ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সাহিত্যের অভিজাত উৎসব শুরু

সাহিত্যের অভিজাত উৎসব শুরু
×

বিশেষ প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০১৯ | ১৩:৩৪

বিভিন্ন দেশের প্রায় তিনশ' লেখক-সাহিত্যিক-সাংবাদিক-সমালোচকের অংশগ্রহণে ঢাকায় শুরু হয়েছে তিন দিনের 'ঢাকা লিট ফেস্ট-২০১৯'। ঢাকায় সাহিত্যাঙ্গনের অভিজাত এই আয়োজন ৯ বছর পেরিয়ে এক দশকে পা রাখছে। আর এ দেশে এটাই এখন শিল্প-সাহিত্যের সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক আয়োজন।


বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে গতকাল বৃহস্পতিবার প্রথম দিনের আয়োজনেই সাহিত্যনুরাগীদের বিপুল উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। এবারের উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ বুকারজয়ী বাঙালি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ লেখক মনিকা আলী। উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে তিনি সমকালকে বলেন, 'আমি অভিভূত। বাংলাদেশের মানুষের সাহিত্যের প্রতি এই অনুরাগ বাঙালির উন্নত সাংস্কৃতিক রুচির পরিচয়ই তুলে ধরে।' সকালে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে উৎসবের উদ্বোধন করেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ। তিনি বলেন, এই উৎসব বিশ্বসাহিত্য থেকে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করার উৎসব। ৯ বছর আগে 'হে উৎসব' দিয়ে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা আজ আরও পরিণত। উন্নত বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে বাংলা সাহিত্যের দৃঢ় সেতুবন্ধের উৎসব এটি। তিনি বিদেশ থেকে আসা সাহিত্যিকদের প্রতি রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়টি সারাবিশ্বে তুলে ধরার আহ্বান জানান।

বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক ও কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী বলেন, এবারের উৎসব জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শতবর্ষ উপলক্ষে উৎসর্গ করা হয়েছে। এ কারণে এ আয়োজন বিশেষভাবে তাৎপর্যময় হয়ে উঠেছে।

উৎসবের পরিচালক সাদাফ সায্‌ বলেন, মুক্তচিন্তা এবং বাকস্বাধীনতার জন্য এ উৎসবের গুরুত্ব অপরিসীম। এ উৎসব আমাদের সাহিত্যকে বিশ্বাঙ্গনে আরও পরিচিত করে তুলবে। এবারের আয়োজনে দেশ-বিদেশের সাহিত্য, শিল্প-সংস্কৃতি, নারীর ক্ষমতায়ন ও বাকস্বাধীনতার গুরুত্ব তুলে ধরা হবে।

আয়োজনের আরেক পরিচালক কাজী আনিস আহমেদ বলেন, এ আয়োজনে একত্র হয়ে নিজেদের চিন্তার জায়গাটাকে উন্মুক্ত করতে পারছি। এই আয়োজন ভাবনা-চিন্তাকে স্বাধীন করার মাধ্যম হয়ে উঠুক- এটাই প্রত্যাশা।

উৎসবের পরিচালক আহসান আকবর বলেন, কবিতা, শিল্প-সাহিত্যের এ আয়োজনের মাধ্যমে বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশকে আরও সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব হচ্ছে। উদ্বোধন অনুষ্ঠানের বিশেষ আকর্ষণ ছিল কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিল্পসৃষ্টি 'পঞ্চভূত' নিয়ে সাধনা নৃত্যগোষ্ঠীর নয়নকাড়া নৃত্যনাট্য পরিবেশনা।

আয়োজনের অন্যতম স্পন্সর সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও স্বনামধন্য লেখক মাশরুর আরেফিন সমকালকে বলেন, দেশে এ ধরনের বড় আয়োজনে তার প্রতিষ্ঠান সব সময়ই এগিয়ে এসেছে।

