ঢাকা বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬

করোনাভাইরাসের প্রভাবে বিপর্যস্ত পর্যটন অর্থনীতি

করোনাভাইরাসের প্রভাবে বিপর্যস্ত পর্যটন অর্থনীতি
×

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ভূঁইয়া

প্রকাশ: ০৩ মে ২০২০ | ০৪:০৩

করোনাভাইরাসের ভয়াল থাবায় থমকে গেছে পৃথিবী। কোন যুদ্ধ নয়, অথচ দেশে দেশে জারি করা হয়েছে কারফিউ, লকডাউন বা জরুরি অবস্থা। দেশে দেশে বন্ধ অর্থনীতির চাকা। বিশ্বজুড়ে আমদানি রপ্তানির চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়েছে। একদেশ থেকে অন্যদেশে ভ্রমণ নিষেধ জারি করা হয়েছে। মানুষ তার নিজ গৃহে অন্তরীণ হয়ে পড়েছে। যার শতভাগ প্রভাব পড়েছে পর্যটনের সাথে সম্পৃক্ত খাতগুলোতে।

২০১৯ সালে বিশ্ব অর্থনীতিতে পর্যটনের ভূমিকা ছিল জিডিপি খাতে ২.৯ ট্রিলিয়ন ডলার, যা মোট জিডিপির প্রায় ১১ শতাংশ। করোনার প্রভাবে এখন পর্যন্ত পর্যটন খাতে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২.১ ট্রিলিয়ন ডলার। বিশ্ব পর্যটন সংস্থার মতে চাকরি হারাবে প্রায় ৭.৫ কোটি পর্যটন কর্মী। শুধু পর্যটন খাতে বিগত বছরের (২০১৯) তুলনায় এই বছর (২০২০) আয় কমবে প্রায় ২৬৪.৫৩ বিলিয়ন ডলার। ব্যবসায় খাতে ভ্রমণ বাবদ ক্ষতির সম্মুখীন হবে ৮১০.৭ বিলিয়ন ডলার। এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ২০২০ সালের এপ্রিল মাসে বিশ্বব্যাপি রেস্টুরেন্ট খাতে শতভাগ ব্যবসায় বন্ধ ছিল।

বিশ্ব পর্যটন সংস্থা সর্বশেষ রিপোর্টে বলা হয়েছে, বিশ্বের শতভাগ পর্যটন স্থান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এই সকল স্থানে প্রায় চার সপ্তাহ এবং কিছু কিছু স্থানে তারো অধিক সময় থেকে এই বিধি নিষেধ চলছে। এই রিপোর্টে ২১৭ স্থানের উপর জরিপ চালানো হয়, যাতে বলা হয় ৪৫ শতাংশ স্থান পর্যটকদের জন্য পুরোপুরি বা আংশিক ভাবে বন্ধ করা হয়েছে, ৩০ শতাংশ স্থান আংশিক বা পুরোপুরিভাবে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বন্ধ করেছে, ১৮ শতাংশ দেশ নির্দিষ্ট দেশ থেকে আগত পর্যটকদের জন্য নিষেধ আরোপ করেছে। ৭ শতাংশ দেশ আরো বিভিন্ন প্রকার বিধিনিষেধ আরোপ করেছে।

ইন্টারন্যাশনাল এয়ার ট্রাসপোর্ট অ্যাসোসিয়েশনের মতে, এয়ারলাইন্স খাতে ২০২০ সালের তুলনায় এই বছর প্রায় ১১ শতাংশের মতো প্রবৃদ্ধি কম হবে। তাছাড়া জুন মাস পর্যন্ত প্রায় ২০ লাখ আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এর ফলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা যাচ্ছে, এভিয়েশন খাতে প্রায় ১৬৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ক্ষতি হবে। তাছাড়া এই শিল্পখাত প্রায় ৬৫.৫ মিলিয়ন কর্মসংস্থান দিয়ে থাকে। ধারণা করা হচ্ছে, করোনাভাইরাসের প্রভাবে এভিয়েশন খাতে বিশ্বব্যাপী প্রায় ২৫ মিলিয়ন কর্মসংস্থান হুমকির মুখে পড়বে।

বাংলাদেশ বিমান তাদের সকল ফ্লাইট বন্ধ রেখেছে, যা আরো দীর্ঘায়িত হতে পারে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স বাদে অন্যান্য বেসরকারি এয়ারলাইন্সে ৬০০ কোটি টাকা এবং কর্মহীন প্রায় ২ হাজার জন। তাছাড়া বেশ কিছু রিপোর্টে বলা হয়েছে, বর্তমানে করোনাভাইরাসের প্রভাব কেটে গেলেও সমগ্র পৃথিবীতে বিমান চলাচল স্বাভাবিক হতে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

