ঢাকা বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬

জেনেভা ক্যাম্পে ১৩ মাদক চক্র, অস্ত্রের ছড়াছড়ি

জেনেভা ক্যাম্পে ১৩ মাদক চক্র, অস্ত্রের ছড়াছড়ি
×

লুট করা অস্ত্র দিয়েই আধিপত্য বিস্তারে নামেন জেনেভা ক্যাম্পের বাসিন্দারা। ছবি-সংগৃহীত

ইন্দ্রজিৎ সরকার

প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬ | ২০:২১

তিন ফুটের মতো প্রশস্ত আধো অন্ধকার গলি। দুই পাশে সারি সারি ঘর। প্রতি ঘরের দরজা বা পাশে দাঁড়িয়ে আছে কিছু শিশু কিশোর তরুণ। নারীরাও আছেন। তাদের অনেকের হাতে ছোট্ট ব্যাগ। গলি দিয়ে কাউকে যেতে দেখলেই হাঁকছেন– ‘এই কয়টা, কয়টা?’ জানা গেল, তারা ইয়াবা ও গাঁজার পুরিয়া বিক্রি করছেন। রাজধানীর মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পের হুমায়ুন রোডসংলগ্ন লোহার গেট এলাকার দৃশ্য এটি। অথচ কিছুক্ষণ আগেই পুলিশের একটি দলকে ওই সড়কে টহল দিতে দেখা যায়।
অনুসন্ধানে জানা যায়, জেনেভা ক্যাম্পে অন্তত ১৩টি চক্র সক্রিয়। ইয়াবা, গাঁজা, হেরোইন, ফেনসিডিল ও বিয়ার বিক্রি করে তারা। তথ্য বলছে, ক্যাম্প থেকে বছরে প্রায় ৩৬০ কোটি টাকার মাদক বিক্রি হয়। ক্যাম্পটিতে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে প্রায়ই সংঘর্ষে জড়ায় মাদক কারবারিরা। এতে গত ১৭ মাসে ৯ জনের প্রাণ গেছে, আহত হয়েছে অর্ধশতাধিক। কারবারির দখলে রয়েছে অন্তত ১২টি আগ্নেয়াস্ত্র ও দুই শতাধিক ধারালো অস্ত্র।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিয়মিত অভিযান চালানোর দাবি করলেও বছরের পর বছর একইভাবে চলছে ক্যাম্পের মাদক কারবার। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু সদস্য এই চক্রে যুক্ত। তারা মোটা অঙ্কের আর্থিক সুবিধা নিয়ে কারবারিদের আশ্রয় প্রশ্রয় দেন। 
ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার ইবনে মিজান সমকালকে বলেন, ক্যাম্পে ঢোকা ও বের হওয়ার ৩০টির বেশি পথ রয়েছে। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সাতটি পথে বেলা ২টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত সন্দেহভাজনদের তল্লাশি করা হচ্ছে। এতে মাদক কারবার কমে আসবে। তবে কারবারির কাছ থেকে পুলিশের আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ ঠিক নয়। কারও বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 

