ডিএসসিসির ৫ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর
নানা অপকর্মে জড়িয়ে যাচ্ছে ফরিদের নাম
অমিতোষ পাল
প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০১৯ | ১৩:০৭
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ৫ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর
আশ্রাফুজ্জামান ফরিদের ভাই মুরাদ মুন্সি ও ভাগ্নে শাওন অবৈধ ভিওআইপি
ব্যবসায় জড়িত ছিলেন এক সময়। ওই ব্যবসায় ধরা পড়ার কিছুদিন পর ইয়াবা ব্যবসায়
নামেন তারা। বর্তমানে তারা দু'জনেই সবুজবাগ এলাকার ইয়াবা ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ
করেন। তাদের মাথার ওপরে ছাতা হিসেবে থাকেন কাউন্সিলর আশ্রাফুজ্জামান ফরিদ।
ইয়াবা ব্যবসার দায়ে কিছুদিন আগে জেলে যান ভাগ্নে শাওন। সম্প্রতি উচ্চ
আদালতের মাধ্যমে জামিনে মুক্তি পেয়ে আবারও ইয়াবা ব্যবসা শুরু করেছেন
পুরোদমে।
কেবল ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগই নয়; সবুজবাগ থানা আওয়ামী লীগ
সভাপতি আশ্রাফুজ্জামান ফরিদের নাম এ রকম অনেক কিছুর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে।
তার বিরুদ্ধে এলাকাবাসীর অভিযোগের শেষ নেই। জায়গা-জমি দখল,
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগ বাণিজ্য, কোচিং বাণিজ্য, চাঁদাবাজি, ডিশ-ইন্টারনেট
ব্যবসা, বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়াসহ অনেক
অভিযোগ।
এলাকাবাসী জানান, তাদের সমস্যা সমাধান বিষয়ে কাউন্সিলরের তেমন নজর নেই।
রাজারবাগ-বাসাবো এলাকার প্রায় সব রাস্তাই ভাঙাচোরা। ময়লা-আবর্জনাও পড়ে থাকে
যত্রতত্র। করপোরেশনের কার্যক্রমেও তার তৎপরতা কম। ডিএসসিসির ২০টি
বোর্ডসভার মধ্যে মাত্র ১০টিতে তিনি উপস্থিত থেকেছেন। টানা তিনটি বোর্ডসভায়
অনুপস্থিত থাকার নজিরও আছে। এ কারণে গত ২৭ অক্টোবর তাকে কারণ দর্শাও নোটিশ
দিয়েছে ডিএসসিসি।
জানা যায়, বরিশালের হিজলার হরিনাথপুরের বাসিন্দা আশ্রাফুজ্জামান ফরিদ আশির
দশকে ঢাকায় আসেন। টঙ্গীতে সোর্ড ব্লেড কোম্পানিতে সাধারণ শ্রমিক হিসেবে কাজ
নেন। ১৩৯ নম্বর আহমদবাগে এক আত্মীয়ের বাসায় থাকতেন। ব্লেড কোম্পানির কাজ
ছেড়ে দিয়ে অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের ২৮ নম্বর ওয়ার্ডের (বর্তমানে ৫)
সাবেক কাউন্সিলর মোশাররফ হোসেন মঞ্জুর ফুটফরমাশ খাটা শুরু করেন। মঞ্জুর
মাধ্যমেই আওয়ামী লীগ কর্মী হিসেবে রাজনৈতিক কার্যক্রম শুরু তার। দিন দিন
বাড়তে থাকে প্রভাব। নিজের কোনো ব্যবসা-বাণিজ্য না থাকলেও একাধিক
বাড়ি-ফ্ল্যাটের মালিক। ক্যাসিনোকাণ্ডে বরখাস্ত হওয়া ডিএসসিসির ৯ নম্বর
ওয়ার্ড কাউন্সিলর মমিনুল হক সাইদের সঙ্গেও ছিল তার সখ্য।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০১৬ সালে দক্ষিণ রাজারবাগের একটি বাড়ি
রওশন মঞ্জিল দখল করতে গিয়ে প্রতিরোধের মুখে পড়েন ফরিদ। পরে সেটা আর দখল
করতে পারেননি। বর্তমানে বাসাবোর ৩৮/৮, মায়াকাননের যে ফ্ল্যাটে থাকেন, সেটাও
দখল করা। ফ্ল্যাটটির মালিক দুই ভাইয়ের মধ্যকার বিরোধের সুযোগ নিয়ে তিনি
সেটা কেনার কথা বলে পাওয়ার নিয়েছেন। ভাড়া না দিয়ে সেখানে বসবাস করছেন।
ফ্ল্যাটটির মালিক স্থানীয় জামায়াত নেতা মতিউর রহমানও কিছু বলতে পারছেন না।
একটি ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা জানান, এলাকায় কোনো ডেভেলপারের কাজ
