সরেজমিনে কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতাল
নৃশংসতার চিহ্ন নিয়ে কাতরাচ্ছে পুলিশ
রাজধানীর রাজারবাগ কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহত পুলিশ সদস্যরা। ছবি: সমকাল
আব্দুল হামিদ
প্রকাশ: ২৬ জুলাই ২০২৪ | ০০:২০ | আপডেট: ২৬ জুলাই ২০২৪ | ১৬:৫৪
রাজধানীর রাজারবাগ কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালের ৯ তলায় পুরুষ ওয়ার্ডে শুয়ে কাতরাচ্ছেন সিটি এসবি শাখার এসআই সৈকত আলী। পুরো শরীরে মারধরের চিহ্ন। মাথায় সেলাই পড়েছে ১৫টি। সৈকতের পাশের বিছানায় চিকিৎসা নিচ্ছেন গুলশান ট্রাফিক বিভাগের এসআই নাসির উদ্দিন খান। তাঁর ভেঙেছে বাঁ হাত, মাথায় ২০টি সেলাই।
সহিংসতায় আহত আরেকজন ডিএমপির প্রটেকশন অ্যান্ড প্রটোকল বিভাগের কনস্টেবল আরমান আলী। পিটুনিতে তাঁরও পুরো শরীর থেঁতলে গেছে। বৃহস্পতিবার দুপুরে পুলিশ হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেছে এমনই মর্মস্পর্শী ছবি।
এখনও রাজারবাগ হাসপাতালের আইসিইউ দু’জন আর বিভিন্ন ওয়ার্ডে ভর্তি আছেন ৮৫ পুলিশ সদস্য। সংঘর্ষের পর এ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন ৩৭১ জন। সব মিলিয়ে সারাদেশে সহিংসতায় আহত হন সহস্রাধিক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য। তবে অনেক পুলিশ সদস্য ডিউটিতে যাওয়ার পথেও বিক্ষোভকারীদের হাতে আক্রান্ত হন।
এ আন্দোলনে প্রাণ হারান তিন পুলিশ সদস্য। তারা হলেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) প্রটেকশন বিভাগের নায়েক গিয়াস উদ্দিন, নারায়ণগঞ্জ পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) পরিদর্শক মাসুদ পারভেজ ও ট্যুরিস্ট পুলিশের এএসআই মোক্তাদির।
ঘটনার দিনের দুঃসহ স্মৃতি গতকাল সমকালের কাছে তুলে ধরতে গিয়ে হাসপাতালের বিছানায় কান্নায় ভেঙে পড়েন আহত পুলিশ সদস্যরা। এসআই সৈকত আলী বলেন, ‘২০ জুলাই বনশ্রীর মাদারটেকের বাসা থেকে বেরিয়ে গুলশানে ডিউটিতে যাচ্ছিলাম। রামপুরার মুখে পৌঁছাতেই আমাকে ঘিরে ধরে বিক্ষোভকারীরা। পরে তারা আমার পকেট থেকে কাগজপত্র ও মোবাইল ফোন নিয়ে নেয়। এ সময় আমি দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করি। তারা আমার মোবাইল ফোন দেখে পুলিশ পরিচয় নিশ্চিত হয়ে পিছু নেয়। এক পর্যায়ে আমি পাশের একটি বাসায় ঢুকে বাথরুমে আশ্রয় নিই। বিক্ষোভকারীরা প্রথমে বাথরুমের দরজা ভাঙার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে কেউ কেউ আগুন ধরিয়ে দেওয়ার কথা বলে। এক পর্যায়ে দরজা ভেঙে আমাকে বের করে বেদম মারধর করে।’
আরেক পুলিশ সদস্য নাসির উদ্দিন বলেন, ‘১৮ জুলাই পুরান বিশ্বরোডে ২টা থেকে ডিউটি ছিল। ডেমরা কোনাবাড়ী থেকে বেরিয়ে ডিউটিতে যাওয়ার পথে গতিরোধ করে আমাকে মারধর করা হয়। কোনো রকমে দৌড়ে একটি হোটেলে আশ্রয় নিই। কিছু সময় পর স্থানীয়দের সহায়তায় হাসপাতালে আসি।’
কনস্টেবল আরমান আলী বলেন, ‘১৭ জুলাই রাত ১টার দিকে রামপুরায় ১০ থেকে ১২ ব্যক্তি কাঁধে থাকা ব্যাগ দেখে পুলিশ পুলিশ বলে চিৎকার দিলে পালানোর চেষ্টা করি। একজনের লাঠির আঘাতে রাস্তায় পড়ে যাই। এরপর খুব মারধর করে তারা।’
