ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

রংতুলিতে প্রকাশ পেল মনের ক্ষত

রংতুলিতে প্রকাশ পেল মনের ক্ষত
×

মানসিক আঘাত সারাতে রাজধানীর উত্তরার মাইলস্টোন স্কুলে কাউন্সেলিং করানো হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে ছবি আঁকতে দেওয়া হয়েছিল শিশুদের। বোর্ডে টানানো ১৬টি ছবির পাঁচটিতেই দেখা যায় যুদ্ধবিমান। বুধবার তোলা

বকুল আহমেদ

প্রকাশ: ৩১ জুলাই ২০২৫ | ১০:০৩

‘মিস, আমি আপনাকে অনেক অনেক ভালোবাসি। মাসুকা মিস, আই লাভ ইউ।’ রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়ীর মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী রিমি এই চিঠি লিখেছে। স্কুলটির ওপর বিমান বিধ্বস্ত হয়ে নিহত হয়েছেন তার শিক্ষিকা মাসুকা বেগম। এর আগে ঝুঁকি নিয়ে অনেক শিশুকে উদ্ধার করেন তিনি।

গতকাল বুধবার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের একটি কাউন্সেলিং কক্ষে গিয়ে এই চিঠি দেখা গেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির প্রধান ফটকে প্রবেশ করতেই হাতের ডান পাশে একটি লম্বা টিনশেড চোখে পড়ে। সেখানে ট্রমা কাটাতে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের কাউন্সেলিং করানো হচ্ছে। 

গতকাল অন্তত ৪০ শিক্ষার্থী ও অভিভাবককে কাউন্সেলিং করানো হয়। একটি খোলা কক্ষের দরজায় দাঁড়ালে বাঁ পাশের বোর্ডে চোখ আটকে যায়। তাতে কাগজে আঁকা নানা রকম ছবি সাঁটানো। সেখানেই এক পাশে ছিল চিঠিটি।

বোর্ডে সাঁটানো ছিল কয়েকটি হাতে আঁকা ছবিও। প্রকৃতির মাঝে ঘরবাড়ি, নদী-নালা, আকাশ, মেঘ, ফুল, গাছগাছালি আরও কত কী! নানা রঙে আঁকা। স্কুল ভবনের সামনে বিধ্বস্ত বিমানের ছবিও এঁকেছে কেউ কেউ। এ ছাড়া আরও তিনটি বিমানের ছবি আছে। সেগুলো ভবনের ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে। শিশুরা হয় তো চায়, বিমান ভবনের ওপর দিয়েই যেন চিরকাল উড়ে যায়! কোনো কোনো ছবির পাশে যে এঁকেছে তার নাম, শ্রেণি ও স্কুল কোড লেখা।

শিক্ষকরা জানান, কাউন্সেলিংয়ে অংশ নেওয়া শিশু শিক্ষার্থীদের অনেকে সেখানে ছবি আঁকছে। কেউ চিঠি লিখছে। সেসব টানিয়ে রাখা হচ্ছে বোর্ডে। গতকাল তাতে ১৬টি ছবি দেখা যায়।

