বিশ্ব প্রাণী দিবস
ঘোড়ার কাঁধে গাধার বোঝা
জয়নাল আবেদীন
প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০১৯ | ১৩:১৬
রাজধানীর গুলিস্তান থেকে বুড়িগঙ্গা নদীর সদরঘাট পর্যন্ত প্রায় প্রতি মিটার
জায়গায় নাগরিক ব্যস্ততা ভোর থেকে মাঝরাত অবধি। দোকান ছাড়িয়ে ফুটপাত এমনকি
সড়কেও বিস্তৃত দোকানপাট কিংবা কারখানার নিত্যকর্ম। এমন অতিব্যস্ত এলাকায়
সড়কজুড়ে যান্ত্রিক সব বাহনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দাপিয়ে বেড়ায় পেশিশক্তির
বাহন ঘোড়ার গাড়ি। স্থানীয়ভাবে 'টমটম' নামে পরিচিত এই গাড়ি এখন আর ঐতিহ্য
নয়, বরং অমানবিকতা। মাত্রাতিরিক্ত খাটুনি, প্রয়োজনের তুলনায় নিতান্তই কম
সমাদর, অসুস্থ-মরণাপন্ন ঘোড়াকে অযত্ন অবহেলায় ফেলে রাখার ঘটনাগুলো ভাবিয়ে
তুলছে প্রাণী বিশেষজ্ঞদের।
গুলিস্তান জিরো পয়েন্ট থেকে তাঁতীবাজার, রায়সাহেব বাজার মোড় হয়ে
লক্ষ্মীবাজার বাহাদুর শাহ পার্কের পাশ ঘেঁষে সদরঘাট পৌঁছতে পাড়ি দিতে হয়
প্রায় তিন কিলোমিটার পথ। শ্রমিকদের দেওয়া তথ্য মতে, প্রতিটি ঘোড়ার গাড়ি
দিনে ১৪ বার গুলিস্তান-সদরঘাট রুটে যাওয়া-আসা করে। সে হিসাবে এখানকার
ঘোড়াগুলো দিনে প্রায় ৪২ কিলোমিটার পথ হাঁটে। এই অমানবিক শ্রমকে ঘোড়ার কাঁধে
গাধার বোঝা বলে জানান প্রাণী অধিকার নিয়ে কর্মরত বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুরান ঢাকার ঘোড়ার গাড়িকে এখন আর 'ঐতিহ্য' বলার সুযোগ
নেই। লোভী মহাজনের খপ্পরে পড়ে এই প্রাণীগুলো চাহিদামাফিক খাবার ও
চিকিৎসাসেবা পায় না। আর দিনভর ওদের পিঠে পড়ছে কোচোয়ানের বেতের বাড়ি।
প্রাণীর প্রতি এই চরম অমানবিকতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার সময় এসেছে। এ
ক্ষেত্রে সম্প্রতি পাস হওয়া প্রাণী কল্যাণ আইনের যথাযথ প্রয়োগ চান তারা।
শ্রমজীবী প্রাণী দিয়ে অতিরিক্ত শ্রম হচ্ছে কি-না এ বিষয়ে দেশে কোনো নজরদারি
নেই বলে জানান প্রাণী অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন স্ট্যান্ড ফর
অ্যানিমেলসের সাধারণ সম্পাদক মো. সাঈদ হোসেন।
তিনি বলেন, 'প্রকৃতপক্ষে আমাদের দেশে প্রাণীপ্রেম নেই। প্রাণী নিয়ে
সচেতনতাও নেই। বিশেষ করে শ্রমজীবী প্রাণী নিয়ে সরকারের কোনো তদারকিই নেই।'
সংশ্নিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাজধানীর গুলিস্তান-সদরঘাট রুটে
বর্তমানে ৬০টি গাড়ি চলাচল করে। তবে নানা কারণে প্রতিদিন ১০-১২টি গাড়ি বন্ধ
থাকে। কোচোয়ান, হেলপারের বেতন এবং দুই ঘোড়ার খাবার বাবদ প্রতিদিন ব্যয় হয়
প্রায় এক হাজার ২০০ টাকা। সব খরচ বাদে দিনে গাড়িপ্রতি দেড় থেকে দুই হাজার
টাকা আয় হয় মহাজনের।
বৃহস্পতিবার দুপুরে সরেজমিন সদরঘাট থেকে গুলিস্তান পর্যন্ত ঘুরে দেখা যায়,
১৫ থেকে ১৮ জন যাত্রী বহন করছে গাড়িগুলো। স্টিল-কাঠের মিশ্রণে তৈরি দুই
চাকার গাড়ি এবং এর ওপর কোচোয়ান-হেলপারসহ ২০ জনকে কাঁধে বয়ে বেড়াচ্ছে দুটি
ঘোড়া। যদিও মহাজনদের দাবি, প্রতিটি গাড়ির ধারণক্ষমতা ১০-১২ জন। এত বোঝা
কাঁধে বয়ে বেড়াতে গিয়ে ক্ষয়ে যায় ঘোড়াগুলোর পায়ের ক্ষুর। এ জন্য তাদের পায়ে
পরিয়ে দেওয়া হয় লাল রঙের নাল। এই রুটে যাত্রীপ্রতি ভাড়া ২০ টাকা। তবে
বৃহস্পতিবারসহ বিশেষ মৌসুমে অতিরিক্ত যাত্রীর চাপ থাকলে ভাড়া দ্বিগুণ হয়।
বৃহস্পতিবার দুপুরে সদরঘাট থেকে গুলিস্তান আসার পথে কথা হয় কোচোয়ান মো.
