ওয়াটারএইডের দক্ষিণ এশিয়ার পরিচালক খায়রুল ইসলামের মৃত্যুতে স্মরণসভা
রাজধানীর আগারগাঁওয়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর মিলনায়তনে ‘তোমার অসীমে’ শীর্ষক খায়রুল ইসলামের স্মরণসভা।
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬ | ১৯:৫৩
জনস্বাস্থ্য ও ওয়াশ খাতের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব, গবেষক ও লেখক এবং ওয়াটারএইড দক্ষিণ এশিয়ার প্রয়াত রিজিওনাল ডিরেক্টর ডা. মো. খায়রুল ইসলামের জীবন, কর্ম ও মানবিক অবদান স্মরণে নাগরিক স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
রবিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর মিলনায়তনে ‘তোমার অসীমে’ শীর্ষক এ স্মরণসভার আয়োজন করা হয়। এতে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শিক্ষা উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী, জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ম. তামিম, অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ, স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের সদস্য অধ্যাপক ডা. লিয়াকত আলী, ওয়াটারএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর হাসিন জাহানসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তি, তাঁর পরিবারের সদস্য, সহকর্মী, বন্ধু ও শুভানুধ্যায়ীরা অংশ নেন।
স্মরণসভায় বক্তারা বলেন, ডা. খায়রুল ইসলাম বাংলাদেশের পানি, স্যানিটেশন ও হাইজিন (ওয়াশ) এবং জনস্বাস্থ্য খাতের অগ্রযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। মানুষের স্বাস্থ্য ও কল্যাণকে তিনি শুধু চিকিৎসার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি— নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন, স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক বাস্তবতাকেও জনস্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করেছেন।
১৯৫৯ সালে জন্ম নেওয়া খায়রুল ইসলাম মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা শেষে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। পরে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব প্রিভেন্টিভ অ্যান্ড সোশ্যাল মেডিসিন (নিপসম) থেকে প্রিভেন্টিভ অ্যান্ড সোশ্যাল মেডিসিনে এমফিল এবং যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনে উচ্চতর শিক্ষা সম্পন্ন করেন।
বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের স্বাস্থ্য ক্যাডারে যোগদানের মধ্য দিয়ে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও পরিকল্পনা কমিশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। কর্মজীবনে দ্য এশিয়া ফাউন্ডেশন, গ্রামীণ ব্যাংক, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল ও অরবিস ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশসহ বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেন।
২০০৮ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ওয়াটারএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর এবং ২০১৯ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ওয়াটারএইড দক্ষিণ এশিয়ার রিজিওনাল ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। তাঁর নেতৃত্বে ওয়াশ অর্থায়ন, জলবায়ু-সহনশীল ওয়াশ, স্কুল ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে ওয়াশ, নগর দরিদ্র জনগোষ্ঠীর স্যানিটেশন, গবেষণা ও নীতিনির্ধারণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ এগিয়ে যায়।
কর্মজীবনের একটি পর্যায়ে পূর্ব ও দক্ষিণ আফ্রিকাতেও দায়িত্ব পালন করেন খায়রুল ইসলাম। প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের রিজিওনাল প্রোগ্রাম সাপোর্ট ম্যানেজার হিসেবে তিনি আঞ্চলিক কার্যক্রমে নেতৃত্ব দেন। আফ্রিকার কয়েকটি দেশে কমিউনিটি-লেড টোটাল স্যানিটেশন (সিএলটিএস) পদ্ধতি চালু ও বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
পেশাগত কাজের পাশাপাশি গবেষণা ও লেখালেখিতেও সক্রিয় ছিলেন তিনি। জনস্বাস্থ্য, স্বাস্থ্যব্যবস্থা, সমাজ ও ইতিহাস নিয়ে তাঁর লেখালেখি পাঠকমহলে সমাদৃত হয়। ‘বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের বিকাশ’ গ্রন্থের সম্পাদনা পরিষদের সদস্য ও প্রদায়ক ছিলেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধের চিকিৎসা ইতিহাস নিয়েও দীর্ঘ গবেষণা করেছেন। কথাসাহিত্যিক ও চিকিৎসা নৃবিজ্ঞানী শাহাদুজ্জামানের সঙ্গে যৌথভাবে রচনা করেন ‘মুক্তিযুদ্ধের চিকিৎসা ইতিহাস’ বইটি। ২০২২ সালে প্রথমা প্রকাশন থেকে বইটি প্রকাশিত হয়। এ কাজের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রবর্তিত ‘বজলুল রহমান স্মৃতিপদক’ লাভ করেন।
সহকর্মীদের পেশাগত ও নেতৃত্বের বিকাশেও তাঁর ভূমিকার কথা স্মরণ করেন বক্তারা। তাঁদের ভাষ্য, প্রজ্ঞা, দূরদৃষ্টি, বিনয় ও মানুষের প্রতি গভীর মমতার কারণে তিনি শুধু একজন সফল সংগঠক ও নেতা ছিলেন না; অসংখ্য মানুষের মেন্টর ও পথপ্রদর্শকও ছিলেন।
চলতি আগস্ট মাসেই দীর্ঘ কর্মজীবন থেকে তাঁর অবসর নেওয়ার কথা ছিল। সহকর্মীরা তাঁকে বিদায় জানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এর মধ্যেই গত ২১ আগস্ট তাঁর আকস্মিক মৃত্যু হয়।
স্মরণসভায় পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁর একমাত্র সন্তান সামিন ইশরাক ইসলাম অর্ক স্মৃতিচারণ করেন। অনুষ্ঠানের শেষদিকে তাঁর বড় বোন আঞ্জুমান আরা আকসি উপস্থিত সবাইকে ধন্যবাদ জানান এবং প্রয়াতের আত্মার মাগফিরাত কামনা করা হয়।