উদ্বোধন অনুষ্ঠানের পর প্ল্যানারি ফিকশন :'রেজিস্ট অর রিফিউজ'-এর মধ্য দিয়ে আয়োজনের ধারাবাহিক পর্ব শুরু হয় বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ অডিটোরিয়ামে। এতে উপস্থিত ছিলেন মনিকা আলীসহ পাঁচ দেশের পাঁচজন নারী লেখক। অন্যরা হচ্ছেন ব্রাজিলীয় লেখক মারিয়া ফিলোমেনা বইসো লেপেসকি, ফিনল্যান্ডের মিন্না লিন্ডগ্রেন এবং ব্রিটিশ-ব্রাজিলীয় লেখক জারা রদ্রিগেজ ফাউলার?। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ভারতীয় লেখক সুমনা রায়।

সুমনা রায় আলোচনা শুরু করেন 'ফিকশন কী?'- এ প্রশ্নের মধ্য দিয়ে। এর জবাবে মনিকা আলী বলেন, ফিকশন হলো ছোট ছোট জিনিসকে আবেগ ও কাব্যিকতার ছোঁয়ায় বড় পরিসরে তুলে ধরা। তিনি আরও বলেন, সাহিত্যিক তার নিজস্ব পরিচর্যার মাধ্যমে সাহিত্যে যে কোনো ক্ষুদ্র বিষয়কেও বড় পরিসরে মহান করে তুলে ধরতে পারেন। ক্ষুদ্র কিছুকে বড়া করা, অদেখাকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া কিংবা চেনা কিছুকে নতুন বিস্ময়ে উপস্থাপনের ভিত্তিতেই বিশ্বের মহৎ সাহিত্যকর্মগুলো সৃষ্টি হয়েছে।

একই প্রশ্নের জবাবে মিন্না লিন্ডগ্রেন বলেন, সামাজিক জীবনের গল্পকে তুলে ধরাই সাহিত্যিকের কাজ। বিশেষ করে তিনি নিজের সাহিত্যকর্মে সমাজের হাসি-আনন্দ-বেদনার গল্পকেই তুলে ধরেন।

মারিয়া ফিলোমেনা বইসো লেপেসকি বলেন, তার দৃষ্টিতে ফিকশন হচ্ছে মানবচিত্তকে পুলকে রোমাঞ্চিত করার মাধ্যম। সাহিত্যের পাদপীঠ সমাজের দেখা বাস্তবতা, কিন্তু সাহিত্যিকের প্রখর কল্পনাশক্তি সেই ভিন্ন এক রোমাঞ্চর জগতে নিয়ে যায় পাঠককে, কথাসাহিত্যের সৌন্দর্য এখানেই।

জারা রদ্রিগেজ ফাউলার বলেন, ফিকশন হচ্ছে বইয়ের অক্ষরে ফুটিয়ে তোলা সমাজের প্রতিচ্ছবি। একজন নারীবাদী লেখক হিসেবে তিনি নারীদের অধিকার, সুবিধা ও অসুবিধাগুলো গল্পের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলেন।

পরে দিনের অন্যান্য ধারাবাহিক পর্বে অংশ নেন কবি মৃদুল দাশগুপ্ত, জহর সেন মজুমদার, গৌতম গুহ রায়, প্রিয়াংকা দুবে, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, কামাল চৌধুরী, মাশরুর আরেফিন, মাহবুব আজীজ, শামীম রেজা, আলতাফ শাহনেওয়াজ, মাহাম্মদ সাদিক, রিসেল দোয়ার, সাদিয়া খালিদ, ব্রুসিল হল, সালাহদিন ইমাম, অরুনাভ সিনহা, আনজুম কৈতাল, খাদেমুল ইসলাম, ফিরোজ আহমেদ, রফিক উম মুনীর চৌধুরী।

বিকেলে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কবিতা পাঠের আসরে কবিতা পাঠ করেন ডালিয়া আহমেদ, লায়লা আফরোজ, আহকাম উল্লাহ, শিহাব শাহরিয়ার, বেলায়েত হোসাইন, রফিকুল ইসলাম ও শাহাদাত হোসাইন নিপু।

উদ্বোধনী দিনের বড় আকর্ষণ ছিল জেমকন সাহিত্য পুরস্কার প্রদান। এ বছর কথাসাহিত্যে অভিষেক সরকার এবং কবিতায় রফিকুজ্জামান রণি পুরস্কৃত হন। তাদের পুরস্কার প্রদান করেন জেমকন গ্রুপের অন্যতম কর্ণধার কাজী আনিস আহমেদ।

আরও পড়ুন

×