ঢাকা রোববার, ০৭ জুন ২০২৬

পল্লবীতে শিশু হত্যা

‘কলিজাডা ছাড়া আমি থাকবো ক্যামনে’

দরজার সামনে মেয়ের জুতা দেখে সন্দেহ হয় মায়ের

‘কলিজাডা ছাড়া আমি থাকবো ক্যামনে’
×

ফাইল ছবি

 সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২১ মে ২০২৬ | ০৮:২৪ | আপডেট: ২১ মে ২০২৬ | ০৮:৪৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

আট বছরের মেয়েটি কী অপরাধ করেছিল যে, এমন নির্মমতার শিকার হতে হলো– এ কথা বলে হাউমাউ করে কাঁদছিলেন বাবা। দেয়ালে টানানো ছবি দেখিয়ে তিনি বলছিলেন, ‘আমার কলিজাডা ঘরের দেয়ালে কাবা শরিফের ছবি লাগাইয়া রাখছে। ছবি দেখিয়ে বলত– বাবা, তুমি আমাকে কাবা শরিফে নিয়ে যাবা? আমি বলেছি, মা তুমি আল্লাহর কাছে চাও। ওখানে আমার নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা নাই। আমার মেয়ে এখন আল্লাহর কাছেই চলে গেছে।’

রাজধানীর পল্লবীর ১১ নম্বর সেকশনের বি-ব্লকের যে বাড়ির তিনতলায় শিশুটি তার বাবা-মা আর বড় বোনের সঙ্গে থাকত, সেখানে গতকাল বুধবার সকালে ছুটে যান এলাকাবাসী। মেয়েটি স্থানীয় একটি স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ত। তার শিক্ষকরাও এসেছেন। জড়ো হন গণমাধ্যমের একদল কর্মীও। 
বাসার বিভিন্ন স্থানে টানানো রয়েছে মেয়েটির হাস্যোজ্জ্বল ছবি। এখন ঘরজুড়ে বিরাজ করছে গভীর শোক আর নিস্তব্ধতা। ছবিতে হাত রেখে মেয়েটির বাবা-মা কান্নায় ভেঙে পড়েন। উপস্থিত অনেকের চোখ তখন জলে ভরে ওঠে।

মেয়েটিকে গত মঙ্গলবার সকালে পাশের ফ্ল্যাটের ভাড়াটে সোহেল রানা গলা কেটে হত্যা করে। মাথা কেটে বিচ্ছিন্ন করা হয়। এর আগে মেয়েটিকে ধর্ষণ করা হয়। 
সমবেদনা জানাতে আসা লোকজনকে মেয়েটির বাবা বলেন, ‘কোনো দিন মানুষের সঙ্গে আমি তর্ক করিনি। আমার এই আট বছরের বাচ্চাটা কী অপরাধ করেছে যে, এমন নির্মমভাবে তাকে হত্যা করল? কলিজাডা ছাড়া আমি থাকব ক্যামনে! আমার বেঁচে থাকা সম্ভব না। মেয়েটা দিনে অন্তত ৫০ বার কল দিত। জিজ্ঞাসা করত, বাবা তুমি কখন আসবা? আমি ঘরে ঢোকার আগে আমার জন্য ছোট বাচ্চাটা ফ্রিজে শরবত বানাইয়া রাখত। আটটা বছর আমি ওকে আমার বুকে রাইখা ঘুম পাড়াইছি। এখন আমি কারে ঘুম পাড়াইব! কী দিয়ে মনকে সান্ত্বনা দেব।’

তিনি আরও বলেন, ‘মেয়ে আর ফিরে আসবে না। তাই আমি কিছুই চাই না। কারণ আপনারা আমার মেয়ে হত্যার বিচার করতে পারবেন না। কোনো উদাহরণ দাঁড় করাতে পারবেন? পারবেন না। আপনাদের বিচার করার কোনো রেকর্ড নেই। স্ট্যাম্পে লিখে দিতে পারি, বিচার করতে পারবেন না। এটা বড়জোড় ১৫ দিন চলবে, আবার অন্য কোনো ঘটনা ঘটবে। এরপর এটা ধামাচাপা পড়ে যাবে। আপনারা আমার দুঃখ কী বুঝবেন!’ 

