চলছে দুদকের অনুসন্ধান
দাদা আকাশের দাদাগিরি
রাশেদ মেহেদী
প্রকাশ: ০৪ নভেম্বর ২০১৯ | ১৪:৫৯ | আপডেট: ০৪ নভেম্বর ২০১৯ | ১৫:১৭
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৫৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন তিনি। শ্যামপুর ও কদমতলী ইউনিয়নের ঢাকা ম্যাচ, মেরাজনগর, কদমতলী ওয়াসা ও মোহাম্মদবাগ এলাকা নিয়ে গঠিত নতুন এ ওয়ার্ডের এটিই প্রথম নির্বাচন। আকাশ কুমার ভৌমিক নির্বাচিত হন এ ওয়ার্ডের নতুন কমিশনার। কিন্তু কমিশনার হওয়ার মাত্র সাত মাসের মাথায় আকাশ এবং তার স্ত্রীর নামে চিঠি পাঠায় দুদক। শুরু করে অবৈধ উপায়ে সম্পদ অর্জনের দায়ে অনুসন্ধান, যা এখনও শেষ হয়নি।
কেন আকাশ ভৌমিককে ঘিরে দুদকের এই অনুসন্ধান, যিনি এলাকায় পরিচিত 'দাদা আকাশ' নামে? মাত্র সাত মাসে ওয়ার্ড কাউন্সিলর থেকে তিনি কত সম্পদের মালিক হয়েছেন? কমিশনার হওয়ার আগে কত সম্পদের মালিক ছিলেন তিনি? সমকালের পক্ষ থেকে অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানা গেছে তার সম্পর্কে অনেক বিচিত্র তথ্য।
রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে ধোঁয়াশা: নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন আওয়ামী লীগ কর্মী জানান, কদমতলী থানা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদাধিকারী আকাশ ভৌমিক কয়েক বছর আগে চাঁদপুরে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। সেখানে কীভাবে, কোন সময়ে যুক্ত হয়েছিলেন এবং কোনো পদে ছিলেন কি-না, তা তারা নিশ্চিত করতে পারেননি। তবে তারা জানান, দাদা আকাশ চাঁদপুরে প্রভাব বিস্তার করতে থাকেন ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার পর।
এদিকে নিজের রাজনৈতিক অবস্থানের ব্যাপারে আকাশ বলেন, তিনি ১৯৮৯ সালে চাঁদপুরে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। ঢাকায় আসার পর প্রায় ১৬ বছর শ্যামপুর থানা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক ছিলেন। প্রয়াত আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জলিল স্বাক্ষরিত প্রচার সম্পাদকের পদে নিযুক্তির চিঠিটি এখনও তার কাছে সযত্নে আছে বলে দাবি করেন তিনি। তার দাবি, চাঁদপুরে তার বাবা জয়লাল ভৌমিক একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। তাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিয়েছিল পাকিস্তানি সেনারা। তিনি কিংবা তার পরিবারের কেউই বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত নন।
ভাগ্য খুলেছে ঠিকাদারিতে: আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর দলটির কেন্দ্রীয় এক নেতা ও সাবেক মন্ত্রীর খুবই কাছের একজন হয়ে ওঠেন আকাশ। তার হাত ধরে চাঁদপুর থেকে ঢাকায় আসেন। মেসার্স তালুকদার অ্যান্ড কোম্পানি এবং মেসার্স প্রভাতী অ্যান্ড কোম্পানি নামে দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে ঢাকায় ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে ঠিকাদারি কাজ শুরু করেন। একপর্যায়ে মন্ত্রণালয়ের ঠিকাদারির নিয়ন্ত্রণ তার হাতে চলে আসে। তিনি হয়ে ওঠেন বিপুল সম্পদের মালিক। পরে তিনি মেরাজনগর এলাকায় প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করেন। কদমতলী থানা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হওয়ার পর থেকে তার প্রভাব আরও বেড়ে যায়। ডিএনসিসিতে ৫৯ নম্বর ওয়ার্ড গঠিত হলে তিনি ওয়ার্ড কাউন্সিলর নির্বাচনের প্রস্তুতি নেন এবং আওয়ামী লীগের সমর্থনে ওয়ার্ড কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। হয়ে ওঠেন মেরাজনগর, মোহাম্মদবাগ, ঢাকা ম্যাচ ও কদমতলী ওয়াসা এলাকার নিয়ন্ত্রক।
