রাস্তা নির্ধারণ করা হয়। পরে রাজউক অভিযানের সময় জানায়, এ এলাকায় রাস্তার জন্য নির্ধারিত আছে ৩০ ফুট জায়গা। ফলে পরবর্তী সময়ে ৩০ ফুট জায়গা বের করা হয়েছে। এ কারণে কোথাও ২৪ ফুট, কোথাও ৩০ ফুট হয়েছে।

এলাকায় ল্যাংড়া নুরু মিয়ার অবৈধ পানির সংযোগ দেওয়ার ব্যবসা সম্পর্কে তিনি বলেন, এই নুরু মিয়াকে তিনিই নিজেই পুলিশে ধরিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু সে ছাড়া পেয়ে আবারও অবৈধ কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। তার সঙ্গে এই ল্যাংড়া নুরুর কোনো সম্পর্ক নেই। কবীর আহমেদ সম্পর্কে তিনি বলেন, কবীর যুবলীগের একজন কর্মী। সে এলাকায় উত্তর যুবলীগের সভাপতি মাইনুল হোসেন খান নিখিলের সহচর। এর বাইরে সে কী কাজকর্ম করে, তা তার জানা নেই।

এলাকায় পানির পাম্প নির্মাণের জায়গা সম্পর্কে তিনি বলেন, তার স্ত্রীর নামে জায়গাটি রেজিস্ট্রি করার কথা সত্য। এর কারণ হচ্ছে, প্রথমে তিনি এলাকাবাসীর টাকা নিয়ে এক কাঠা জায়গা কেনেন। কিন্তু ওই জায়গায় রাস্তা সংকীর্ণ হওয়ায় সেখানে পাম্প বসানো যায়নি। পরে তিনি কিছুটা দূরে চার কাঠার একটি জায়গা তার স্ত্রীর নামে কেনেন। এই জায়গা থেকে এক কাঠা তিনি পানির পাম্প বসানোর জন্য ছেড়ে দেন। পরে ওয়াসা আরও আধা কাঠা জায়গা চাইলে তিনি মোট দেড় কাঠা জায়গা ছেড়ে দেন।

এলাকায় বিরোধপূর্ণ জায়গায় সাইনবোর্ড লাগানোর ব্যাপারে তিনি বলেন, মূলত এ জায়গায় একেকবার একেকজন সাইনবোর্ড দিয়ে নিজের জমি দাবি করে আসছিল। শেষ পর্যন্ত তিনি একটা বিশেষ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে সাইনবোর্ড টানিয়ে জমির প্রকৃত মালিক দাবিদারদের উপযুক্ত প্রমাণ দিতে বলেন। কিন্তু কয়েক দিন আগে তার সাইনবোর্ড সরিয়ে আবারও একটি নতুন মালিকানা দাবিদারের সাইনবোর্ড টানানো হয়েছে। এর পর থেকে তিনি বিরক্ত হয়ে আর ওই জমির ব্যাপারে কোনো খোঁজখবর নেননি।

আনিস হত্যার ব্যাপারে জনি বলেন, আনিস তার স্কুলের এবং বাল্যবন্ধু ছিল। আনিসের সঙ্গে এলাকার একাধিক প্রতিপক্ষের বিরোধ ছিল। আনিস খুনের পর পুলিশ তার পিএস রিপনকে গ্রেপ্তার করে। পরে তদন্তে রিপনের সম্পৃক্ততা না পেয়ে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। আনিস হত্যার সঙ্গে তাকে জড়িয়ে করা অভিযোগ হাস্যকর বলে দাবি করেন তিনি। কাউন্সিলর জনি আরও জানান, এলাকায় তিনি আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের অন্যায় কর্মকাণ্ড প্রশ্রয় দেন না বলেই তার নামে অনেকে অভিযোগ করে। বিএনপির কারও সঙ্গে তার সখ্য থাকার কোনো প্রশ্নই ওঠে না বলেও দাবি করেন বিতর্কিত এই কাউন্সিলর।

আরও পড়ুন

×