কাজ শেষ না করেই গোস্সা নিবারণী পার্ক উদ্বোধনের প্রস্তুতি
ছবি- সংগৃহীত
অমিতোষ পাল
প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:৫০ | আপডেট: ২৯ আগস্ট ২০২৬ | ১০:২৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
নগরবাসীর গোস্সা নিবারণের লক্ষ্যে ওসমানী উদ্যান আধুনিকায়ন প্রকল্পের কাজ ১০ বছরেও শেষ করতে পারেনি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। এই এক দশক সাধারণের প্রবেশাধিকার ছিল না। এখন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সময় দিলে উদ্বোধন করা হবে। এর মধ্য দিয়ে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত হবে এই পার্ক।
প্রকল্প পরিচালক ডিএসসিসির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, প্রকল্পের কাজ প্রায় শেষ। ধোয়ামোছা ও পানির পাম্প বসানোর মতো কিছু খুচরা কাজ বাকি আছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কখন সময় দিতে পারবেন, তা জানতে পারলে এসব কাজ শেষ করতে বেশি দেরি হবে না।
জানা গেছে, নানা সমস্যায় জর্জরিত নগরবাসীর রাগ প্রশমন বা গোস্সা নিবারণের জন্য তৎকালীন মেয়র সাঈদ খোকনের সময় ২০১৬ সালে ডিএসসিসি নগর ভবন লাগোয়া ওসমানী উদ্যানে ‘গোস্সা নিবারণী পার্ক’ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়। যদিও কাগজে-কলমে এটি ছিল ‘ওসমানী উদ্যান উন্নয়ন প্রকল্প’। এর নকশা করেন স্থপতি রফিক আজম। ব্যয় ধরা হয় ৫৮ কোটি টাকা। ২০১৮ সালের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা থাকলেও পারেনি ডিএসসিসি।
একজন প্রকৌশলী সমকালকে বলেন, প্রথমে দ্য বিল্ডার্স নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ শুরু করে। কিন্তু তাদের কাজে সন্তুষ্ট ছিল না ডিএসসিসি। পরে ব্যারিস্টার তাপস মেয়র হওয়ার পর ওই ঠিকাদারকে দফায় দফায় নোটিশ দিয়ে এক পর্যায়ে দ্য বিল্ডার্সকে বাদ দেওয়া হয়। নতুন করে কাজ দেওয়া হয় সোনার বাংলা-পিএফসি জেভি নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে। কিন্তু ততক্ষণে দীর্ঘ সময় ব্যয় হয়ে যায়। সেই সঙ্গে ব্যয় বেড়ে হয়ে যায় ১০০ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। ওই সময়ের মধ্যেও কাজ শেষ হয়নি। জুলাই গণঅভ্যুত্থ্যানের পর কাজ আরও ঝুলে যায়। সর্বশেষ গত জুনের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা ছিল। তাও সময়মতো শেষ হয়নি। এখন তাড়াহুড়া করে জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সরেজমিন দেখা গেছে, উদ্যানের লেকের পাশেই বিশাল এলাকাজুড়ে লাল ইটের একটি বিশালাকৃতির ভূগর্ভস্থ অবকাঠামো। ওপরে মার্বেল পাথরের তৈরি বেঞ্চ। আন্ডারগ্রাউন্ডে রয়েছে গাড়ি পার্কিং, ১২টি ছোট ফুডকোর্ট, ব্যায়ামের স্থান, বাচ্চাদের খেলার জায়গা, লাইব্রেরি, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, টয়লেট ও নগর জাদুঘর স্থাপনের জন্য সংরক্ষিত একটি কর্নার। কিন্তু আশপাশে ময়লা-আবর্জনা পড়ে আছে। সামনের অংশে চা দোকান, ভ্যানের গ্যারাজ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক আসাদুল ইসলাম সমকালকে বলেন, ‘আমদের কাজ মোটামুটি শেষ পর্যায়ে। এখন সিটি করপোরেশন বুঝে নিতে চাইলে বুঝিয়ে দেওয়া হবে।’