২০১৯ সালে বিশ্বে পর্যটকের সংখ্যা ছিল প্রায় ১.৫ বিলিয়ন। ওয়ার্ল্ড ট্যুরিজম অর্গানাইজেশন (ডব্লিটিও) ধারণা করেছিল, এই বছর এ হার আরো ৪ থেকে ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু করোনাভাইরাসের প্রভাবে এ গতিতে ধস পড়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০২০ সালে বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক পর্যটকের সংখ্যা প্রায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ কমে যেতে পারে। ইতিমধ্যে ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলার।

করোনার প্রভাবে পৃথিবীর অনেক মানুষে বেকার হয়ে পড়েছে। মানুষের সঞ্চয় কমে গেছে। ফলে জীবনযাত্রার মানও কমে গেছে। তাই মানুষ আগের চেয়ে ভ্রমণ কম করবে। তাছাড়া স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা চিন্তা করে সবাই ভ্রমণ পরিকল্পনা করবে। এই সকল কারণে করোনার প্রভাব ২০২০ সালের মধ্যে শেষ হয়ে গেলেও পর্যটন খাত স্বাভাবিক হতে আরো দুই থেকে তিন বছর সময় লাগতে পারে।

পর্যটনের উপর নির্ভরশীল দেশগুলো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইনের মত দেশগুলোর জিডিপির একটি বড় অংশ আসে পর্যটন থেকে। তাছাড়া আমেরিকা, স্পেন, ইতালি, ফ্রান্সের মত পর্যটনে উন্নত দেশগুলো সকল প্রকার কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।

বাংলাদেশে পর্যটন একটি উদীয়মান শিল্প। বিগত কয়েক বছরে পর্যটন শিল্পে উন্নতি চোখে পড়ার মত। করোনাভাইরাসের রাহুগ্রাসের প্রভাবে এই শিল্পে ধস নেমে এসেছে। সকল প্রকার হোটেল, মোটেল, রেস্টুরেন্ট বন্ধ হয়ে গেছে। প্যাসিফিক এশিয়া ট্রাভেল অ্যাসোসিয়েশন (পাটা) বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের এক সাম্প্রতিক সমীক্ষা অনুযায়ী জানুয়ারি থেকে মে ২০২০ পর্যন্ত মোট পাঁচ মাসে সার্বিক পর্যটন শিল্পে ৯ হাজার ৭০৫ কোটি টাকার ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং প্রায় ৩ লাখ ৯ হাজার ৫০০ জন তাদের চাকরি হারানোর শঙ্কায় রয়েছেন। হোটেল, রিসোর্ট এবং রেস্তোরায় প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা এবং কর্মহীন প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার জন, ট্রাভেল এজেন্সিতে ৩ হাজার কোটি টাকা এবং কর্মহীন প্রায় ১৫ হাজার জন, ট্যুর অপারেশনে ৪ হাজার ৫০ কোটি টাকা (ইনবাউন্ড, আউটবাউন্ড ও ডমেস্টিক) এবং কর্মহীন প্রায় ৪১ হাজার জন, পর্যটন পরিবহন ও পর্যটকবাহী জাহাজে ৫৫ কোটি টাকা এবং কর্মহীনের সংখ্যা হবে প্রায় ১ হাজার ৫০০ জন।

সারা বিশ্ব তথা বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের জন্য নিশ্চিত বিপর্যয় অপেক্ষা করছে। এই বিপর্যয় কতদিন স্থায়ী হবে তা নির্ভর করছে করোনাভাইরাস কত দিনে নির্মূল হয়। বিশ্ব পর্যটন এর আগেও বিভিন্ন প্রতিকূলতা মোকাবেলা করেছে। ২০০০ সালের পর থেকে সার্স, মার্স, ইবোলার মতো ভাইরাস পৃথিবীতে হানা দিয়েছিল। তবে সেইগুলোর প্রভাব কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলে আবদ্ধ ছিল। করোনোভাইরাস পরবর্তী সময়ে সকলকে কঠিন সময় পার করতে হবে। তাই বর্তমান বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে আমাদের সঠিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। এতে সরকারি সহায়তা প্রয়োজন হবে।

যে কোনো সমস্যার সঠিক সমাধান ও মহামারি নিয়ন্ত্রণের জন্য বিশেষজ্ঞদের মতামত এবং পরামর্শ অতি গুরুত্বপূর্ণ। পর্যটনে বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে আমাদের সঠিক পরিকল্পনা, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও যথাযথ সমন্বয়ের মাধ্যমে এর সঠিক রূপরেখা তৈরি করতে হবে। সরকারের সুদৃষ্টি, সহায়তা পারে এই শিল্পটিকে আবারো ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করতে।

লেখক: চেয়ারম্যান, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×