আনজুম নামে এক শিশু এঁকেছে বিধ্বস্ত বিমানের ছবি ও স্কুল ভবন। ছবিতে দেখা যায়, একটি দোতলা ভবনের সামনে সারিবদ্ধ নারকেল গাছ। ভবনের মাঝবরাবর সামনে বিমান আছড়ে পড়েছে। মাইলস্টোনের হায়দার আলী একাডেমি নামের ভবন, এর সামনে সারিবদ্ধ নারকেল গাছ এবং বিধ্বস্ত বিমানের ছবিই যেন আঁকার চেষ্টা করেছে এই শিশু।
গত ২১ জুলাই দুপুরে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর যুদ্ধবিমান মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ চত্বরে আছড়ে পড়ে হায়দার আলী একাডেমিক ভবনের সামনে চলে যায়। সঙ্গে সঙ্গে অগ্নিকাণ্ড ঘটে বিমান ও ভবনটিতে। এতে গতকাল পর্যন্ত শিশুসহ ৩৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত রয়েছেন অনেক। এ ঘটনায় শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনেকে ট্রমাটাইজড হয়ে যায়। সেই বিকট শব্দ, আগুন, বাঁচাও-বাঁচাও চিৎকার, লাশ, পোড়া দেহ, অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন ভুলতে পারছেন না অনেকে। চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছে সেসব দৃশ্য। ট্রমা কাটাতে দিয়াবাড়ীর মাইলস্টোনে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও কর্মচারীদের কাউন্সেলিং করানো হচ্ছে। এ পর্যন্ত অন্তত ২০০ শিক্ষার্থী ও অভিভাবক কাউন্সেলিংয়ের আওতায় এসেছেন।

গতকাল বেলা সাড়ে ১১টার দিকে মোহাম্মদ শামীম ও সৈয়দা আফরোজা দম্পতি তাদের দুই শিশু সন্তানকে মাইলস্টোনে নিয়ে যান। তাদের বাসা উত্তরা ১১ নম্বর সেক্টরে। দুই শিশুর মধ্যে মায়ামিন মিহির তৃতীয় শ্রেণি এবং আরমান শামীম নিয়ন স্কুলটির সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। ঘটনার দিন দুজনে স্কুলে ছিল। তবে তারা ঘটনাস্থল থেকে দূরে থাকায় রক্ষা পেয়েছে। যে স্কুল ভবনে অগ্নিকাণ্ড ঘটেছিল, সেটিতে মিহিরের শ্রেণিকক্ষ। ঘটনার মিনিট তিনেক আগে বাবার সঙ্গে শিশুটি চলে এসেছিল।

বাবা মোহাম্মদ শামীম সমকালকে জানান, ছোট ছেলেকে নিয়ে স্কুল ভবন থেকে বের হয়ে আরেক ভবনে বড় ছেলে নিয়নের কাছে যান। তখনই বিকট শব্দ শুনতে পান। তাকিয়ে দেখেন, কালো ধোঁয়া। আগুন। বাঁচাও, বাঁচাও চিৎকার। সেই দৃশ্য বড় ছেলে নিয়ন এখনও ভুলতে পারছে না। ভয় পাচ্ছে। সেই দিনের ঘটনা তার মনে আসছে সব সময়। ভয়ে স্কুলে যাবে না বলে জানিয়েছে। তাই তাকে কাউন্সেলিং করানোর জন্য নিয়ে এসেছেন। পাশাপাশি ভয় কাটাতে স্কুল চত্বরে দুই ছেলেকে নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন। তিনি বলেন, ‘পোড়া স্কুল ভবনে নিয়ে গেছি দুই ছেলেকে। বড় ছেলে বলছে, আব্বু পোড়া গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। মিনিট দুয়েক অবস্থান করার পর সেখান থেকে সরে আসি।’

মাইলস্টোন স্কুলের শিক্ষক জেসমিন সুলতানা জানান, যে স্কুল ভবনে অগ্নিকাণ্ড ঘটেছিল, সেটিতে ক্লাস নিতেন তিনি। ঘটনার দিনও তিনি স্কুল ভবনে ছিলেন। তবে প্রাণে রক্ষা পেয়েছেন। পাশের ভবনে তাঁর ছেলে একই স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র মোহতাসিম রাজ্য ক্লাস করছিল। তিনি আগুন লাগা ভবন থেকে উদ্ধার হওয়ার পর ছেলের কাছে যান। ছেলেকে অন্য শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একটি কক্ষে রাখেন। তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে এখনও আমাকে জিজ্ঞেস করে, আম্মু তুমি ভালো আছ? আগুনে তোমার কিছু হয়নি তো।’ তিনি কীভাবে আগুনের ভেতর থেকে বের হলেন, সুস্থ আছেন কিনা– এসব নিয়ে ছেলে অনেক ভাবে। তাই তাকে নিয়ে স্কুলে এসেছেন। তাঁর সঙ্গেই ছিল সারাদিন। তাকে কাউন্সেলিং করাবেন।