জিসানের সঙ্গে। ব্যস্ত সড়কে ডানে-বাঁয়ে চলতে হিমশিম খাচ্ছিল ঘোড়াগুলো। একটু
পরপরই জিসানের বেতের বাড়ি পড়ছিল ঘোড়ার পিঠে। এভাবে অমানবিকভাবে বেতের বাড়ি
দেওয়ার বিষয়ে কথা বললে তিনি জানান, ঘোড়াকে ইঙ্গিত করার এটাই একমাত্র উপায়।
এটি ছাড়া ঘোড়া কথা শুনবে না। তিনি বলেন, 'আমরা ছোটকাল থেকে এই কাজে আছি।
ঘোড়া কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হয় জানি।'
চাঁনখারপুল এলাকায় মেয়র মোহাম্মদ হানিফ উড়াল সড়কের নিচে গিয়ে দেখা যায়,
সড়কের পাশে রয়েছে সাতটি গাড়ি। কয়েকটি ঘোড়া উড়ালসড়কের নিচে খাবার খেতে
ব্যস্ত, কোনোটি আবার বিশ্রামে। পাশেই গাড়ির যন্ত্রাংশ মেরামত করছিল পাঁচ
শ্রমিক। ষোলো বছর বয়সী মো. হাসান জানায়, সে নিয়ন্ত্রণ করে একটি গাড়ি;
অর্থাৎ সে একজন কোচোয়ান। হাসানের ভাষ্যমতে, দুটি ঘোড়া দিয়ে দিনে প্রতিটি
গাড়ি ১৪ বার গুলিস্তান-সদরঘাট রুটে যাওয়া-আসা করে। তার এবং হেলপারের বেতন
৪০০ টাকা করে। গাড়ির নানা যন্ত্রাংশ বিকল হয়ে পড়ায় ঘোড়াগুলো বিশ্রামে।
প্রতিদিনই কোনো না কোনো গাড়ি বিকল থাকে। ফলে কয়েকটি ঘোড়া বিশ্রামের সুযোগ
পায়।
ঢাকা ঐতিহ্যবাহী শিপন টমটমের মালিক আলী আজগরের আছে দুটি গাড়ি। তিনি বলেন,
'প্রায় আড়াই লাখ টাকায় চারটি ঘোড়া কিনেছিলাম। আমার দুটি গাড়ি সকাল ৯টা থেকে
সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত যাত্রী বহন করে। দুই কর্মীর বেতন এবং ঘোড়ার খাবার
বাবদ এক হাজার ২০০ টাকার মতো খরচ হয়। মাঝে মধ্যে বিয়েশাদির প্রোগ্রামে ডাক
পড়লে ঢাকার বাইরেও যাওয়ার সুযোগ পায় ঘোড়াগুলো।'
পিপল ফর অ্যানিম্যাল ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান স্থপতি রকিবুল হক
এমিল বলেন, 'একটি যান্ত্রিক নগরে মোটরগাড়ির সঙ্গে এই পুরনো পেশিশক্তির বাহন
কতটা যুক্তিযুক্ত, সেটি নিয়ে প্রশ্ন তোলার সময় এসেছে। ঘোড়ার শ্রম সরকারের
দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তরের নজরদারিতে আনা জরুরি। তবে এ
মুহূর্তে ঘোড়ার শ্রম বন্ধ করলে এর সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের পরিবারের
বিষয়েও ভাবতে হবে।'
তিনি আরও বলেন, ঘোড়ার গাড়ি নিয়ে অনেকে ঐতিহ্যের কথা বলেন। কিন্তু ঘোড়ার
শ্রম নিয়ে অমানবিকতার বিষয়ে কেউ বলেন না। শহর এবং গ্রামে ঘোড়া দিয়ে অধিক
যাত্রী বহন, অসুস্থ ও আহত ঘোড়া দিয়ে যাত্রী বহন, চিকিৎসার অভাব, মরণাপন্ন
ঘোড়াকে রাস্তায় ফেলে চলে যাওয়ার মতো নির্মমতাও নীরবে ঘটে চলেছে।
জানা গেছে, ঢাকার বাইরে কক্সবাজার ও কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতে বেশকিছু ঘোড়া
বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহূত হচ্ছে। তবে ওখানেও ঘোড়াগুলো নির্যাতনের শিকার।
প্রাণীগুলো তাদের যোগ্য প্রতিদান পাচ্ছে না।
গত ৭ জুলাই সংসদে পাস হয় 'প্রাণী কল্যাণ আইন ২০১৯'। পশুর প্রতি নিষ্ঠুরতা
প্রতিরোধে একশ' বছরের পুরনো আইন বাতিলের পর প্রণীত নতুন আইনে প্রাণী হত্যা ও
নির্যাতনের অপরাধে কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান করা হয়।
বিশ্ব প্রাণী দিবস আজ : ৪ অক্টোবর বিশ্ব প্রাণী দিবস। বাংলাদেশে সরকারি
উদ্যোগে এ দিবসে কোনো আয়োজন নেই। তবে পিপল ফর অ্যানিম্যাল ওয়েলফেয়ার
ফাউন্ডেশন দিবসটি পালনের উদ্যোগ নিয়েছে। আজ সকাল সাড়ে ১০টা থেকে দুপুর ১২টা
পর্যন্ত জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মনববন্ধন কর্মসূচি পালিত হবে।
নির্যাতিত প্রাণি বিশেষ করে ঘোড়া এবং ঘোড়ার শ্রমের ওপর প্রাণী কল্যাণ আইনের
নীতিমালা গ্রহণ এবং প্রশাসনের নজরদারির দাবিতে এ কর্মসূচির আয়োজন করা
হয়েছে বলে জানা গেছে।
- বিষয় :
- বিশ্ব প্রাণী দিবস
