বিশ্বকবির প্রয়াণ দিবস
শ্রাবণের মেঘের ধারায় সুরের অঞ্জলি
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৬ আগস্ট ২০২৬ | ২৩:৪৬
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রয়াণের ৮৫ বছর পেরিয়ে গেলেও তাঁর সৃষ্টি যেন আজও সময়ের ভেতর দিয়ে নতুন করে ফিরে আসে। কোথাও গানের সুরে, কোথাও আবৃত্তির উচ্চারণে, আবার কোথাও মঞ্চের আলো-আঁধারিতে তাঁর মানবিক বোধ ও সৌন্দর্যচেতনা নতুন ব্যাখ্যা খুঁজে নেয়।
বৃহস্পতিবার রাজধানীতে দুটি ভিন্ন আয়োজনে সেই চিরন্তন রবীন্দ্রনাথই হয়ে উঠলেন স্মরণ, অনুভব ও সাংস্কৃতিক মিলনের কেন্দ্রবিন্দু। একদিকে ছায়ানট মঞ্চস্থ করল রবীন্দ্রনাথের কালজয়ী গীতিনাট্য ‘শ্যামা’, অন্যদিকে ঢাকার ভারতীয় হাইকমিশনের ইন্দিরা গান্ধী সাংস্কৃতিক কেন্দ্র (আইজিসিসি) আয়োজন করল রবীন্দ্রসংগীত ও কবিতা নিয়ে বিশেষ সন্ধ্যা ‘ইতি রবীন্দ্রনাথ’।
সন্ধ্যা ৭টায় ছায়ানট মিলনায়তনে শুরু হওয়া অনুষ্ঠানের সূচনায় ছিল তানিয়া মান্নানের ‘নেপথ্যকথন’। এরপর মঞ্চে আসে ‘শ্যামা’। প্রেম, ত্যাগ, অপরাধবোধ এবং আত্মদানের গভীর মানবিক বোধে নির্মিত এই গীতিনাট্য ছায়ানটের শিল্পীদের নিবেদিত পরিবেশনায় নতুন আবহ পায়। নামভূমিকায় মনীষা সরকার সংযত ও আবেগঘন অভিনয়ে শ্যামার অন্তর্দ্বন্দ্ব ফুটিয়ে তোলেন। বজ্রসেন চরিত্রে দীপ্র নিশান্ত, উত্তীয় চরিত্রে সঞ্জয় বণিক, কোটাল চরিত্রে অর্ণব বড়ুয়া এবং বন্ধু চরিত্রে মো. ইনজামাম উল-হোসেন ইমন নিজ নিজ ভূমিকায় নাট্যগভীরতা যোগ করেন। পাশাপাশি বৃহৎ শিল্পীদলের সম্মিলিত অংশগ্রহণ গীতিনাট্যের নান্দনিকতাকে আরও সমৃদ্ধ করে।

প্রযোজনাটির সংগীত পরিচালনা করেন এ.টি.এম. জাহাঙ্গীর। সার্বিক পরিকল্পনা ও সজ্জায় ছিলেন শর্মিলা বন্দ্যোপাধ্যায়। তবলা, মন্দিরা, সেতার, কিবোর্ড, বাঁশি ও এসরাজের সজীব যন্ত্রানুষঙ্গ মঞ্চে গড়ে তোলে রবীন্দ্রনাথের সুরনাট্যের অনুকূল আবহ। শেষ হয় জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে।
একই সন্ধ্যায় ইন্দিরা গান্ধী সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হয় ‘ইতি রবীন্দ্রনাথ’ শীর্ষক বিশেষ অনুষ্ঠান। রবীন্দ্রসংগীত ও কবিতার সমন্বয়ে সাজানো এ আয়োজন দুই বাংলার অভিন্ন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের পাশাপাশি ভারত ও বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বন্ধনের বার্তাও তুলে ধরে।
অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশন করেন সংগীতশিল্পী স্বপ্নীল সজীব। তাঁর কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথের গান একদিকে যেমন বিষাদের কোমলতা, অন্যদিকে তেমনি আশাবাদের দীপ্তিও ছড়িয়ে দেয়। এরপর আবৃত্তিশিল্পী সামিউল ইসলাম পলকের কণ্ঠে উচ্চারিত হয় রবীন্দ্রনাথের কবিতা। কণ্ঠ, উচ্চারণ ও আবেগের মেলবন্ধনে কবিতাগুলো উপস্থিত দর্শকদের মনোযোগ ধরে রাখে শেষ পর্যন্ত।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্য ও দর্শন ভারত ও বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে এক অবিচ্ছেদ্য সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধ তৈরি করেছে। তাঁর মানবতাবাদ, শান্তি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের শিক্ষা আজও দুই দেশের মানুষের কাছে সমানভাবে প্রাসঙ্গিক এবং আগামী প্রজন্মকেও অনুপ্রাণিত করবে।
সন্ধ্যার আয়োজনে উপস্থিত ছিলেন রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং সংস্কৃতিপ্রেমী দর্শক। প্রয়াণ দিবসের দুটি পৃথক আয়োজনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে–রবীন্দ্রনাথ কেবল স্মৃতির মানুষ নন, তিনি এখনও বাঙালির সাংস্কৃতিক চেতনার এক জীবন্ত উপস্থিতি। সময় বদলায়, প্রজন্ম বদলায়, কিন্তু তাঁর গান, কবিতা ও নাট্যভাবনা নতুন প্রেক্ষাপটে বারবার ফিরে এসে মানুষকে মনে করিয়ে দেয় মানবিকতা, সৌন্দর্য এবং শিল্পের অনন্ত শক্তির কথা।