ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রূপনগর ট্র্যাজেডি

খেলার সাথিরে মনে পড়ে

খেলার সাথিরে মনে পড়ে
×

ইন্দ্রজিৎ সরকার

প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০১৯ | ১৩:৩৫

প্রতিদিন দেখা হতো ওদের। একসঙ্গে খেলত, দুষ্টুমি করত। আর যখন সেই বেলুনওয়ালা ভ্যান নিয়ে আসতেন, তাকে ঘিরে ধরত সবাই। কেউ গ্যাসভরা বেলুন কিনত। আবার কেউ কিনতে না পেরে শুধুই লোভাতুর দৃষ্টিতে চেয়ে থাকত রঙিন বেলুনগুলোর দিকে। সেই জায়গাটিতে গতকালও তারা তাকিয়ে ছিল। প্রিয় খেলার সাথিকে খুঁজে ফিরছিল তাদের চোখ। তবে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ম্ফোরণে হতাহতের ঘটনাস্থলটিতে ছিল শুধুই বিষাদের ছায়া। আগের দিনের মর্মান্তিক দুর্ঘটনার স্মৃতিবহ ভাঙা কাঠের টুকরা, ছেঁড়া কাপড় আর স্যান্ডেল পড়ে ছিল সেখানে। প্রিয় সহচরের এমন হৃদয়ভাঙা আকস্মিক মৃত্যু তাদের স্তব্ধ করে দিয়েছে। অনেক কিছুই তারা বলতে চেয়েছে, পারেনি। কিন্তু তাদের চোখমুখে ফুটে উঠেছিল খেলার সাথির জন্য শোকগাথা। রাজধানীর রূপনগরে সিলিন্ডার বিস্ম্ফোরণের জায়গাটিতে গতকাল বৃহস্পতিবার গিয়ে দেখা যায় এমন চিত্র। এলাকার কৌতূহলী মানুষের সঙ্গে সেখানে ভিড় করেছিল স্থানীয় শিশুরাও।

বুধবারের দুর্ঘটনায় হতাহত সব শিশুই দরিদ্র পরিবারের সন্তান। তাদের বাবা-মায়েরা শ্রমজীবী। স্থানীয় বিভিন্ন বস্তিতে থাকেন তারা। মৃত সন্তানের দাফনের টাকাও নেই তাদের হাতে। এ পরিস্থিতিতে তারা সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা আশা করছেন। সেই সঙ্গে তারা বলেছেন, এমন মর্মান্তিক মৃত্যু যেন আর কারও না হয়। আর কোনো মা-বাবার বুক যেন খালি না হয়। এ ক্ষেত্রে তারা গ্যাস সিলিন্ডারের অবাধ বিক্রি ও যথেচ্ছ ব্যবহার ঠেকাতে সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষকে উদ্যোগী হওয়ার তাগিদ দিয়েছেন।

এদিকে বিস্ম্ফোরণে আহতদের মধ্যে নিহার উদ্দিন (৮) নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে মৃতের সংখ্যা দাঁড়াল ৭। গতকাল বৃহস্পতিবার ময়নাতদন্ত শেষে তাদের লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এ ঘটনায় বেলুন বিক্রেতা আবু সাঈদকে আসামি করে মামলা করেছে পুলিশ।

সে মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। এ ঘটনায় ঢাকা মহানগর পুলিশ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তিন সদস্যবিশিষ্ট কমিটির প্রধান হলেন ডিআইজি শেখ নাজমুল আলম।

ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার কৃষ্ণপদ রায় জানান, এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কোন সংস্থার কী ভূমিকা, তা নিরূপণ করবে ওই কমিটি। পাবলিক প্লেসে যাতে বেলুনে কেউ গ্যাস ভরতে না পারে, সে ব্যাপারে গতকাল মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

রূপনগর থানার ওসি আবুল কালাম আজাদ সমকালকে বলেন, বিস্ম্ফোরক আইন ও অপরাধজনিত হত্যার অভিযোগ এনে বেলুন বিক্রেতার বিরুদ্ধে মামলা করেছেন এসআই সুমন বড়ূয়া। এ মামলার আসামি নিজেও বিস্ম্ফোরণে গুরুতর আহত হন। তাকে পুলিশ হেফাজতে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। সেরে উঠলে তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বুধবার বিকেলে রাজধানীর রূপনগর আবাসিক এলাকার ১১ নম্বর সড়কের পূর্ব প্রান্তে বেলুনে গ্যাস ভরে বিক্রি করছিলেন আবু সাঈদ। এ সময় তাকে ঘিরে ভিড় জমিয়েছিল স্থানীয় শিশুর দল। হঠাৎ তার গ্যাস সিলিন্ডারটি বিস্ম্ফোরিত হয়ে আগুন ধরে যায়। আহত হয় প্রায় ৩০ জন। তাদের মধ্যে কারও হাত-পা উড়ে যায়, কারও নাড়ি-ভুঁড়ি বেরিয়ে আসে।