করতে গেলে আশ্রাফুজ্জামান ফরিদকে খুশি না করে কাজ করা যায় না। রাস্তার
জায়গা ছাড়া হয়নি, নকশা অনুযায়ী ভবন হচ্ছে না- নানা অভিযোগ তুলে ডেভেলপারের
কাছ থেকে মোটা অঙ্কের চাঁদা নেন। লক্ষ্মী বিল্ডার্স, ইকো ডেভেলপারসহ বেশ
কয়েকটি প্রতিষ্ঠান তার চাঁদাবাজির শিকার। এ ছাড়া কোনো ডেভেলপার কাজ করতে
গেলে প্লটে সাইনবোর্ড বসানো বাবদ মোটা অঙ্কের চাঁদা দিতে হয়। এটা দেখাশোনার
জন্য তার নিজস্ব বাহিনী আছে। এটা দেখাশোনা করে ফ্রিডম পার্টি থেকে
বর্তমানে আওয়ামী লীগ কর্মী ফ্রিডম মজিবর। ডিশ-ইন্টারনেট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ
করেন যুবদলের পিয়াল, ছাত্রদলের মতিন, চয়ন ও জুয়েলকে দিয়ে। হকস সোসাইটির
সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক যুবদল নেতা ফকরুজ্জামান টিপুকে তিনি রাজারবাগ
দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বানিয়েছেন টাকার বিনিময়ে। তাকে দিয়ে
হকস সোসাইটির নিয়ন্ত্রণ করেন ফরিদ। এ সোসাইটিতে কোনো কাজ করতে গেলেই টিপুকে
টাকা দিতে হয়। টিপুর সঙ্গে আছে জেলখাটা আরজু পাটোয়ারী, ভাণ্ডার বাবু,
রাজারবাগের আমির। এই গ্রুপকে দিয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের অর্পিত সম্পত্তি জাল
দলিলপত্র তৈরি করে দখল করা হয়। উত্তর রাজারবাগের সন্তোষ বাড়ৈয়ের
আত্মীয়স্বজনদের বিক্রি করে দেওয়া সম্পত্তি আবার দাবি করে টাকার ভাগবাটোয়ারা
করেন। এ ক্ষেত্রে সন্তোষ বাড়ৈকে শিখণ্ডি হিসেবে ব্যবহার করেন কাউন্সিলর
ফরিদ।
কমলাপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজের এক শিক্ষক জানান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির
ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ফরিদ। সব ধরনের নিয়োগ থেকে শুরু করে নোট বই
বিক্রি, কোচিং বাণিজ্য, খেলাধুলার জন্য পৃথক ফিসহ নানাভাবে অতিরিক্ত অর্থ
আদায় করেন কাউন্সিলর। কিছু দিন আগে অধ্যক্ষ অবসরে গেলে কদমতলী কারিগরি
স্কুল অ্যান্ড কলেজের কারিগরি বিষয়ের শিক্ষক বশির আহমেদকে কমলাপুর স্কুল
অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ দেন। বিনিময়ে ১৭ লাখ টাকা নেন। কিন্তু
অযোগ্য ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়ার কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের
শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা আন্দোলন শুরু করেন। তোপের মুখে বশির আহমেদকে
অপসারণ করা হয়। বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ফারহানা সিদ্দিকীকে দিয়ে চলছে
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম। আরেকটি বাহিনী আছে রোড কাটিং। কোনো
বাসাবাড়িতে পানি বা গ্যাসের লাইন পরিবর্তন ও সংযোজন করতে হলেই সে বাহিনীকে
খুশি করতে হয়। এটা আমির বাহিনী হিসেবে পরিচিত। এ বাহিনীতে আরও আছে
ছাত্রলীগের অলি, আজিজসহ কয়েকজন কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য। আশ্রাফুজ্জামান
ফরিদের বড় ভাগ্নে ফরমান মাহমুদ সবুজবাগের সালাম ডাইং সংলগ্ন দেড় বিঘা
জায়গায় মাছের বাজার ও হাতেমতাই রেস্টুরেন্ট বসিয়েছেন। তার সঙ্গে আছে বিএনপি
কর্মী আব্দুল কাদের নবা। অথচ জায়গাটি অর্পিত সম্পত্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন জানান, বছরদুয়েক আগে নন্দীপাড়ায় একজন বিধবার জমি