ইশতিয়াক নাদিম থেকে এখন ১৩ চক্র

এক দশক আগে ক্যাম্পের মাদক মাফিয়া হিসেবে শোনা যেত ইশতিয়াক ও নাদিম হোসেন ওরফে পঁচিশের নাম। ইশতিয়াকের চক্রে তখন ছিলেন মোল্লা আরশাদ, চুয়া সেলিম, পিচ্চি রাজা, পিস্তল নাঈম, শাহাবুদ্দিন ও টেরু সেলিম। ২০১৮ সালের জুলাইয়ে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে র্যা বের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে মারা যান নাদিম। আর ইশতিয়াক ভারতে পালিয়ে থাকা অবস্থায় ২০২০ সালে করোনায় মারা যান বলে বিভিন্ন সূত্রের দাবি। পরে তাঁর চক্রের সদস্যরা নিজেরাই আলাদা গ্রুপের নেতা হয়ে ওঠেন। 
ছোট বড় মিলিয়ে অন্তত ১৩টি চক্র এখন ক্যাম্পে মাদক কারবারে জড়িত। এর মধ্যে আলোচিত শীর্ষ মাদক কারবারি ভূঁইয়া সোহেল ওরফে বুনিয়া সোহেল ও তাঁর ভাই কালাম ওরফে টুনটুন একটি বড় চক্রের হোতা ছিলেন। ক্যাম্পের ৭ নম্বর সেক্টরে আলুফালাহ ক্লিনিক এলাকায় তাদের হেরোইন, ইয়াবা ও গাঁজার কারবার। সোহেলের বিরুদ্ধে হত্যা, বিস্ফোরক, মাদকসহ বিভিন্ন অভিযোগে অন্তত ৩৮টি মামলা রয়েছে। সর্বশেষ ২৯ নভেম্বর প্রতিপক্ষের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে আহত অবস্থায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর আগে ২৯ অক্টোবর টুনটুনকে গ্রেপ্তার করে র্যা ব। দুই হোতার অনুপস্থিতিতে চক্রের সদস্যরা এখন একই স্পটে আরেক শীর্ষ কারবারি মনুর হয়ে কাজ করছেন। এ ছাড়া ক্যাম্পের ৪, ৮ ও ৯ নম্বর সেক্টরে আগে থেকেই বিস্তৃত মনুর নেটওয়ার্ক। তার চক্রে রয়েছেন শাহ আলম, লালন, কালা ফয়সাল ও ইমতিয়াজ। 
ক্যাম্পে ইয়াবার বড় কারবারি পিচ্চি রাজা। তার চক্রের সদস্যরা ১ ও ২ নম্বর সেক্টরে ইয়াবা বিক্রি করেন। একই সেক্টরের এ এবং বি ব্লকে চুয়া সেলিমের ইয়াবা, গাঁজা ও হেরোইনের রাজত্ব। ক্যাম্পে ইয়াবার অন্যতম সরবরাহকারী দিলদার। তাঁর হয়ে ক্যাম্পের এ এবং বি ব্লকে কারবার পরিচালনা করেন শান্ত। একই ব্লকে ইয়াবার কারবার চালান ইশতিয়াকের ‘সেকেন্ড ইন কমান্ড’ মোল্লা আরশাদ। একই ব্লকে ইশতিয়াকের ভগ্নিপতি পিস্তল নাঈমের ইয়াবার কারবার। 

গত বছর ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর সক্রিয় হয়ে ওঠে এক সময়ের বড় চক্র ‘শান্তি গ্রুপ’। পোঁটলা মুন্নার নেতৃত্বাধীন এই চক্র ৩ নম্বর সেক্টরের সি ব্লকে এ ওয়ান মোড় এলাকায় বিক্রি করে হেরোইন, গাঁজা ও ইয়াবা। ক্যাম্পের এ ও বি ব্লকে ইয়াবা কারবার চালায় পাঁচুর চক্র। একই ব্লকে পাকিস্তানি গ্রুপ চালায় রাশেদ ও রাজু। তারা ইয়াবার পাশাপাশি ফেনসিডিলও বিক্রি করে। ৯ নম্বর সেক্টরের আই ব্লকে গাঁজার বড় কারবারি রানী। মূলত গাঁজা বিক্রি করলেও তাঁর কাছে মেলে ইয়াবাও। ৩ নম্বর সেক্টরের সি ব্লকে গাঁজার আরেকটি চক্র রয়েছে। সেটির হোতা মুনা ওরফে শহিদ, সগির ও জয়নুল। ৫ নম্বর সেক্টরের ই ব্লকে চার ভাইয়ের ইয়াবার কারবার রয়েছে। তারা হলেন– হাসিব, সনু, মনির ও হীরা। ক্যাম্পের আরেকটি বড় চক্র সৈয়দপুরীয়া গ্রুপ এখন কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। তারা এখন পিচ্চি রাজার হয়ে কাজ করছে। 

