সড়ক পরিবহন আইন কার্যকর: কড়াকড়ি ছিল না প্রথম দিনে
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০১৯ | ১১:৩৪
শুক্রবার থেকে কার্যকর হয়েছে বহুল আলোচিত সড়ক পরিবহন আইন। এই আইনে সড়কে নিয়ম ভঙ্গে জরিমানা বেড়েছে দশ থেকে হাজার গুণ। তাই আইনটি কার্যকরের পর কী প্রতিক্রিয়া হবে তা নিয়ে প্রশ্ন ছিল। তবে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সমকালকে নিশ্চিত করেছে, এখনই কঠোর হবে না সরকার। আগে সচেতনতা সৃষ্টি করা হবে, তারপর সর্বোচ্চ জেল-জরিমানা করা হবে।
শুক্রবার ছুটির দিনে রাজধানীর ফাঁকা সড়ক ঘুরে দেখা যায় নতুন আইন কার্যকরে তেমন তোড়জোড় নেই। ধানমণ্ডির শংকরে পুলিশের একজন ট্রাফিক সার্জেন্টকে দেখা গেল, গাড়ির কাগজ পরীক্ষা করে চালকদের সতর্ক করে ছেড়ে দিচ্ছেন। তিনি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বললেন, আগে প্রাইভেট কারের চালক সিটবেল্ট না বাঁধলে জরিমানা ছিল ২০০ টাকা। এখন তা সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার টাকা। হঠাৎ এত জরিমানা করলে, মানুষ দিতে পারবে না। তাই আগে সচেতন করা হচ্ছে। ড্রাইভিং লাইসেন্সসহ গাড়ির সব কাগজ হালনাগাদ রাখার পরামর্শ দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। তিনি জানান, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশেই তিনি এ সহনশীলতা দেখাচ্ছেন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম সমকালকে বলেছেন, নতুন আইনে জরিমানা অনেক। হঠাৎ এত বড় অঙ্কের জরিমানা করলে মানুষ প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। তাই আগে সচেতনতা সৃষ্টির ওপর জোর দিচ্ছে পুলিশ।
ডিএমপি কমিশনার জানান, রোববার থেকে রাজধানীর সব মোড়ে মোড়ে নতুন আইন এবং জেল- জরিমানা বৃদ্ধির বিষয়টি জানিয়ে মাইকিং করা হবে। চালক, যাত্রী ও পথচারীদের সচেতনতা বাড়াতে লিফলেট বিতরণ করা হবে।
সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় ও সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) সূত্র সমকালকে জানিয়েছে, আইনটি বহুল আলোচিত হলেও, মাত্র সাত দিন সময় দিয়ে কার্যকর করা হয়েছে। চালক, মালিক, যাত্রী, পথচারীরা এখনও বিস্তারিত জানেন না। তাই আগে সবাইকে আইন সম্পর্কে অবহিত করা হবে। তারপর কঠোর হবে সরকার।
মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আপাতত ধীরে চলো নীতিতে চলা হবে। একই তথ্য জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের একজন উপ-কমিশনার। তবে তারা কেউ নাম প্রকাশ করে বক্তব্য দিতে রাজি হননি।
সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, সড়ক-মহাসড়কের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনাই প্রধান চ্যালেঞ্জ। তাই সড়ক পরিবহন আইন করা হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে আরও একটি প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। এখন আমরা আটঘাট বেঁধেই নেমেছি। অবকাঠামোগত সমস্যাও কোথাও নেই। উন্নয়ন যথেষ্ট হয়েছে। শৃঙ্খলা না থাকলে উন্নয়নের কোনো দাম নেই।
মোটরযান অধ্যাদেশ-১৯৮৩ অনুযায়ী গাড়িতে হাইড্রোলিক হর্ন ব্যবহারে সর্বোচ্চ সাজা ছিল ২০০ টাকা। নতুন আইনে এ অপরাধে সর্বোচ্চ জরিমানা ১০ হাজার টাকা। অথবা তিন মাস কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। এ ছাড়া চালকের লাইসেন্সে থাকা ১২ পয়েন্টের মধ্যে ১ পয়েন্ট কাটা যাবে। বৃহস্পতিবার রাজধানীতে ১৯৬টি মামলা হয় হাইড্রোলিক হর্ন ব্যবহারের অপরাধে। কিন্তু শুক্রবার এ সংখ্যা কমে গেছে।
গত বছরের ২৯ জুলাই রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে বেপরোয়া বাসের চাপায় দুই কলেজ শিক্ষার্থী নিহত হন। এ ঘটনার বিচারের দাবিতে সারাদেশে রাস্তায় নেমে আসে শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনের মুখে ওই বছরের ৫ আগস্ট মন্ত্রিসভার অনুমোদন পায় আট বছর ঝুলে থাকা সড়ক পরিবহন আইন। সেপ্টেম্বরে সংসদে পাসের পর গত ৮ অক্টোবর গেজেট আকারে প্রকাশ পায়। প্রায় এক বছর আটকে থাকার পর প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে আইনটি শুক্রবার থেকে কার্যকর হয়।
আট বছর নানা আলোচনা হলেও, চালকরা বলছেন তারা জানেন না আইন কার্যকর হয়েছে। মোহাম্মদপুর-মতিঝিল রুটের 'সিটি বাস'-এর চালক জাকির হোসেন সমকালকে বলেছেন, তিনি ফেসবুকে দেখেছেন একটি আইন হয়েছে। শুনেছেন জেল-জরিমানা বেড়েছে। কিন্তু কোন অপরাধে কী শাস্তি জানেন না। সিএনজি অটোরিকশা চালক মো. ওয়ালি উল্লাহ সমকালকে বলেছেন, এমন কিছু শোনেননি।
চালকরা না জানলেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে নতুন আইন নিয়ে। আগের আইনে সড়কে নিয়ম ভঙ্গে জরিমানা কত ছিল, নতুন আইনে জরিমানা কত হয়েছে- সমকালে প্রকাশিত এমন গ্রাফিপ ভাইরাল হয়েছে নেট দুনিয়ায়। কেউ বলছেন, নতুন আইন খুব বেশি কঠোর। এত জরিমানা দিতে পারবেন না গাড়ির চালক-মালিকরা। আবার কেউ বলছেন, সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে এমন কঠোর আইনের প্রয়োজন।
নতুন আইন নিয়ে সবচেয়ে উৎকণ্ঠায় আছেন মোটরসাইকেল চালক এবং অ্যাপে যাত্রী পরিবহন করা চালকরা। জাহিদুর রহমান নামে এক মোটরসাইকেল চালক বলেছেন, হেলমেট না থাকলে ১০ হাজার টাকা জরিমানা! এটা অনেক বেশি।
অ্যাপের মাধ্যমে যাত্রী পরিবহন করা প্রাইভেটকারের চালক ইউসুফ হোসেন বলেছেন, তাকে যাত্রীর সন্ধানে সারাদিনই রাস্তায় থাকতে হয়। ঢাকায় পার্কিংয়ের জায়গা নেই। কিন্তু নতুন আইনে যত্রতত্র পার্কিংয়ের সাজা পাঁচ হাজার টাকা। যা তার পাঁচ দিনের আয়ের সমান।
- বিষয় :
- সড়ক পরিবহন আইন