গত মঙ্গলবার রাতে সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে পল্লবী থানায় হত্যা মামলা হয়। মেয়েটির বাবা বাদী হয়ে এই মামলা করেন। স্বপ্নাকে বাসা থেকে এবং সোহেলকে নারায়ণগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। 

মেয়েটির জুতা দেখে সন্দেহ হয় মায়ের
মেয়েটির মা বলেন, ‘মঙ্গলবার সকালে আমার দুই মেয়ে ফ্ল্যাটের দরজা খোলে। আমি ভেবেছিলাম, দুই বোন একসঙ্গে বাইরে গেছে। কিছুক্ষণ পর বড় মেয়ে বাসায় ঢোকে। তাকে ছোট মেয়ের কথা জিজ্ঞাসা করলে সে কিছু বলতে পারে না। তখন ছোট মেয়ের খোঁজাখুঁজি শুরু করি। প্রায় ১০ মিনিট ধরে নিচতলা ও দোতলায় বিভিন্ন ফ্ল্যাটে যাই। পরে তিনতলায় আমার মেয়ের একটা জুতা দেখে সন্দেহ হয়। আমাদের পাশের ফ্ল্যাটে দরজায় ধাক্কাধাক্কি করি। কিন্তু দরজাটি ভেতর থেকে আটকানো ছিল। কেউ জবাব দেয়নি। তখন সন্দেহ আরও বাড়ে। আমি বারবার ওই দরজায় ধাক্কা দিতে থাকি। পরে লোকজন ডেকে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে সোহেলের ঘরে আমার মেয়ের রক্তাক্ত লাশ দেখতে পাই।’ 

স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি 
ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত গতকাল আসামি সোহেলের জবানবন্দি রেকর্ড করেন। পুলিশ জানিয়েছে, সোহেল রানা স্বেচ্ছায় জবানবন্দি দিতে সম্মত হওয়ায় আদালতে তা রেকর্ডের আবেদন করা হয়। সেই সঙ্গে তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে কারাগারে বন্দি রাখারও আবেদন করা হয়।

ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে গতকাল পৃথক দুটি আবেদন করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পল্লবী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) অহিদুজ্জামান নিপুণ। বিকেল সোয়া ৩টার দিকে হাজতখানা থেকে কড়া নিরাপত্তায় সোহেল রানাকে আদালতে হাজির করা হয়। এরপর আদালতে দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দেয় সোহেল। শিশুটিকে হত্যার আগে ধর্ষণের কথাও স্বীকার করে সে। ধারালো অস্ত্র দিয়ে রান্নাঘরে শিশুটিকে গলা কেটে হত্যা করা হয়। মরদেহ গুমের উদ্দেশ্যে শৌচাগারে নিয়ে শরীর থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করা হয়। পরে রঙের খালি প্লাস্টিকের কৌটার মধ্যে মাথাটি রাখা হয়। দুই হাত কাঁধ থেকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু তখনই লোকজন ফ্ল্যাটের দরজায় ধাক্কাধাক্কি শুরু করে। সোহেল তখন মরদেহটি খাটের নিচে রাখে। জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যায়।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই অহিদুজ্জামান নিপুণ বলেন, সোহেল কীভাবে মেয়েটিকে হত্যা করে, তার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছে আদালতে। পরে আদালতের নির্দেশে সোহেল ও তার স্ত্রীকে কারাগারে পাঠানো হয়।

বাসা ছাড়ার নোটিশ পেয়েছিল সোহেল
তদন্ত সূত্র ও স্থানীয় লোকজন জানায়, সোহেল রানার গ্রামের বাড়ি নাটোরের সিংড়া থানার নিমকদমা চৌদ্দগ্রামে। বছর তিনেক আগে সস্ত্রীক ঢাকায় এসে পল্লবীতে বসবাস শুরু করে। রিকশা-ভ্যান মেকানিকের কাজ করে। সোহেল মাদকসেবী হওয়ায় এক বাসায় বেশি দিন থাকতে পারত না। কারণ বাড়ির মালিক যখন সোহেলের মাদকসেবনের কথা জানতে পারেন, তখনই তাকে বাসা ছাড়ার নোটিশ দিতেন। বর্তমান বাসায় তিন মাস আগে ওঠে। গত ১ মে ইতালিপ্রবাসী বাড়ির মালিক ম্যানেজারকে দিয়ে সোহেলকে বাসা ছাড়ার নোটিশ দেন। ৩১ মে সোহেলের বাসা ছেড়ে দেওয়ার কথা।

