ধলপুরের সিটি পল্লি
ছেলে হারানোর শোকের মধ্যে ঘর ছাড়ার তাগাদা
পল্লির বাসিন্দাদের ঘর ছাড়তে বলেছে পুলিশ
মারুফ হোসেন
ইন্দ্রজিৎ সরকার
প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৬ | ০৮:০৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর ধলপুর সিটি পল্লিতে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) অভিযানের সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান ১৮ বছর বয়সী মারুফ হোসেন ওরফে দুখু মিয়া। তাঁর মা সেলিনা বেগম বলেছেন, ছেলে হারানোর শোকের মধ্যেই পুলিশ দুদিন ধরে তাঁকেসহ পল্লির সব বাসিন্দাকে ঘর ছাড়ার তাগাদা দিচ্ছে। আজ রোববার উচ্ছেদ অভিযান চালানোর কথাও বলা হয়েছে।
পুলিশ বলছে, অবৈধ বাসিন্দাদের মৌখিকভাবে ঘর ছাড়তে বলা হয়েছে। তবে এটা আনুষ্ঠানিক উচ্ছেদের নোটিশ না।
সেলিনা বেগমের দাবি, তাঁরা ৩৫ বছর ধরে ধলপুরের ১ নম্বর সিটি পল্লিতে বসবাস করছেন। ১৯৯০ সালে তৎকালীন ঢাকা মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন শর্তসাপেক্ষে বাসিন্দাদের ঘর বরাদ্দ দেয়। সেখানে ২৩০টির মতো ঘরে আট শতাধিক মানুষের বসবাস। তিনি বলেন, ২০২৩ সালে একবার উচ্ছেদ অভিযানে পল্লির সব ঘর ভেঙে দেওয়া হয়। তার পরও বাসিন্দারা সেখানেই থেকে যান। পরের বছর তারা আদালতের শরণাপন্ন হন। ২০২৫ সালে আদালত বিকল্প আবাসনের ব্যবস্থা ছাড়া উচ্ছেদ না করার আদেশ দেন বলে দাবি করেন সেলিনাসহ কয়েকজন বাসিন্দা।
দুখু মিয়ার মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর মা অজ্ঞাতপরিচয় আসামিদের বিরুদ্ধে যাত্রাবাড়ী থানায় মামলা করেছেন। অন্যদিকে, এসআরবি সদস্যদের ওপর হামলার অভিযোগে করা পৃথক মামলায় গত শুক্রবার ২৬ জনকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
নিহতের স্বজন ও প্রতিবেশীদের অভিযোগ, গত মঙ্গলবার মাদকবিরোধী অভিযানের সময় এসআরবি সদস্যদের গুলিতে দুখু মিয়ার মৃত্যু হয়েছে। তবে এসআরবি-১০-এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি মো. আসাদুজ্জামান অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, এসআরবি সদস্যরা আত্মরক্ষায় ফাঁকা গুলি ছুড়েছিলেন। সেই গুলিতে কারও মৃত্যু হয়নি। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, সেদিন শুধু এসআরবি সদস্যরাই গুলি ছুড়েছিলেন।
সেলিনা গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করেন। তাঁর ও ছেলে দুখুর আয়ে সংসার চলত। দুখু অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়িপাতিল তৈরির কারখানায় কাজ করতেন।
সেলিনা গতকাল সমকালকে বলেন, তারা কয়েক দশক ধরে সিটি পল্লিতে বসবাস করছেন। সরকারি এই জায়গা তাদের নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। তিনি বলেন, দুখুর মৃত্যুর পর হঠাৎ করেই তাদের ঘর ছেড়ে চলে যেতে বলা হচ্ছে। অন্যথায় কাল (আজ) সকালে উচ্ছেদ অভিযান চালানোর ঘোষণা দিয়েছে পুলিশ।
সেলিনা বলেন, ‘আমার পোলারে মাইরা ফালাইল। উল্টা এহন আংগোরেই ঘর থিকা বাইর কইরা দিচ্ছে। এইটা কেমুন বিচার?’
দুখুরা তিন ভাই এক বোন। দুখুর বোন রুখসানা বেগম দাবি করেন, ২০২৩ সালে সিটি করপোরেশন একবার সিটি পল্লি উচ্ছেদ করে। তখন এখানের ঘরগুলো ভেঙে দেওয়া হয়। ২০২৪ সালে তারা আদালতের দ্বারস্থ হন। গত বছর আদালত আদেশ দেন, বিকল্প আবাসনের ব্যবস্থা না করে উচ্ছেদ করা যাবে না। দুই মাস আগে প্রশাসন আবার উচ্ছেদের উদ্যোগ নেয়। তখন তারা আদালতের আদেশের বিষয়টি তুলে ধরেন এবং মিছিল নিয়ে নগর ভবনে যান। পরে ওই দফায় আর উচ্ছেদ হয়নি। তবে এবার পুলিশ ও এসআরবির কর্মকর্তারা খুব আগ্রাসী মনোভাব দেখাচ্ছেন।
সিটি পল্লির বাসিন্দাদের সরবরাহ করা কাগজপত্র থেকে জানা যায়, ১৯৯০ সালের আগস্টে তৎকালীন ঢাকা মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন শর্তসাপেক্ষে একেকটি ঘর একেকজন বাসিন্দার নামে বরাদ্দ দেয়। এ জন্য মাসে ১০০ টাকা ভাড়া পরিশোধের শর্তও রয়েছে।
পল্লির বাসিন্দা রাশিদা বেগম জানান, একসময় তারা টিটিপাড়া বস্তি এলাকায় থাকতেন। উন্নয়নকাজের জন্য সেখান থেকে উচ্ছেদের পর পুনর্বাসন হিসেবে তাদের এই জায়গা বরাদ্দ দেওয়া হয় বলে তিনি দাবি করেন। তিনি বলেন, প্রথমে তাদের নামে জমি বরাদ্দের কথা থাকলেও পরে ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়। তবে জমি বরাদ্দের একটি দলিল সিটি করপোরেশনে সংরক্ষিত আছে বলে দাবি করেন তিনি।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা যায়, সিটি পল্লির জমি সিটি করপোরেশনের। ওই জায়গায় সংস্থাটির গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সিটি পল্লি উচ্ছেদের বিষয়ে জানতে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনার ও যাত্রাবাড়ী থানার ওসির মোবাইলে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তারা ধরেননি। পরে ডিএমপির গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের উপকমিশনার আকতার হোসেন বলেন, ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনার সেখানকার অবৈধ বাসিন্দাদের সরে যেতে বলেছেন। এটি আনুষ্ঠানিক উচ্ছেদ নোটিশ নয়।
এদিকে এসআরবির অভিযানের সময় দুখু মিয়ার গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুর ঘটনায় করা মামলার তদন্তের অগ্রগতির বিষয়ে পুলিশ এখনও কিছু জানায়নি।
- বিষয় :
- মৃত্যু