লকডাউনেও পারিবারিক সহিংসতার ভূত
প্রজ্ঞা মাহপারা
প্রকাশ: ১১ এপ্রিল ২০২০ | ০৯:৩৬ | আপডেট: ১১ এপ্রিল ২০২০ | ১১:৩০
কভিড-১৯ এর অভিশাপে পুরো বিশ্বে যেসব সংকট তৈরি হয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম পারিবারিক সহিংসতার ঝুঁকি বৃদ্ধি। এই মহামারির কারণে একের পর এক এলাকা লকডাউন হচ্ছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, লকডাউনে পারিবারিক সহিংসতার মাত্রা বাড়তে পারে। যদিও পারিবারিক সহিংসতার প্রকোপ বৃদ্ধি যে কোনো সংকটকালে একটি স্বাভাবিক ব্যাপার। হোক সেটা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক কিংবা স্বাস্থ্যগত সংকট।
গার্ডিয়ান পত্রিকা জানায়, করোনা মহামারি পারিবারিক সহিংসতার আগুনে ঘি ঢালছে। যারা এই ভয়াবহ সময়ে নিজের অত্যাচারী সঙ্গীর সঙ্গে একই ঘরে আটকে আছেন, তাদের জন্য সামাজিক দূরত্ব রক্ষার ব্যাপারটা চরম দুঃস্বপ্ন ছাড়া কিছুই নয়। আইন বিশেষজ্ঞ এবং নারী অধিকার কর্মীদের মতে, একাকিত্ব এবং মানসিক চাপ মানুষের মাঝে সহিংস মনোভাবের সৃষ্টি করে। আর মহামারির এই আতঙ্ক আরও বেশি হতাশা ও রাগের জন্ম দিতে পারে। এ সময় ঘরবন্দি মানুষের সঙ্গে তাদের আগ্রাসী সঙ্গীরা নৃশংস আচরণ করে এবং একাকিত্বের দোহাই দিয়ে তা ন্যায্য করারও চেষ্টা করতে পারে। এখানে একটি কথা বলা দরকার, শুধু নারী ও শিশুরাই নয়, এ সময় সহিংসতার শিকার হতে পারে পুরুষও।
বিশ্বব্যাপী আশঙ্কা করা হচ্ছে, ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা নির্যাতিতদের আরও বেশি অসহায় করে তুলতে পারে। কেননা ঘরে আক্রান্ত হলে এই সময়ে কারও বাইরে কোথাও যাওয়ার উপায় থাকে না। অনেক ক্ষেত্রে নির্যাতনের শিকার মানুষটি সাহায্যের জন্য কাউকে ডাকতেও পারে না। এসব ক্ষেত্রে ফোনকলও করা যায় না, কারণ নির্যাতনকারী ও নির্যাতিত ব্যক্তি একই ঘরে থাকেন। কর্মক্ষেত্রে যাওয়া, প্রতিবেশিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ কিংবা পরিবারের অন্যদের সঙ্গে সময় কাটানো নির্যাতন ঠেকানোর কৌশল; কিন্তু এখন এসব কৌশল বন্ধ করতে হচ্ছে।
নির্যাতক নানাভাবে নির্যাতন করতে পারে, যেমন- প্রয়োজনীয় দ্রব্য না দেওয়া, স্বাস্থ্য বীমা তুলে নেওয়া, মহামারির ভুল তথ্য দিয়ে আতঙ্কগ্রস্ত করা এবং কিছু ক্ষেত্রে উপযুক্ত চিকিৎসা সহায়তা না দেওয়া।
পুরো বিশ্বেই এ ব্যাপারে দুশ্চিন্তা ছড়িয়ে পড়ছে। চীনের সংবাদপত্রগুলোর প্রতিবেদনেও পারিবারিক সহিংসতার ব্যাপারটি উঠে এসেছে। চীনের হুবেই প্রদেশে পারিবারিক সহিংসতার বিরুদ্ধে একটি অলাভজনক সংস্থা গড়ে তুলেছেন ওয়েন ফেই। তিনি জানিয়েছেন, গত বছরের ফেব্রুয়ারির তুলনায় এবারে সহিংসতা তিনগুণ। যুক্তরাষ্ট্রেও ন্যাশনাল ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স হটলাইনে এসেছে অজস্র অভিযোগ। অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন, কভিড-১৯ সংকটে তারা সঙ্গীর দ্বারা নির্যাতিত ও নিয়ন্ত্রিত হয়েছেন। এমনকি তারা অর্থনৈতিক সহায়তা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষাও পাননি।
অন্যদিকে ইতালিতে হটলাইন অকার্যকর হয়ে যাওয়ার পরও অনেকে ইমেইল এবং এসএমএসের মাধ্যমে নির্যাতনের শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছেন। ব্রাজিলের পরিস্থিতিও অনেকটা একই রকম। স্পেনে ৩৫ বছর বয়সী দুই সন্তানের মা যখন পারিবারিক সহিংসতায় খুন হন, তখন বোঝা যায় যে, লকডাউনের সময়ে পারিবারিক সহিংসতা কতটা ভয়াবহ হয়ে উঠেছে।