গ্রামের বাড়িতে মেয়েটির দাফন 
এদিকে গতকাল শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে শিশুটির মরদেহ স্বজনের কাছে হস্তান্তর করা হয়। সেখান থেকে মরদেহ নেওয়া হয় পল্লবীর সেই ভাড়া বাসায়। এরপর সন্ধ্যায় নেওয়া হয় মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখানে গ্রামের বাড়ি। রাতে পারিবারিক কবরস্থানে মরদেহ দাফন করা হয়। 

মুন্সীগঞ্জে মশাল মিছিল
মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি জানিয়েছেন, এ ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে মুন্সীগঞ্জ জেলা শহরে মশাল মিছিল ও সমাবেশ হয়েছে। গতকাল সন্ধ্যা ৭টার দিকে থানারপুল এলাকার ‘অঙ্কুরিত যুদ্ধ-৭১’ ভাস্কর্যের সামনে থেকে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের উদ্যোগে মশাল মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি শহরের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে মুন্সীগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সামনে গিয়ে সমাবেশে মিলিত হয়।

সমাবেশে বক্তারা বলেন, এই হত্যাকাণ্ড অত্যন্ত নৃশংস ও মানবতাবিরোধী। দ্রুত সময়ের মধ্যে ঘটনার বিচার সম্পন্ন করে দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ মহিলা পরিষদের
পল্লবীতে মেয়েটির গলাকাটা লাশ উদ্ধারের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ। এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত গ্রেপ্তার, সুষ্ঠু তদন্ত এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।

বিবৃতিতে বলা হয়, নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি নৃশংসতা ও বর্বরতার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে চলেছে। এ ধরনের সহিংসতা শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশ ও নিরাপদ জীবনযাপনের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। একই সঙ্গে প্রতিবেশী বা পরিচিতজনদের মাধ্যমে এমন অপরাধ সংঘটিত হওয়ায় নারী ও কন্যাশিশুর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে শঙ্কা সৃষ্টি হচ্ছে। 

সংগঠনটি আরও বলেছে, দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা বাড়ছে, যা নারী ও কন্যাশিশুর অগ্রযাত্রার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে এলাকাভিত্তিক ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজকে সম্পৃক্ত করে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলারও আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি জামায়াতের 
এদিকে নৃশংস এই হত্যার প্রতিবাদে গতকাল রাজধানীতে বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিল করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। আইনশৃঙ্খলার অবনতির ‘দায়ে’ এই কর্মসূচি থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করা হয়েছে। বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান ফেসবুক পোস্টে শিশুটির ধর্ষক ও খুনিদের দ্রুততম সময়ে বিচার দাবি করেছেন। 

শিশু ধর্ষণ ও হত্যা, নারী নিপীড়ন, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের প্রতিবাদে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের দক্ষিণ গেটে সমাবেশ আয়োজন করে ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ জামায়াত। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার পল্লবীতে শিশু হত্যাকে অমানবিকতার নিকৃষ্ট উদাহরণ আখ্যা দিয়ে বলেন, ফুটফুটে শিশুটির জন্য পুরো জাতি ব্যথিত হলেও, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ ব্যথিত নন। আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতির দায়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ করা উচিত। 

তিনি বলেন, ‘অন্যান্য দেশে মন্ত্রীরা ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে পদত্যাগ করেন। আর আমাদের দেশের মন্ত্রীরা দায় চাপানোর রাজনীতি করেন।’ 
মহানগর দক্ষিণের আমির সংসদ সদস্য নূরুল ইসলাম বুলবুলের সভাপতিত্বে এবং সেক্রেটারি সংসদ সদস্য ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদের সঞ্চালনায় সমাবেশে নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোসেনসহ কেন্দ্রীয় নেতারা বক্তৃতা করেন। সমাবেশ শেষে বিক্ষোভ মিছিল দক্ষিণ গেট থেকে শুরু হয়ে গুলিস্তান জিরো পয়েন্ট, পল্টন মোড় হয়ে বিজয়নগরে গিয়ে শেষ হয়। 

আরও বিক্ষোভ 
শিশু ধর্ষণ ও হত্যার প্রতিবাদ এবং দোষীদের শাস্তির দাবিতে গতকাল রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মশাল মিছিল করেছে জাতীয় ছাত্রশক্তি। 
একই দাবিতে মানববন্ধন করেছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি) শাখা ইসলামী ছাত্রী সংস্থা।

খুন, ধর্ষণসহ নৃশংস অপরাধে উদ্বেগ প্রকাশ করে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) বিচারের দাবি জানিয়েছে। 

 

আরও পড়ুন

×