বিস্ম্ফোরণে আহত ছয়জন এখনও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তাদের মধ্যে ৫ বছরের শিশু মিজানের অবস্থা সংকটাপন্ন। হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) তার চিকিৎসা চলছে। অপর পাঁচজনের মধ্যে রয়েছেন বেলুন বিক্রেতা আবু সাঈদ, হাত হারানো গৃহকর্মী জান্নাত, ৯ বছরের শিশু জনি, ১১ বছর বয়সী সিয়াম ও রিকশাচালক জুয়েল। ঢামেক হাসপাতালের চিকিৎসক আলাউদ্দিন জানান, মিজান ছাড়াও আহত জনি ও আবু সাঈদের আঘাত গুরুতর। বাকিদের শারীরিক অবস্থা কিছুটা উন্নতির দিকে, তবে কেউই শঙ্কামুক্ত নয়।

কী বলতে চেয়েছিল নিহার? :ঢামেক হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন ছিল বিস্ম্ফোরণে গুরুতর আহত ৮ বছরের নিহার। বুধবার বিকেলে আহত হওয়ার পর থেকে কথা বলতে কষ্ট হচ্ছিল তার। সন্ধ্যার পর আর কথা বলতেই পারছিল না। তখন সে হাত-পা নেড়ে স্বজনদের কিছু বোঝানোর চেষ্টা করে। তবে তার ইশারা বোঝেননি স্বজনরা। আর কোনোদিন বুঝতেও পারবেন না- কী বলতে চেয়েছিল ছোট্ট শিশুটি। গতকাল সকাল ৭টার দিকে মৃত্যু হয়েছে তার।

নিহারের বাবা সারোয়ার হোসেন পেশায় রিকশাচালক। কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, তার ছেলের চোখ, মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন জায়গায় আঘাত ছিল। ওই ঘটনার সময় তিনি বাসায় ছিলেন না। খবর পেয়ে দ্রুত ছুটে আসেন। তবে ছেলের সঙ্গে আর কথা হয়নি তার।

পরিবারের সঙ্গে রূপনগরের শিয়ালবাড়ি এলাকায় থাকত নিহার। চার ভাই-বোনের মধ্যে সে ছিল সবার ছোট। তার বড় বোন শিউলি কলেজে পড়েন। তাদের মায়ের নাম হালিমা বেগম। গ্রামের বাড়ি নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলার ডাকলাজুরা এলাকায়।

শুধু একবার 'আব্বা' বলেছিল রিয়া :বুধবার বিকেলে যখন সিলিন্ডার বিস্ম্ফোরণ হয়, তখন শিয়ালবাড়ি বস্তির ঘরেই ছিলেন রিকশাচালক মিলন মিয়া। তার ৮ বছরে মেয়ে রিয়া মণি একটি বেলুন এনে ঘরে রেখে আবার বের হয়। এর কিছু সময় পরই প্রচণ্ড শব্দ পেয়ে মিলন ঘর থেকে বের হন। এর পর সড়কে গিয়ে দেখেন সেই মর্মান্তিক দৃশ্য। বিস্ম্ফোরণে নাড়ি-ভুঁড়ি বেরিয়ে আসা রিয়া তখন ছটফট করছিল। দ্রুত তাকে কোলে তুলে নেন মিলন। অতি কষ্টে শুধু একটি শব্দই উচ্চারণ করে মেয়েটি- আব্বা। এর পরই নিথর হয়ে যায় সে।

মিলন মিয়া ও তার স্ত্রী মদিনা বেগম জানান, স্থানীয় ব্র্যাক স্কুলের প্রথম শ্রেণিতে পড়ত রিয়া। তাদের গ্রামের বাড়ি নেত্রকোনার আটপাড়ায়।

রিয়ার মামা মোস্তাক আলী বলেন, 'আমাগোর যে ক্ষতি হইছে, তা তো পূরণ হইব না। কিন্তু এইভাবে যেন আর কোনো বাচ্চা মারা না যায়।'