বিমান বিধ্বস্তের পর গতকাল দিয়াবাড়ী মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের কার্যক্রম আংশিক শুরু হয়েছে। অনলাইনে কলেজে ভর্তির আবেদন নেওয়া হচ্ছে। একাডেমিক ভবন-১-এর গ্রাউন্ড ফ্লোরে তিনটি বুথ বসিয়ে এই কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। সেখানে দায়িত্বরত কলেজ শাখার শিক্ষক ইব্রাহিম মিয়া দুপুরে জানান, অনেক অভিভাবক ও শিক্ষার্থী আসছেন। শিক্ষার্থীদের ভর্তির বিষয়ে নানা পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

গতকাল দিয়াবাড়ী মাইলস্টোনের সব শিক্ষকের কাউন্সেলিং করানো হয়। গতকাল সন্ধ্যায় মাইলস্টোনের ফেসবুক পেজে একটি পোস্টে বলা হয়, মাইলস্টোন কলেজে বিমান বিধ্বস্তের মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পরবর্তী কার্যক্রম হিসেবে দুপুর আড়াইটায় দিয়াবাড়ী ক্যাম্পাসে শিক্ষকদের কাউন্সেলিং অনুষ্ঠিত হয়। এই পর্বে শিক্ষার্থীদের মানসিক পুনর্গঠন ও প্রণোদনা দানে প্রস্তুতি ও করণীয় সম্পর্কে পরামর্শ দেওয়া হয়।

এ বিষয়ে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ সমকালকে বলেন, ‘ওদের স্মৃতির মধ্যে দুর্ঘটনার দৃশ্য গেঁথে আছে। সেই দৃশ্য তাদের মনে ভেসে আসছে। এ কারণে তারা সেই দৃশ্য আঁকছে। এই চিঠি বা ছবি আঁকা স্বাভাবিক। এর মধ্য দিয়ে ট্রমা ভেন্টিলেশন হয়ে যাচ্ছে। এতে মনের ক্ষতগুলোর উপশম হবে। আস্তে আস্তে তাদের জীবনমুখী ছবির দিকে আগ্রহ করে তুলতে হবে। ধীরে ধীরে তারা ঠিক হয়ে যাবে।’

বার্ন ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন ৩২ জন
মাইলস্টোনের দগ্ধদের মধ্যে আরও একজনকে ছাড়পত্র দিয়েছেন চিকিৎসকরা। তাঁর নাম ফারজানা ইয়াসমিন (৪৫)। মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক তিনি। এখনও আইসিইউতে ভর্তি দুজন। গতকাল দুপুরে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন। তিনি জানান, মঙ্গলবার আইসিইউতে তিনজন ছিল। তাদের মধ্যে একজনের শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হওয়ায় গতকাল তাকে এইচডিইউতে স্থানান্তর করা হয়েছে। মোট ৩২ রোগী চিকিৎসাধীন। তাদের মধ্যে ২৭ শিশু। এর মধ্যে তিনজন ক্রিটিক্যাল ক্যাটেগরিতে, আর এর চেয়ে কম গুরুতর সাতজন রয়েছে সিভিয়ার ক্যাটেগরিতে। বাকিরা অন্যান্য ওয়ার্ড ও কেবিনে রয়েছে। ৩২ জনের মধ্যে ১৪ জনের শারীরিক অবস্থা উন্নতির দিকে। বাকিরা স্থিতিশীল। ঘটনার পর থেকে গতকাল পর্যন্ত এ সব রোগীকে একাধিকবারসহ সব মিলিয়ে ১৫৮টি ছোট-বড় অস্ত্রোপচার করা হয়েছে।

আরও পড়ুন

×