১৯ জুলাই এক বিচারপতিকে ডাক্তার দেখিয়ে যাত্রাবাড়ীর কাজলার বাসায় ফেরার পথে বিক্ষোভকারীদের হামলার শিকার হন ডিএমপির সুপ্রিম কোর্ট অ্যান্ড বিশেষ নিরাপত্তা বিভাগের কনস্টেবল মফিজুল ইসলাম। রাজারবাগ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন তিনি। তাঁর সঙ্গে কথা বলতে গেলে মফিজুল একটি কাগজ বের করে দেন। হাতে নিয়ে দেখা যায়, সেখানে তাঁর সঙ্গে ঘটে যাওয়া নারকীয় ঘটনার বর্ণনা রয়েছে। মফিজুল লিখেছেন, “আমি কথা বলতে পারি না, চোয়াল ভাঙা। ঘটনার দিন সকালে কাজলা টোল প্লাজার আগে চার থেকে পাঁচজন টোকাই আমি পুলিশ কিনা জানতে চায়। ভয়ে অস্বীকার করি। পরে তারা আমার ফোন কেড়ে নেয়। মোবাইলে পুলিশের ছবি দেখে বলে, ‘পুলিশ পাইছি’– এ কথা শুনে আশপাশ থেকে আরও ১৫ থেকে ২০ জন এসেই মারধর শুরু করে।”
ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান সমকালকে বলেন, আহত পুলিশ সদস্যদের সর্বোচ্চ চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা হচ্ছে। পুলিশের ওপর যারা হাত তুলেছে, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। এরই মধ্যে বেশ কয়েকজন নাশকতাকারীকে শনাক্ত করা হয়েছে।
গিয়াসকে নৃশংস হত্যা
পুলিশ সদস্য গিয়াস উদ্দিন ১৯ জুলাই রাত ৯টার দিকে রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সের উদ্দেশে বাসা থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হন। পরের দিন রায়েরবাগ ফুট ওভারব্রিজের নিচ থেকে তাঁর বীভৎস লাশ উদ্ধার করেন পরিবারের সদস্যরা। গিয়াসের ছেলে মোমিনুর রহমান রাব্বু কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘ঘটনাস্থল থেকে আব্বুর লাশ নিয়ে পালিয়ে আসতে হয়েছে। সারাজীবন বাবা মানুষের জন্য কাজ করল, আজ সেই মানুষের হাতেই খুন হলো।’
গিয়াসের স্ত্রী ইয়াসমিন সুলতানা বলেন, ‘ঘটনার দিন রাতে ছেলেমেয়ে খুব করে বলে– আব্বু, বাইরে খুব ঝামেলা চলছে, ডিউটিতে না গেলে হয় না। স্যারদের বলো যাত্রাবাড়ী এলাকায় ঝামেলার কথা। হাসিমুখে সন্তানদের বলছিলেন, সরকারি চাকরিতে এসব কথা বললে হয় না। আজকে দেশের খারাপ সময় যদি আমি বাসায় বসে থাকি, তাহলে কখন দেশের জন্য কাজ করব। তোমরা দোয়া করো, কিছুই হবে না বলে বের হয়ে যান। তারপরও রাজারবাগে পৌঁছেছেন কিনা খোঁজ নিতে রাত সাড়ে ১০টার দিকে ফোন করি; কিন্তু ফোন বন্ধ পাই। ব্যস্ত মনে করে আর ফোন করিনি।’
ইয়াসমিন বলেন, ২০ জুলাই ভোরে পুলিশ পিএমও শাখা থেকে ফোন করে বলে– গিয়াস কোথায়? এখনও রাজারবাগে এসে রিপোর্ট করেনি। তাঁকে ফোনেও পাওয়া যাচ্ছে না। এ কথা শুনে তখনই ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়ি। যাত্রাবাড়ী রায়েরবাগ ফুট ওভারব্রিজের নিচে একটা লাশ দেখে কাছে যাই। মরদেহ দেখে চেনার উপায় ছিল না। পরে মরদেহের পাশেই আইডি কার্ড ও ড্রাইভিং লাইসেন্স দেখে নিশ্চিত হই– এটা গিয়াস। আন্দোলনকারীদের ভয়ে আমার স্বামী বাসা থেকে পুলিশের পোশাক পরেনি। ব্যাগে পুলিশের পোশাক নিয়ে বের হয়। তারপরও ঘাতকদের হাত থেকে বাঁচতে পারল না।
যেভাবে মারা হয় পরিদর্শক পারভেজকে
১৯ জুলাই সন্ধ্যার পর নারায়ণগঞ্জ পিবিআইর অফিসে আগুন দেওয়ার খবর শুনে সাধারণ পোশাকে পিবিআইর পরিদর্শক মাসুদ পারভেজ বাসা থেকে বের হন। পরিবারের দাবি, তিনি অফিসে যাওয়ার জন্যই বের হয়েছিলেন। পারভেজের শ্যালক সাব্বির আহমেদ বলেন, ‘বাসা থেকে বের হয়ে রাস্তায় এলে আন্দোলনকারীরা তাঁকে বেদম মারধর করে ফেলে রেখে যায়।’