মুখ থুবড়ে পড়েছে নূপুরের পরিবারের স্বপ্ন :রূপনগরে কামরুলের বস্তির বাসিন্দা সুরমা আক্তার পেশায় গৃহকর্মী। তার বড় মেয়ে সুমাইয়া আক্তার পোশাক কারখানায় কাজ করে চার হাজার টাকা বেতন পান। মা-মেয়ের সামান্য আয়ে টেনেটুনে চলে সংসার। এর মধ্যেই কষ্ট করে ছোট মেয়ে নূপুরকে পড়ালেখা করাচ্ছিলেন সুরমা। মেয়েকে ঘিরে অনেক আশা ছিল তার। একদিন সে বড় হয়ে সংসারের হাল ধরবে, হাসি ফুটবে পরিবারের সবার মুখে। কিন্তু বুধবার বিকেলে বেলুনের গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ম্ফোরণে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে গেছে ১১ বছর বয়সী নূপুরের দেহ। সেই সঙ্গে মুখ থুবড়ে পড়েছে পরিবারটির স্বপ্ন।

মর্গের সামনে আহাজারি, রূপনগরে শোকের ছায়া :শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে ছয় শিশুর লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। সেখানে গতকাল ছিল শুধু কান্না আর আহাজারি। অন্যদিকে রূপনগরের ১১ নম্বর সড়কে দুর্ঘটনাস্থলের আশপাশের বস্তিতে ছিল শোকের ছায়া। যাদের সন্তান হতাহত হয়েছে, তারা ছাড়াও অন্য বাসিন্দারা এমন আকস্মিক ঘটনায় শোকাহত।

স্বজনরা জানান, নিহতদের মধ্যে ৮ বছরের রিফাত মাদ্রাসায় দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ত। তার বাবা রোকন মিয়া প্রবাসী। শিয়ালবাড়ি বস্তিতে মা লাভলী বেগমের সঙ্গে থাকত শিশুটি। তিন ভাইয়ের মধ্যে সে ছিল ছোট। তার গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে।

প্রথম শ্রেণি পড়ূয়া ৭ বছরের ফারজানার বাবা আবু তাহের পেশায় রিকশাচালক। তাদের গ্রামের বাড়ি ভোলা সদরের বাপ্তা গ্রামে। নিহত রমজান আলী (১১) স্থানীয় মাদ্রাসায় পড়ত। তার গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার কোনাপাড়ায়। তার চাচা মরম আলী মর্গ থেকে লাশ বুঝে নেন।

এসব দেখার কেউ নেই? :অবৈধভাবে ত্রুটিপূর্ণ গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহারের কারণেই এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে বলে মনে করছেন নিহতের স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা। তারা বলছেন, এর আগেও বিভিন্ন সময়ে বেলুন ফোলানোর সময় সিলিন্ডার বিস্ম্ফোরণে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। বারবার এমন ঘটনা ঘটলেও কেন ব্যবস্থা নিচ্ছে না প্রশাসন?

নিহত রিফাতের মামা নুরুল আলম বলেন, ওই লোক অনেক দিন ধরেই সেখানে বেলুন বিক্রি করে আসছিলেন। তবুও কেউ তাকে নিষেধ করেনি। যার ফলে এমন প্রাণহানি হলো। এসব দেখার কি কেউ নেই?

তার সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে অপর স্বজনরা দাবি করেন, সিলিন্ডারের নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করতে সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষকে উদ্যোগ নিতে হবে।

এদিকে সিলিন্ডার প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলো যথাযথভাবে মানসম্মত পণ্য তৈরি করছে কি-না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছে সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন নামে একটি সংগঠন। সংগঠনের দপ্তর সম্পাদক বিপ্লব চাকমা স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সিলিন্ডার তৈরির প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা ও তদারকির দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি নিহতদের ক্ষতিপূরণ ও আহতদের সুচিকিৎসার দাবি করেন তারা।

অভাবী পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান :হতাহত প্রতিটি শিশুই দরিদ্র পরিবারের। কারও বাবা রিকশাচালক, কারও মা গৃহকর্মী। কেউ আবার সেলাইয়ের কাজ করেন। এই পরিবারগুলোকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্বজনরা। এর মধ্যে অবশ্য কিছু সহায়তা তারা পেয়েছেন। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহত শিশুদের লাশ দাফনে পরিবারগুলোকে ২০ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে। আর আহতদের চিকিৎসার জন্য দেওয়া হয়েছে ১০ হাজার টাকা করে। এ ছাড়া স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোবাশ্বের হোসেন চৌধুরী নিহতদের পরিবারকে ২০ হাজার টাকা করে দিয়েছেন।

আরও পড়ুন

×