অস্ত্রের ছড়াছড়ি

স্থানীয় সূত্রের তথ্য বলছে, ভূঁইয়া সোহেল চক্রের কাছে দুটি শটগান ও দুটি পিস্তল, চুয়া সেলিমের কাছে দুটি শটগান, পিচ্চি রাজার কাছে একটি শটগান ও একটি পিস্তল রয়েছে। এ ছাড়া দেশে তৈরি চার পাঁচটি আগ্নেয়াস্ত্র মনুসহ অন্য চক্রের কাছে থাকার তথ্য মিলেছে। এসব অস্ত্রের বড় অংশই থানা থেকে ‘লুট হওয়া’। আগ্নেয়াস্ত্রের পাশাপাশি তাদের কাছে চায়নিজ চাপাতি, সামুরাইসহ দুই শতাধিক ধারালো অস্ত্র রয়েছে। আছে হকিস্টিক। তবে সংঘর্ষের সময় তাদের মূল অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয় ককটেল বা হাতবোমা। 

সংঘর্ষে নিহত ৯

আধিপত্য বিস্তার নিয়ে জেনেভা ক্যাম্পে মাদক কারবারির বিরোধ আগে থেকে থাকলেও গত ১৫ মাসে তা ভয়াবহ রূপ নেয়। এ সময়ে সংঘর্ষে অন্তত ৯ জন নিহত হন। তাদের মধ্যে চারজনই ভূঁইয়া সোহেল গ্রুপের। সর্বশেষ ২৩ অক্টোবর নিহত জাহিদও তাঁর হয়ে কাজ করতেন। এ ছাড়া নিহত শাহ আলম, সাগর ও রাজ ছিলেন একই গ্রুপের। বাকি চারজনের মধ্যে দুজন মনু গ্রুপের সদস্য ছিলেন। তারা হলেন– শাহেনশাহ ও সনু। আর শাহনেওয়াজ ওরফে কালু, টাপ্পু ও রহমত রাজন দুই পক্ষের মারামারির মধ্যে পড়ে নিহত হন। টাপ্পুর মৃত্যুর ঘটনায় মামলা হয়নি। ৫ আগস্টের আগেও সংঘর্ষে পিচ্চি রাসেল নামে একজনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়। 

বছরে ৩৬০ কোটি টাকার মাদক বিক্রি

প্রতিদিন গড়ে ১৫ হাজার পাতা হেরোইন বিক্রি হয়। প্রতিটি পাতা বা পুরিয়ার দাম ২০০ থেকে ২২০ টাকা। সেই হিসাবে দিনে ৩০ লাখ টাকার হেরোইন বিক্রি হয় এখানে। ইয়াবার চাহিদা প্রতিদিন ২০ হাজার পিসের আশপাশে। মানভেদে প্রতি পিস ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। অর্থাৎ এক দিনে ইয়াবা বিক্রি হয় ৫০ লাখ টাকার। আর দিনে ৫০ কেজির বেশি গাঁজা বিক্রি হয়। খুচরা বিক্রিতে কেজিপ্রতি ৪০ হাজার টাকা দরে হিসাব করলে দাঁড়ায় ২০ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে প্রতিদিন গড়ে এক কোটি টাকার মাদক বিক্রি হয়। প্রতি মাসে এই অঙ্ক ৩০ কোটি এবং বছরে ৩৬০ কোটি টাকা। 

এক বছরে ক্যাম্পে দুটি অভিযানে শুধু ভূঁইয়া সোহেলের আস্তানা থেকেই সাড়ে তিন কোটি টাকা উদ্ধার হয়। এর মধ্যে ১৫ আগস্ট এক কোটি ১৩ লাখ টাকা এবং ৪ জুন দুই কোটি ৪৫ লাখ টাকা পাওয়া যায়। এ ছাড়া দুই মাস আগে শাহ আলমের আস্তানা থেকে ১৫ লাখ টাকা উদ্ধার হয়। 

কেন বন্ধ করা যায় না?

এই কারবার কেন ঠেকানো যায় না? এ নিয়ে ওই এলাকায় বিভিন্ন সময় দায়িত্ব পালন করা কয়েক পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছে সমকাল। তারা বলছেন, ক্যাম্পে জনসংখ্যার অনুপাতে মাথাপিছু জায়গা বরাদ্দ ১১ বর্গফুটের কম। অথচ দেশে বন্দির জন্যও ৩৬ বর্গফুট বরাদ্দের নিয়ম রয়েছে। দেখা যায়, ছোট্ট একটি ঘরে স্বামী স্ত্রী, তাদের ছেলে পুত্রবধূ, মেয়ে জামাতা থাকেন। তিন দম্পতি দিনের তিন ভাগে পালা করে ঘুমায়। সেখানে লেখাপড়ার পরিবেশ নেই, কর্মসংস্থান নেই। ফলে বেশির ভাগের আয়ের সহজ উপায় হয় মাদক বিক্রি। তবে ক্যাম্পের কারবারিদের নেপথ্যে রয়েছে ‘হোয়াইট কলার’ ক্রিমিনালরা, যারা স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। তাদের সংশ্লিষ্টতা প্রমাণ করা বা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন। 