ডিএসসিসি সূত্রে জানা গেছে, উদ্যানের মোট জায়গা প্রায় ২২ একরের মধ্যে চার বিঘায় নির্মাণ করা হয়েছে ভূগর্ভস্থ অবকাঠামো। আর পাশের লেকের পরিধি বাড়িয়ে আধুনিকায়ন করা হয়েছে। ওই চৌহদ্দিতে থাকা গাছগুলোর চারপাশ কংক্রিট দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। এরই চারপাশে রয়েছে লেক। কিন্তু এই বর্ষা মৌসুমেও লেকে পানি নেই। আগাছায় ভরা।
এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক সাইফুল ইসলাম বলেন, পাম্প থেকে পানি দিলেই লেকটি ভরে যাবে।
তবে প্রকল্পের নকশাকার স্থপতি রফিক আজম সমকালকে বলেন, লেকটি গভীর। কিন্তু মাটির গুণাগুণের কারণে এতে পানি থাকে না। লেকের নিচে ত্রিপল দিয়ে পানি ধরে রাখার চেষ্টা করা হবে। এ পদ্ধতিতে লালবাগে একটা জায়গায় পানি সংরক্ষণ করা গেছে।
উদ্যানে কংক্রিটের জঞ্জাল
উন্নয়নের নামে ওসমানী উদ্যানে একের পর এক কংক্রিটের অবকাঠামো নির্মাণ করা হচ্ছে বলে নগর পরিকল্পনাবিদ ও পরিবেশবাদীরা অভিযোগ জানিয়ে আসছেন শুরু থেকেই। তারা বলছেন, একসময় ওসমানী উদ্যান ছিল লেক আর সবুজে ঘেরা। এখন সেখানে কংক্রিটের জঞ্জাল তৈরি করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কামরুজ্জামান মজুমদার সমকালকে বলেন, ‘একটি উদ্যানে সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ জায়গায় অবকাঠামো থাকতে পারে। কিন্তু ওসমানী উদ্যানে সেটা হয়ে যাচ্ছে ৩৫ শতাংশ। এ নিয়ে আমরা বাপার পক্ষ থেকে মানববন্ধন করেছি, স্মারকলিপি দিয়েছিলাম।’
এদিকে গত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ওসমানী উদ্যানে জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন তৎকালীন স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। এ জন্য ব্যয় ধরা হয় ৪৬ কোটি টাকা। এ প্রকল্পের আওতায় ৯০ ফুট উঁচু স্তম্ভ তৈরির কথা। স্তম্ভের পাদদেশে গোলাকার একটি ‘প্ল্যাটফর্ম’ তৈরি করা হবে। থাকবে ব্রিটিশ আমল থেকে জুলাই অভ্যুত্থানের ইতিহাসসংবলিত ভাস্কর্য। নির্মাণ করা হবে স্তম্ভের পাদদেশ ঘিরে হাঁটাপথ। এটা করা হলে উদ্যানের আরও গাছ কাটা পড়বে। কংক্রিটের বিস্তৃতি আরও বাড়বে। অবশ্য এ কাজের বর্তমানে তেমন কোনো অগ্রগতি নেই বলে জানা গেছে।
স্থপতি রফিক আজম বলেন, তিনি ওসমানী উদ্যান আধুনিকায়নের যে নকশা করেছেন, সেখানে কোনো গাছ কাটা পড়েনি। বরং গাছগুলোকে রেখেই লেকের পরিধি বাড়ানো হয়েছে। আর যেখানে আন্ডারগ্রাউন্ড অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে, সেখানে গর্তের মতো ছিল। এ জন্য ভূগর্ভে অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে। সেখানকার মাটিও কাটা হয়নি।
- বিষয় :
- উদ্বোধন