ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

মৃত্যুর পর পরিচয় মিলল মানসিক ভারসাম্যহীন নারী দুলালীর

মৃত্যুর পর পরিচয় মিলল মানসিক ভারসাম্যহীন নারী দুলালীর
×

ছবি-সমকাল

সমকাল প্রতিবেদক 

প্রকাশ: ৩১ মে ২০২৬ | ২৩:২৪ | আপডেট: ৩১ মে ২০২৬ | ২৩:৪৯

রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক ও ফুটপাতে ঘুরে বেড়ানো মানসিক ভারসাম্যহীন নারী ‘দুলালী’ নামে পরিচিত ছিলেন অনেকের কাছে। তবে মৃত্যুর পর জানা গেল তাঁর প্রকৃত পরিচয়। তিনি ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার সিদ্ধকাঠি (কলেজপাড়া) গ্রামের আব্দুল খালেক হাওলাদার ও মনোয়ারা বেগমের মেয়ে শামীমা নাসরিন জাহান।

রোববার সকালে রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। দীর্ঘদিন ধরে মানসিক রোগে আক্রান্ত এই নারীর চিকিৎসা নিশ্চিত করতে গিয়ে একাধিক হাসপাতাল থেকে ফিরতে হয়েছিল সমাজকর্মী মুসা করিম রিপনকে। কারণ, তাঁর সঙ্গে ছিল না কোনো জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) কিংবা আইনগত অভিভাবক।

গত ২১ মে মিরপুর-২ এলাকার ৬০ ফুট সড়কের বারেক মোল্লা মোড়সংলগ্ন এলাকায় শামীমাকে দেখতে পান মুসা করিম রিপন। তখন তাঁর শারীরিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত শোচনীয়। কঙ্কালসার দেহ, দুর্বলতা এবং অসুস্থতায় প্রায় অচেতন অবস্থায় ছিলেন তিনি। অনেক চেষ্টা করেও তাঁকে খাবার খাওয়ানো সম্ভব হয়নি।

এরপর তাঁকে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে নেওয়া হলেও ভর্তি করা হয়নি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, এনআইডি বা আইনগত অভিভাবক ছাড়া রোগী ভর্তি নেওয়ার সুযোগ নেই। তবে প্রাথমিক কিছু চিকিৎসা দেওয়া যেতে পারে।

শামীমার চিকিৎসার জন্য তিন দিনের মধ্যে আটটি হাসপাতালে ছোটাছুটি করেন রিপন। কোথাও স্থায়ীভাবে ভর্তি করানো সম্ভব হয়নি। একপর্যায়ে অসহায় হয়ে ধানমন্ডি ২৭ নম্বর এলাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালের সামনের ফুটপাতে তাঁকে রাখতে বাধ্য হন। স্থানীয় একটি রেস্তোরাঁর কর্মচারীর কাছে কিছু অর্থ দিয়ে তাঁর খাবারের ব্যবস্থা করেন তিনি। পাশাপাশি প্রতিদিন অফিসের ফাঁকে দুবার গিয়ে খোঁজ নিতেন।

পরিস্থিতি যখন ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছিল, তখন বিষয়টি সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নজরে আনার চেষ্টা করেন রিপন। ঈদের আগে গুলশানে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে তিনি সাহায্য চান। পরে প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. জিয়াউদ্দিন হায়দারের উদ্যোগে শুক্রবার জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে শামীমাকে ভর্তি করা হয়। কিন্তু ততক্ষণে তাঁর শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটে। পরে তাঁকে দ্রুত শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রোববার তাঁর মৃত্যু হয়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, বর্তমান স্বাস্থ্যব্যবস্থার কাঠামোয় পরিচয়হীন ও স্বজনহীন মানসিক রোগীদের জন্য কার্যকর সহায়তা দেওয়ার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। সীমিত জনবল ও সক্ষমতা নিয়ে স্বাস্থ্যকর্মীরা এমন রোগীদের সেবা দেওয়ার চেষ্টা করেন।

মৃত্যুর পর সিআইডির ফরেনসিক ইউনিট এবং পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) সহায়তায় শামীমার পরিচয় শনাক্ত করা হয়। এতদিন ‘দুলালী’ নামে পরিচিত এই নারীর প্রকৃত পরিচয় উদঘাটনের মধ্য দিয়ে শেষ হলো দীর্ঘ অনিশ্চয়তার এক অধ্যায়।

তবে তাঁর মৃত্যু আবারও সামনে নিয়ে এসেছে পরিচয়হীন ও মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের প্রশ্ন। সংশ্লিষ্টদের মতে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও সমাজসেবা অধিদপ্তরের সমন্বয়ে সিজোফ্রেনিয়া, সাইকোসিসসহ বিভিন্ন মানসিক রোগে আক্রান্ত স্বজনহীন মানুষের জন্য পৃথক সুরক্ষা ও চিকিৎসা ব্যবস্থার উদ্যোগ জরুরি। একই সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার আওতায় এনে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব আরও জোরদার করার দাবি উঠেছে।

আরও পড়ুন

×