এলাকা নিয়ন্ত্রণ করেন দাদা আকাশ: মেরাজনগর ও মোহাম্মদবাগের বিভিন্ন সূত্রমতে, অনুগত একটি বাহিনী রয়েছে দাদা আকাশের। সেই বাহিনীর নাহিদ তার ব্যক্তিগত সহকারী। নাহিদ আগে যুবদল নেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি এখন 'দাদা আকাশে'র পক্ষে পুরো এলাকার চাঁদাবাজি ও ঠিকাদারি কাজ নিয়ন্ত্রণ করেন। কদমতলী ওয়াসা এলাকায় আকাশের হয়ে নিয়ন্ত্রণ করেন কৃষক লীগ নেতা কালা দুলাল। এ ছাড়া স্থানীয় ছাত্রলীগ নেতা রেজাউল করিম মুন এবং জিহাদ হোসেনও এলাকায় তার বাহিনীর নেতৃত্ব দেন। মুন ও জিহাদের বিরুদ্ধে এলাকায় মাদক ব্যবসার অভিযোগও আছে। এ ছাড়া ঢাকা মেস শিল্প এলাকায় চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করে ফজু-ফারুক গ্রুপ। এলাকার নির্মাণকাজ থেকে চাঁদাবাজি ও ঠিকাদারি কাজের নিয়ন্ত্রণ করেন আকাশের ছোট ভাই প্রসেনজিৎ। এই বাহিনী গড়ে তুলে মাত্র কয়েক মাসেই এলাকায় একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করেছেন তিনি।
তবে এ ব্যাপারে আকাশ বলেন, নাহিদ, দুলাল, মুন, জিহাদ- সবাই আওয়ামী লীগের বিভিন্ন সহযোগী ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী। এলাকার রাজনীতিতে খুবই সক্রিয় তারা। আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তারা কখনও সম্পৃক্ত ছিলেন না। তাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসার অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। তিনি দাবি করেন, আগামীতে ছাত্রলীগসহ কয়েকটি অঙ্গসংগঠনের নতুন কমিটি হওয়ার কথা রয়েছে। নতুন কমিটিতে যেন এরা স্থান না পায়, সেজন্যই তাদের রাজনীতিতে প্রতিপক্ষ এ ধরনের অপপ্রচার চালাচ্ছে। তার ভাই প্রসেনজিৎ এলাকায় জনপ্রিয় এবং তার বিরুদ্ধেও কিছু নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ একেবারেই সত্য নয়।
দুদকের চিঠি ও আকাশের সম্পদ: গত ৫ সেপ্টেম্বর দুদক আকাশ কুমার ভৌমিক ও তার স্ত্রী পপি রানী ভৌমিককে এক চিঠি পাঠায়। এতে নোটিশ পাওয়ার ২১ কার্যদিবসের মধ্যে নিজের, নির্ভরশীল ব্যক্তিদের যাবতীয় স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি, দায়-দেনা, আয়ের উৎস ও তা অর্জনের বিস্তারিত বিবরণ নির্ধারিত ফরমে দাখিল করতে বলা হয়। এ চিঠি পাওয়ার পর আকাশ এবং তার স্ত্রী দুদকে গিয়ে সম্পদের হিসাব দেন। বর্তমানে তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী সম্পদ আহরণ ও উপার্জনের বিষয়ে আরও বিস্তারিত অনুসন্ধান চলছে।
সমকালের অনুসন্ধানে দেখা যায়, কাউন্সিলর আকাশের সম্পদের মধ্যে রয়েছে মেরাজনগরে একটি তিনতলা বাড়ি, বিজয়নগর আকরাম টাওয়ারে দ্বিতীয় তলায় ৮০০০ স্কয়ার ফিট এবং ১৫ তলায় ৮৮০০ স্কয়ার ফিটের বাণিজ্যিক স্পেস। এ ছাড়া তিনি টাওয়ারের নিচতলার ক্রিসেন্ট লাইটিংয়ের সামনের অংশও কিনে নিয়েছেন। বেইলি রোডের জারা টাওয়ারে চারটি ফ্ল্যাট এবং বনশ্রীর আফতাবনগরে ২০ কাঠা ও ৪৫ কাঠার দুটি পল্গট রয়েছে তার।
এ ছাড়া চাঁদপুরে দুটি পাঁচতলা বাড়ি এবং একটি ডুপ্লেক্স বাড়ি রয়েছে আকাশের। রয়েছে তার ও স্ত্রী পপির মালিকানাধীন দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নামে ব্যাংক হিসাবে জমা করা অর্থসহ প্রায় শতকোটি টাকার অন্যান্য স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি।
নিজের সম্পদ সম্পর্কে আকাশ বলেন, সম্পদের যে বিবরণ দেওয়া হচ্ছে তা সত্য। তা ছাড়া ব্যবসার মাধ্যমে বৈধ উপায়ে অর্জিত এসব সম্পদের কথা তিনি তার আয়কর বিবরণীতেই উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, চাঁদপুরে তাদের পারিবারিক ব্যবসার ঐতিহ্য বহু পুরনো। তার দাদা ১৯৩৮ সালে এলাকায় নিজের জমি দান করেন স্কুল প্রতিষ্ঠার জন্য। পারিবারিক ব্যবসাকে এগিয়ে নিয়ে আরও সম্পদ অর্জন করেছেন তিনি। দুদকের অনুসন্ধান সম্পর্কে তিনি বলেন, তার অবৈধ সম্পদ বলে কিছু নেই। বৈধ সম্পদের বিবরণ তিনি ও তার স্ত্রী দুদকে গিয়ে দিয়ে এসেছেন।
- বিষয় :
- দুদক
- অনুসন্ধান
- দুদকের অনুসন্ধান
- দাদাগিরি