দখল করতে গিয়ে এলাকাবাসীর প্রতিরোধের মুখে পড়েন ফরিদ। এলাকাবাসী ধাওয়া
দিয়ে তাকে তাড়িয়ে দেন।
বাসাবো বৌদ্ধমন্দির থেকে রাজারবাগ কালীমন্দির পর্যন্ত সড়কে যত
টেম্পো-সিএনজি, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও ইঞ্জিনচালিত রিকশা চলে, সেসব
যানবাহন থেকে চাঁদা তোলা হয়। এ ছাড়া আছে ফুটপাতের চাঁদাবাজি। এসব চাঁদা
আদায়ের তদারকি করে মোমিন। রাজারবাগে বাসা ভাড়া করে জুয়া চালায় আব্দুল্লাহ,
সেন্টু ও মমিন।
স্থানীয়রা জানান, মায়াকানন, সবুজবাগ, উত্তর মুগদাপাড়া ডেপুটি কলোনি,
আহমদবাগ, রাজারবাগ উত্তর ও দক্ষিণ, কদমতলা বাসাবো, পূর্ব বাসাবো এলাকায় যত
অপকর্ম হয়, এসবের সঙ্গে ঘুরেফিরে আসে কাউন্সিলর ও তার অনুসারীদের নাম। আর
কাউন্সিলর এসব দুর্নাম ঢাকতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুণগান প্রচারণা
চালান। এসব প্রচারণা চালানোর দায়িত্ব পালন করে শেখ মাহবুবুর রহমান ওরফে
শিবির মাহবুব।
কাউন্সিলরের বক্তব্য :মাদক ব্যবসা প্রসঙ্গে আশ্রাফুজ্জামান ফরিদ বলেন,
'আমার ভাগ্নে শাওন মাদক মামলায় জেল খেটে জামিনে বেরিয়েছে। তবে আমি কখনই
এসবের সঙ্গে জড়িত নই। যারা এটা বলে, মিথ্যা বলে। প্রয়োজনে আরও লোকজনের
সঙ্গে এ ব্যাপারে কথা বলে জানার অনুরোধ করছি।' বোর্ডসভায় অনুপস্থিত থাকা
প্রসঙ্গে তিনি বলেন, 'শুনেছি, ডিএসসিসি আমাকে কারণ দর্শাও নোটিশ দিয়েছে।
কিন্তু এখনও হাতে পাইনি। বোর্ড মিটিংয়ে দুটি কাগজে স্বাক্ষর নেওয়া হয়।
দুয়েকটি মিটিং হয়তো মিস করেছি বিদেশে থাকার কারণে। এ জন্য মেয়রের সঙ্গে
কথাও বলেছি। হয়তো আমার স্বাক্ষর খাতার হিসাব ঠিকমতো করা হয়নি।' রওশন মঞ্জিল
দখল প্রসঙ্গে বলেন, 'তাদের মালিকানা নিয়ে ঝামেলা হয়েছিল। তখন তারা
ডেকেছিল। পরে তারাই সমস্যার সমাধান করে ফেলেছে। দখল করতে যাওয়ার বিষয়টি
একেবারেই সত্য নয়।' ফ্ল্যাট দখল প্রসঙ্গে বলেন, 'ফ্ল্যাটটির মালিক মতিউর
রহমান আজিজ কো-অপারেটিভ থেকে কিছু লোন নিয়েছেন। এ নিয়ে আজিজ কো-অপারেটিভের
সঙ্গে মতিউর রহমানের ঝামেলা চলছে। এ অবস্থায় মতিউর রহমান আমার কাছে কিছু
টাকা চান। মতিউর রহমানকে একটা চেক দিয়ে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি নিই। বর্তমানে
সেটাতেই বসবাস করছি। ইতিমধ্যে মতিউর রহমানকে টাকা দিয়ে চেক ফেরত নিয়েছি।
ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কখনই টাকা-পয়সা নিই না। এটা মিথ্যা বলেছে।'
কমলাপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজে অধ্যক্ষ নিয়োগ নিয়েও তিনি কোনো টাকা নেননি বলে
দাবি করে বলেন, 'ওই শিক্ষকের প্রয়োজনীয় সব যোগ্যতাই ছিল। নিয়োগ কমিটি
পরীক্ষা নিয়েই তাকে নিয়োগ দিয়েছিল। এখন ওই শিক্ষক মামলাও করেছেন।'
ফকরুজ্জামান টিপুকে পদে বসানো সম্পর্কে বলেন, 'সবার মতামতের ভিত্তিতেই তাকে
সেক্রেটারি বানানো হয়েছে।' এ ছাড়া অন্যান্য অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন,
'এগুলোর কোনোটাই ঠিক নয়। আমার বিরোধী কিছু লোক এসব ছড়াচ্ছে।'
আয়ের উৎস সম্পর্কে আশ্রাফুজ্জামান ফরিদ বলেন, 'যারা ব্যবসা করে, তাদের কিছু
টাকাপয়সা দিই। তারা লাভ করে লাভের একটা অংশ দেয়। যেমন কেউ ঠিকাদারির কাজ
করল, তার টাকার দরকার হলো, তাকে টাকা দিই আমি। কাজ শেষ হলে লাভ দেয়।'
- বিষয় :
- কাউন্সিলর