সদরঘাট
সন্ধ্যায় লঞ্চই হয়ে উঠে শ্রমজীবীদের বাড়ি, মিলেমিশে করেন ইফতার
ছবি: সমকাল
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় সংবাদদাতা
প্রকাশ: ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৩:২২ | আপডেট: ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৩:২৯
ইফতারে সবাই কর্মব্যস্ততা শেষে বাড়ি ফিরতে চান; পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বসতে চান এক টেবিলে। কিন্তু দিনশেষে ক্লান্তি কাটানো আর প্রিয়জনের সুখ সবার ভাগ্যে জোটেনা। ঠিক এমনই এক শ্রেণির মানুষ লঞ্চ শ্রমিকরা। অনেকে বাড়ি থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে থাকলেও লঞ্চকেই বাড়ি বানিয়ে ফেলেন। সহকর্মীদের সঙ্গে ভাগ করে নেন পরিবারের আনন্দ। তারা লঞ্চের ছাদে বসে একসঙ্গে করেন ইফতার। সন্ধ্যায় বুড়িগঙ্গার তীরে সদরঘাটে নোঙর করে রাখা অর্ধ-শতাধিক লঞ্চের ছাদের দৃশ্যই এটি।
বৃহস্পতিবার সরেজমিনে দেখা যায়, আসরের আযান শেষ হতেই সদরঘাটের দৃশ্যপট বদলে যেতে থাকে। পন্টুনে ভিড় করে থাকা লঞ্চগুলোর ছাদে চলে ইফতারের প্রস্তুতি। কোনো লঞ্চের ছাদে পাটি, আবার কোথাও চটের বস্তা বিছিয়ে বৃত্তাকার হয়ে বসে পড়েন লঞ্চ শ্রমিকেরা। মাঝখানে বড় গামলায় মাখানো হয় মুড়ি, ছোলা, পিঁয়াজু, বেগুনি আর আলুর চপ। সাথে থাকে ধনেপাতা আর ঘুগনির সুবাস। ইফতারের আইটেম খুব বেশি দামি না হলেও, সবার চোখে-মুখে থাকে এক অদ্ভুত তৃপ্তি।
সদরঘাট থেকে কর্ণফুলী-৯ লঞ্চের শ্রমিক রেজাউল ইসলাম বলেন, ‘ইফতারের সময় নিজের বাড়িতে থাকার সুযোগ আমাদের হয় না। কিন্তু যখন সবাই মিলে একসঙ্গে বসি, তখন মনে মনে এক ধরনের শান্তি পাই। সারাদিনের ক্লান্তি তখন আর মনে থাকে না।’
আরেক শ্রমিক সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘একসময় বাড়িতে পরিবারের সঙ্গেই ইফতার করতাম। এখন জীবিকার তাগিদে সেটা কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে এখানে সবাই মিলে যখন খাবার ভাগ করে খাই, মনে হয় যেন পরিবারের সদস্যদের সাথেই আছি। এটাই এখন আমাদের আনন্দ।’
আবদুল নামে একটি লঞ্চের লস্কর জানান, ‘আমাদের ইফতার সামগ্রী সামান্যই, কিন্তু সবার সাথে বসে খাওয়ার অনুভূতিটা একদম আলাদা। এটা আমাদের মধ্যে এক ধরনের ভাই-ভাই সম্পর্ক তৈরি করে। পরিবার থেকে দূরে থাকলেও আমরা এখানে একেকটা পরিবার।’
ষাটোর্ধ শহিদুল হক বলেন, ‘এখানে আমাদের মধ্যে এক ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। আমরা একে অপরের সুখ-দুখের কথা জানি। ইফতারের এই সময়টা আমাদের এক ধরনের মানসিক শান্তি জোগায়।’
লঞ্চের ইঞ্জিন রুমে কাজ করেন মো. সাত্তার মিয়া। তিনি বলেন, ‘নিচে গরমের মধ্যে সারা দিন কাজ করি। ইফতারের সময় যখন লঞ্চের ছাদে খোলা আকাশের নিচে বসি, তখন শরীর-মন জুড়িয়ে যায়। আমাদের বড় পাতিলে মাখানো মুড়ি যখন সবাই মিলে খাই, তখন আলাদা একটা বরকত পাওয়া যায়।’
লঞ্চের বাবুর্চি জাকির হোসেন জানান, ‘সবার জন্য ইফতার বানাতে বানাতে নিজের কথা ভুলে যাই। যখন দেখি সবাই তৃপ্তি নিয়ে খাচ্ছে, তখন মনে হয় আমার সন্তানদেরই খাওয়াচ্ছি। পরিবার কাছে নেই তো কী হয়েছে, মনে হয় এরাইতো আমার আপনজন।’