মোহাম্মদপুর থানার সাবেক ওসি আলী ইফতেখার হাসান বলেন, সেখানে খুচরা মাদক বিক্রেতাদের বেশির ভাগই নারী ও শিশু। আট থেকে ১০ বছরের শিশুরাও মাদক বিক্রি করে। ক্যাম্পের গলি ঘুপচির কারণে মাদক লুকানো ও পালানোর জায়গা অনেক। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু অসাধু সদস্যও কারবারিদের সঙ্গে জড়িত। তাদের মাধ্যমে কারবারিরা আগেই খবর পেয়ে পালিয়ে যায়। আসলে শুধু অভিযান চালিয়ে এই কারবার বন্ধ করা যাবে না। ক্যাম্পের বাসিন্দাদের বিকল্প কর্মসংস্থান এবং তাদের সমাজের মূলধারায় আনার ব্যবস্থা করতে হবে। 

রাজনৈতিক ছত্রছায়া 

বর্তমানে কারাগারে থাকা ভূঁইয়া সোহেলকে একসময় আশ্রয় প্রশ্রয় দিতেন সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের নেতা জাহাঙ্গীর কবির নানকের ব্যক্তিগত সহকারী মাসুদুর রহমান বিপ্লব। তাঁর হয়ে মাদক কারবারির সঙ্গে লেনদেন করতেন জয়নুল আবেদিন জয় ও মো. আরমান। পট পরিবর্তনের পর সোহেল মোহাম্মদপুর থানা ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলাল ও তাঁর সহযোগীদের ছত্রছায়ায় চলা শুরু করেন। হত্যাসহ সন্ত্রাসী কার্যকলাপের অভিযোগে কারাগারে থাকা হেলাল গত বছর আগস্টে মুক্তি পান। অভিযোগ নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ ধরনের কার্যকলাপের সঙ্গে আমার সংশ্লিষ্টতা নেই। আমি ভূঁইয়া সোহেল নামে কাউকে চিনি না।’

আদাবর থানা বিএনপির বহিষ্কৃত নেতা মনোয়ার হাসান জীবন ওরফে লেদু হাসানের বিরুদ্ধেও সোহেলসহ ক্যাম্পের শীর্ষ মাদক কারবারিদের অর্থের বিনিময়ে আশ্রয় প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে জানতে তাঁর মোবাইল ফোনে বারবার কল দেওয়া হলেও তিনি ধরেননি।  

৫ আগস্টের পর বিএনপি নেতা পরিচয়ে শাহনেওয়াজ আলম ক্যাম্পে আধিপত্য সৃষ্টির চেষ্টা চালান বলে জানান স্থানীয়রা। এ ব্যাপারে শাহনেওয়াজ বলেন, ‘আমি বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয়। এ কারণে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও মাদক কারবারিরা মিথ্যা তথ্য ছড়াচ্ছে। একই কারণে আমাকে শাহ আলম হত্যা এবং আমার ভাই মর্তুজা আহমেদকে জাহিদ হত্যায় আসামি করা হয়েছে।’

বিহারিদের সংগঠন এসপিজিআরসির ক্রীড়া সম্পাদক মাসুদ রানা ওরফে ছোট্টু তাঁর বোন মাদক কারবারি রানী ও ছেলে ইমতিয়াজকে পুলিশি ঝামেলা থেকে আগলে রাখেন। এ বিষয়ে জানতে মাসুদ রানার মোবাইল ফোন নম্বরে কল করে তা বন্ধ পাওয়া যায়। এসপিজিআরসির সভাপতি শওকত আলী বলেন, ‘কমিটির কেউ অপরাধে জড়ালে তা তো আমি জানব না।’ 

আরও পড়ুন

×