‘মৌসুমি যাইরে’ মেজো আপুর এটাই ছিল শেষ কথা
রাজধানীর মিরপুরের অগ্নিকাণ্ডে নিহত নার্গিস আক্তারের ছোটবোন মৌসুমি আক্তার। ছবি: সমকাল
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৫ | ১১:৫৭
‘মৌসুমি যাইরে…’—ছোট বোন মৌসুমির সঙ্গে এটাই ছিল নার্গিস আক্তারের জীবনের শেষ কথা। এরপরই আগুনে পুড়ে নিভে যায় তার সব স্বপ্ন, সব আলো।
১৮ বছর বয়সী নার্গিস ছিলেন চার বোনের মধ্যে দ্বিতীয়। গত বছর মিরপুরের শহীদ বুদ্ধিজীবী স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এইচএসসি শেষ করেন। উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন ছিল, কিন্তু দোকানি বাবা মো. ওজুউল্লাহর আয়ে সংসার চলতো না। তাই সংসারের হাল ধরতে বাবার নিষেধ অমান্য করে রাজধানীর মিরপুরের শিয়ালবাড়ির একটি পোশাক কারখানায় যোগ দেন তিনি। মাত্র ১৩ দিন হলো কাজ শুরু করেছিলেন।
গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে ওই কারখানা সংলগ্ন রাসায়নিকের গুদামে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধ হয়ে মারা যান নার্গিস। রাত তিনটার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) মর্গে তার মরদেহ শনাক্ত করেন পরিবারের সদস্যরা।
আজ বুধবার সকাল নয়টার দিকে ঢামেকের জরুরি বিভাগের সামনে কান্নায় ভেঙে পড়েন ছোট বোন মৌসুমি। বারবার বলছিলেন, আমার মেজো আপুটা সকালে কাজে যেত, রাতে ফিরতো। ফোন ব্যবহার করত না—বলারও সুযোগ পেতাম না। গতকাল ছিল তার চাকরিতে যোগ দেওয়ার ১৩তম দিন, আজ আর ফিরল না।
একই কলেজে পড়া মৌসুমিও এবার এইচএসসি দিয়েছে। বড় বোনের লাশ ছুঁয়ে দেখার জন্য সে বারবার ব্যাকুল হয়ে উঠছিল। বলছিল, “আমার বোন বেকার বসে থাকেনি, আমাদের লেখাপড়া চালিয়ে যেতে চেয়েছিল। এখন আমরা কাকে বলব আমাদের সব কথা?”
নার্গিসের ছোট বোন ফাতেমা পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। ফাতেমাকে খুব ভালোবাসতেন তিনি। এখন বড় বোনকে হারিয়ে ফাতেমা আর মৌসুমি—দু’জনই পাগলপ্রায়। পরিবারের স্বজনদের বিলাপ, কান্না আর আর্তনাদে ঢাকা মেডিকেলের মর্গের সামনে যেন অসহায় মানবতার দৃশ্যপট তৈরি হয়েছিল আজ সকালে।
নার্গিসের এক স্বজন জানান, মরদেহ ভোলার লালমোহনের দক্ষিণ বেদিরিয়া গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হবে।
মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে মিরপুরের শিয়ালবাড়িতে যে ভবনে নার্গিস কাজ করতেন, সেটিতে থাকা পোশাক কারখানা ও রাসায়নিকের গুদামে আগুন লাগে। ফায়ার সার্ভিসের প্রাথমিক ধারণা, রাসায়নিকের গুদামে বিস্ফোরণের পর ছড়িয়ে পড়া বিষাক্ত গ্যাসই ছিল প্রাণঘাতী।
ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থল থেকে ১৬টি মরদেহ উদ্ধার করেছে। মরদেহগুলোর অধিকাংশই এমনভাবে দগ্ধ যে ডিএনএ পরীক্ষা ছাড়া শনাক্ত করা সম্ভব নয়। এদিকে বুধবার সকালে আরও এক মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করেছে স্বজনেরা।
ঢামেক মর্গের সামনে এখনও অসংখ্য পরিবারের আহাজারি চলছে। কেউ হাতে প্রিয়জনের ছবি, কেউবা শেষ দেখা পাওয়ার আকুতি জানাচ্ছেন।
নার্গিসের বাবা মো. ওজুউল্লাহর চোখে অশ্রু থামছে না। তিনি শুধু বললেন, ওর পড়াশোনা চালাতে পারিনি। বলেছিল, কাজ করবে, সংসারে সাহায্য করবে। আমার মেয়ে সংসারের বোঝা ছিল না, ছিল আমাদের আশার আলো।
- বিষয় :
- অগ্নিকাণ্ড
- অগ্নিকাণ্ডে মৃত্যু