পারিবারিক সহিংসতা রোধে পৃথিবীব্যাপী নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চীনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সিনা ওয়েইবুতে হ্যাশট্যাগ হিসেবে #AntiDomesticViolenceDuringEpidemic I #疫期反家暴 ব্যাপকভাবে ব্যবহার হচ্ছে। যেহেতু সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে সহায়তা দেওয়া কেন্দ্রগুলোর কাজ করা কঠিন হয়ে পড়েছে, তাই এখন জার্মানিতে প্রতিবেশীদের দিকে নজর রাখতে বলা হচ্ছে। জার্মানির ফেডারেল অ্যাসোসিয়েশন অব উইমেন কাউন্সেলিং অ্যান্ড রেপ ক্রাইসিস সেন্টার বলেছে, ‘যদি আপনি প্রতিবেশীর ঘর থেকে চিৎকার বা কান্নার শব্দ পান, তহালে পুলিশে খবর দেন।’ গ্রিন পার্টির সংসদ সদস্য ক্যাটরিন গোয়েরিং একহার্ট বিনামূল্যে নিরাপদ আবাসন দিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। শুধু তাই নয়, যুক্তরাজ্যের লেবার পার্টির নারী ও সমতা বিষয়ক বক্তা ডন বাটলার জরুরি তহবিল ঘোষণা করার জন্য সেদেশের প্রধানমন্ত্রীকে আহবান জানিয়েছেন। এ ছাড়া বিশেষায়িত পুলিশ মোতায়েন ও বিনামূল্যে আইনি সেবাদান প্রক্রিয়া আলোচনাধীন। স্পেন সরকার জানিয়েছে, অভিযোগ করার জন্য লকডাউনে বাইরে বের হওয়া নারীদের তারা কোন দণ্ড দেবে না। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতের উত্তরপ্রদেশে একটি হটলাইন নাম্বারের মাধ্যমে পুলিশ পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধে সচেষ্ট।
এখন খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে, এ ব্যাপারে বাংলাদেশ কী অবস্থান নিচ্ছে। নারীর প্রতি সহিংসতা আমাদের দেশে আগে থেকেই একটি বড় সমস্যা। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে ৪ হাজার ৬২২ নারী সহিংসতার শিকার হয়। পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রতিবেদনে জানা গেছে, এদেশে ৫৪.২% বিবাহিত নারী নিজের সঙ্গীর দ্বারা আজীবনের জন্য শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হন। আইন ও সালিশ কেন্দ্র বলছে, ২০২০ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে ২৯ নারী স্বামীর হাতে প্রাণ হারান। তবে কিছু ঠুনকো সামাজিক কারণে এ ব্যাপারগুলো এদেশে আড়ালেই থেকে যায়।
আমাদের দেশে এ ধরনের পারিবারিক সহিংসতা রোধে বেশকিছু আইন রয়েছে। ১৯৯০ সালের দিকে আলাদা বিল হিসেবে পারিবারিক সহিংসতা রোধের ব্যাপারটি গণদাবিতে পরিণত হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৭ সালে সিটিজেনস ইনিশিয়েটিভ এগেইনস্ট ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স (সিআইডিভি) তার কার্যক্রম শুরু করে। ২০১০ সালে এই উদ্যোগের সফলতা আসে। সরকার ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স (প্রিভেনশন অ্যান্ড প্রটেকশন) অ্যাক্ট চালু করে। বিনামূল্যে ১০৯- এ ডায়াল করলে জাতীয় সেবাদান কেন্দ্র সরাসরি নির্যাতিতকে সাহায্য করতে পারবে। অবশ্য, নানামুখী সমস্যার কারণে এই পরিষেবাটি ঠিকমতো তার কাজ করতে পারছে না।
কোভিড-১৯ সংকট যে দেশের অর্থনীতিকে একটি বড় ধাক্কা দিচ্ছে তা বেশ স্পষ্ট। বাংলাদেশের জনগণ রাতারাতি চাকরিচ্যুতি ও প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবার অভাব দেখে ফেলেছে। অনিশ্চয়তা আর হতাশায় ভোগা এদেশের পরিবারগুলোতে আরও সহিংসতা বৃদ্ধির আগেই বিশ্বব্যাপী চলমান পরিস্থিতি দেখে আমাদের কি করা উচিত, তা শেখা দরকার। কর্তৃপক্ষের উচিত এই অবস্থা মোকাবিলায় দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া। সংকট নিরসনে আইনব্যবস্থা, উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং সরকারকে একজোট হয়ে কাজ করতে হবে। হটলাইন নাম্বারগুলো হতে হবে আরও গতিসম্পন্ন, আরও সহায়ক। যদি এ ধরনের পদক্ষেপ এখনই নেওয়া না হয়, পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধে চরমভাবে ব্যর্থ হবে বাংলাদেশ।
গবেষক, বিআইজিডি, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়
