পল্লবীতে বিএনপি-জামায়াতের সংঘর্ষের নেপথ্যে জমি দখল
ছবি: সংগৃহীত
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬ | ১২:৪৮
একটি ফাঁকা জমি দখল করা নিয়ে রাজধানীর পল্লবীতে বিহারি ক্যাম্পে গত শনিবার বিএনপি ও জামায়াতের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। গতকাল রোববার পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।
জানা গেছে, ক্যাম্পের বিএনপিপন্থি নেতা সাদাকাত খান ফাক্কু ও তাঁর অনুসারীদের ওয়াসার পানির পাম্প স্থাপন এবং জামায়াতপন্থি নেতা নিয়াজ আহমেদ খান ও তাঁর অনুসারীরা মরদেহের গোসলখানা নির্মাণের আড়ালে বিহারিদের তালাব ক্যাম্পের এমসিসি শৌচাগারের পেছনের জমিটি দখলে নিতে চান।
গত শনিবার সন্ধ্যায় পল্লবীতে ৫ নম্বর ওয়ার্ড এলাকার বিহারিদের তালাব ক্যাম্পে মরদেহের গোসলখানা নির্মাণকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও জামায়াতের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে নিয়াজসহ স্থানীয় জামায়াতের শতাধিক কর্মী-সমর্থক এবং বিহারি সংগঠনের নেতা সাদাকাত খান ফাক্কুর নেতৃত্বে বিএনপির অন্তত দেড়শ কর্মী-সমর্থক জড়িয়ে পড়েন। এ সময় ককটেল ফাটানো হয়। গুলি ছোড়া হয়। সংঘর্ষ চলাকালে পল্লবী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) এমদাদুল হকসহ ১০ থেকে ১২ জন আহত হন।
গতকাল বেলা সাড়ে ১১টার দিকে গিয়ে দেখা যায়, পল্লবীর ১১ নম্বর সেকশনের বি ব্লকের ৪ নম্বর লাইনের তালাব ক্যাম্পের এমসিসি শৌচাগারের পেছনে একটি ফাঁকা জমি। জমিটির এক পাশে ক্যাম্পে ঢোকার রাস্তা। জমিটির এক পাশে শৌচাগার অন্য পাশে আরেকটি ঘরের দেয়াল। দেয়ালটিতে ‘মৃত ব্যক্তির গোসলের স্থান’ লিখে ব্যানার টানানো। জমিটির মাঝে শৌচাগারের ড্রেন। বাকি দুই পাশে নতুন করে ইট বসানো হয়েছে। যার দুই পাশে নতুন করে ইট বসিয়ে দেয়ালও তোলা হচ্ছিল। এক কোনায় চারটি পিলার করে বসানো হয়েছে পানির চৌবাচ্চা। তালাব, মিল্লাত ক্যাম্পসহ আশপাশের বাসিন্দারা জমিটি দেখতে আসছেন। রাস্তার বিভিন্ন স্থানে জড়ো হয়ে গত শনিবারের সংঘর্ষের বিষয় নিয়ে গল্প করছেন লোকজন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ক্যাম্পটির ওই ফাঁকা জমিটিতে আগে গাছ ও আবর্জনা ছিল। গত এক মাসে জমিটি পরিষ্কার করে এখানে মরদেহ গোসলখানা নির্মাণের উদ্যোগ নেয় এবং ইটের দেয়াল তৈরি করেন জামায়াতের কর্মীরা। সেখানে পানির ট্যাঙ্ক বসানো হয়েছে। তবে ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা সাদাকাত খান ফাক্কুসহ তাঁর অনুসারীরা সেখানে ওয়াসার পানির পাম্প বসানোর সিদ্ধান্ত নেন। এই স্থানটিতে দুপক্ষই নিজেদের মতো করে দখলে নিতে চায়। গত শনিবার দুপুরে ফাক্কুর লোকজন জড়ো হন। এতে দুপক্ষের মধ্যে প্রথমে উত্তেজনা দেখা দেয়। কিছু সময়ের জন্য পরিস্থিতি শান্ত হলে বিষয়টি সমাধানেরও চেষ্টা করা হয়। তবে সন্ধ্যায় নিয়াজের নেতৃত্বে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ জন এবং ফাক্কু ও সোহেলের নেতৃত্বে উভয় পক্ষে প্রথমে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া এবং পরে সংঘর্ষ হয়। কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরণ ও কয়েকটি ফাঁকা গুলি ছোড়া হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। পরে অতিরিক্ত পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়।
৩ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সাবেক সভাপতি শাকিল খান সমকালকে বলেন, ক্যাম্পের কোথাও এই ধরনের মরদেহের গোসলখানা নেই। একটি আছে, সেটা মসজিদের। জামায়াতের লোকজন এটার নাম করে কৌশলে জমিটি দখলে নিতে চায়। কারণ, বিহারি ক্যাম্পের ওই এলাকাটাতে মাদকের ব্যবসা রমরমা। তারা মূলত সেখানে মাদকের ব্যবসা করতে চায়।
এ ঘটনায় শনিবার রাতেই পল্লবী থানায় দুটি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে পল্লবী থানা পুলিশ বাদী হয়ে একটি মামলা করেছে। অপর মামলাটি করেছেন পল্লবী থানার ৩ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সাবেক সভাপতি শাকিল খান। উভয় মামলায় নিয়াজ আহমেদ খান, সুমন, নাসির উদ্দিন খান সজলসহ ২২ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ১০০ থেকে ১৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
শাকিল খানের করা মামলার এজাহারে বলা হয়, তালাব ক্যাম্পের এমসিসি টয়লেটের পেছনের ফাঁকা জমি স্থানীয় বাসিন্দাদের পানির চাহিদা মেটাতে ওয়াসার পানির পাম্প স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ নিয়ে আসামিরা ওই জমি অবৈধভাবে দখলের চেষ্টা করে বিভিন্ন সময় হুমকি দিয়ে আসছিলেন। এর জেরে ২৯ আগস্ট সন্ধ্যা ৭টা ১০ মিনিটের দিকে আসামিরা দেশি অস্ত্র নিয়ে সেখানে গিয়ে বাদী ও তাঁর দলীয় নেতাকর্মীদের গালাগাল করে। পরে তারা মিছিল নিয়ে এসে পানির পাম্প স্থাপন করতে দেওয়া হবে না বলে স্লোগান দেন এবং বাদীসহ তাঁর লোকজনের ওপর হামলা চালান। এ সময় ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও মারধরে কয়েকজন আহত হন। এক পর্যায়ে আসামিদের একজন ধারালো চাপাতি দিয়ে দলীয় কর্মী সুজন শেখের মাথায় কোপ দিয়ে গুরুতর জখম করে এবং আরেকজন ইমরান মোল্লার মাথায় রামদা দিয়ে আঘাত করে। এক পর্যায়ে স্থানীয় লোকজন মামলার ১ নম্বর আসামি নিয়াজ খানকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করে।
বাদী শাকিল খানের করা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মো. মাহাবুব হাসান সমকালকে বলেন, গ্রেপ্তার নিয়াজকে গতকাল আদালতে তোলা হলে জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। অন্য আসামিদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
- বিষয় :
- রাজধানী