ঢাকা শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২৬

বুড়িগঙ্গা অত্যন্ত সংকটাপন্ন-তুরাগ সংকটাপন্ন, ধলেশ্বরী অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ

বুড়িগঙ্গা অত্যন্ত সংকটাপন্ন-তুরাগ সংকটাপন্ন, ধলেশ্বরী অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ
×

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬ | ০৯:১৫ | আপডেট: ১৪ আগস্ট ২০২৬ | ১২:৪৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীকে ‘অত্যন্ত সংকটাপন্ন’, তুরাগকে ‘সংকটাপন্ন’ এবং ধলেশ্বরীকে ‘অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে বাংলাদেশ নৌবাহিনী। শিল্পকারখানার বর্জ্য, পয়ঃবর্জ্য, প্লাস্টিক, বাজারের আবর্জনা, নৌযানের তেলসহ নানা দূষিত পদার্থের কারণে নদীগুলোর এই অবস্থা তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নদী দখল, তীরবর্তী অবৈধ স্থাপনা, পলি জমে নাব্য কমে যাওয়া এবং স্বাভাবিক প্রবাহপথ সংকুচিত হওয়ার মতো সমস্যা।

‘বুড়িগঙ্গা নদীর দূষণ নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন রূপরেখা’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে নৌবাহিনী এসব তথ্য তুলে ধরেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের মতবিনিময় সভায় প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন নৌবাহিনীর ঢাকা নৌ অঞ্চলের কমান্ডার রিয়ার অ্যাডমিরাল আবদুল্লাহ আল মাকসুস।
‘বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ নদীর দূষণ নিয়ন্ত্রণ ও নদী সংরক্ষণকল্পে’ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তা ও অংশীজনের সঙ্গে এ মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়।
নৌবাহিনীর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বুড়িগঙ্গার দূষণের প্রধান উৎসগুলোর মধ্যে রয়েছে ট্যানারি বর্জ্য, পয়ঃবর্জ্য, শিল্প ও বাজারের বর্জ্য, তেল এবং বিভিন্ন ধরনের কঠিন আবর্জনা। পাশাপাশি নৌযান থেকে নির্গত তেল ও অন্যান্য দূষিত পদার্থও দূষণ বাড়াচ্ছে।

প্রতিবেদনে বুড়িগঙ্গার তীরবর্তী সদরঘাট, হাজারীবাগ, কামরাঙ্গীরচর, জিঞ্জিরা ও শ্যামপুরকে দূষণের হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব এলাকায় ঘনবসতি ও শিল্পকারখানার পাশাপাশি বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে বিপুল পরিমাণ দূষিত পদার্থ নদীতে পড়ছে। অন্যদিকে তুরাগ নদীর প্রধান দূষণ উৎস হিসেবে শিল্পবর্জ্য, পয়ঃবর্জ্য, প্লাস্টিক ও অন্যান্য কঠিন বর্জ্যকে চিহ্নিত করা হয়েছে। নদীর তীরবর্তী শিল্প ও আবাসিক এলাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি থাকায় এসব পদার্থ সরাসরি নদীতে পড়ছে।

প্রতিবেদনে কোনাবাড়ী, কাশিমপুর, টঙ্গী, কামারপাড়া, আশুলিয়া ও আশপাশের বিভিন্ন শিল্প ও আবাসিক এলাকাকে তুরাগ দূষণের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব এলাকায় শিল্পকারখানা ও বসতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নদীতে বর্জ্য প্রবেশের পরিমাণও বেড়েছে। বুড়িগঙ্গা ও তুরাগের তুলনায় ধলেশ্বরী নদীর দূষণ নিয়ে আলোচনা কম হলেও এ নদীও নিরাপদ নয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। শিল্পবর্জ্য, ভারী ধাতু এবং জীবাণু দূষণকে ধলেশ্বরীর প্রধান দূষণ উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ফলে নদীটির পরিবেশগত ঝুঁকি দ্রুত বাড়ছে।
নৌবাহিনীর প্রতিবেদনে নদীগুলোর সংকটকে শুধু দূষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি। নদী দখল, তীরবর্তী অবৈধ স্থাপনা, পলি জমে নাব্য কমে যাওয়া এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহপথ সংকুচিত হয়ে যাওয়াকেও বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় দূষিত পানি দ্রুত সরে যেতে পারছে না। এতে দূষণের মাত্রা আরও বাড়ছে এবং নদীর পানি ও জলজ পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি হচ্ছে।
মতবিনিময় সভায় বন ও পরিবেশমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু ব্যবসায়ীদের কারখানার ইটিপি নিয়মিত চালু রাখার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, যেসব কারখানায় ইটিপি আছে, সেগুলো চালু রাখতে হবে। কারখানায় ইটিপি থাকলেও সেটি চালু না রাখলে নদী দূষণ হবে। প্রত্যেক কারখানার ইটিপি যেন চালু থাকে, সেদিকে নজর দিতে হবে। উৎপাদন বাড়াতে হবে, সম্পদ সৃষ্টি করতে হবে। একই সঙ্গে সম্পদ উৎপাদনের কারণে দেশের পরিবেশ যাতে নষ্ট না হয়, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে।

তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম নদী দূষণ নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, একটি কারখানা ইটিপি চালিয়ে যে খালে পরিশোধিত পানি ফেলছে, একই খালে আরও ২০, ৩০ বা ৫০টি কারখানা ইটিপি ছাড়াই সরাসরি বর্জ্য ফেলছে। ফলে একটি কারখানা ইটিপি চালিয়ে পানি পরিশোধন করলেও তার সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। বরং ওই কারখানার উৎপাদন খরচ বাড়ছে। এ কারণে অন্তত খালের মুখগুলোতে কেন্দ্রীয় ইটিপি স্থাপনের দাবি জানান তিনি। তাঁর মতে, এ ধরনের ব্যবস্থা করা গেলে পরিবেশ ও নদী দূষণ নিয়ন্ত্রণে ফল পাওয়া সম্ভব।
তুরাগ নদের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে বিজিএমইএর জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ইনামুল হক খান বলেন, তুরাগের পানি নড়ে না, কাদার মতো হয়ে গেছে। পরিস্থিতি সত্যিই ভয়াবহ। 
মতবিনিময় সভায় পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম এবং প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তারসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

আরও পড়ুন

×