ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২৬

করোনাকালে রাসেলের চলে যাওয়া

করোনাকালে রাসেলের চলে যাওয়া
×

ড. মাহবুবুর রহমান রাসেল

ড. প্রণব কুমার পান্ডে

প্রকাশ: ০৮ মে ২০২০ | ০১:৫১ | আপডেট: ০৮ মে ২০২০ | ০৬:১১

ড. মাহবুবুর রহমান রাসেল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ছিলেন। ‘ছিলেন’ লিখতে হচ্ছে, কারণ সাত মাস মৃত্যুর সাথে লড়াই করে মাত্র ৩৭ বছর বয়সে ৫ মে আমাদের ছেড়ে চলে গেলো জীবনের ওপারে। গত বছরের ২১ সেপ্টম্বর রাসেলের মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়। রাসেলকে যারা দেখেছেন তারা কেউ বিশ্বাস করতে পারেননি, যে এই বয়সে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের মতো অসুখে আক্রান্ত হতে পারে সে। রাসেল ছিল সুঠাম দেহের অধিকারী। স্বাস্থ্য সচেতন একজন মানুষ, যে প্রতি দিন সকালে হাঁটতো এবং ব্যাডমিন্টন খেলতো। এই রকম একজন মানুষকে এতো অল্প বয়সে এমন একটি অসুখে আক্রান্ত হতে দেখে আমরা অনেকেই বিশ্বাস করতে পারিনি।

রাসেল সরাসরি আমার ছাত্র ছিল না। কিন্তু আমার বড় ভাই গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক হওয়ায় রাসেলের সাথে আমার সখ্যতা ছিল তার ছাত্র অবস্থা থেকে। চোখের সামনে তাকে দেখেছি বিভাগের অর্নাস ও মাস্টার্স পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করতে। পরবর্তী সময়ে রাসেল ও তার স্ত্রী অর্থাৎ পনির চাকরি- সবই সেদিনের ঘটনা। রাসেল চাকরিতে যোগদানের পর আমার সাথে ঘনিষ্ঠতা বাড়তে থাকে। সময়ের আবর্তে সে হয়ে উঠে আমার ছোট ভাই।

রাসেলকে খুব পছন্দ করতাম। এর একটি অন্যতম কারণ ছিল তার মিষ্টভাষিতা ও সময়ানুবর্তিতা। সে সময়ের কাজ সময়ে করার জন্য সব সময় সচেষ্ট থাকতো। ব্যক্তিগত সম্পর্কের বাইরেও আমাদের একাডেমিক সম্পর্কটা খুবই শক্তিশালী ছিল। প্রায়ই সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করতাম। সব সময় তাকে উৎসাহ দিতাম নিজের গবেষণায় মনোনিবেশ করতে। বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করে অল্প সময়ের মধ্যেই পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করে সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি লাভ করেছিল সে।

সুস্থ রাসেলের সাথে আমার সর্বশেষ দেখা কলকাতায়, গত বছরের ১০ বা ১১ সেপ্টেম্বর। আমি ব্যাঙ্গালুরু যাওয়ার জন্য কলকাতায় ছিলাম। রাসেল তার দুই সহকর্মীসহ (সাইফুল ও বাকী) যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি সেমিনারে যোগদানের জন্য কলকাতায় অবস্থান করছিল। উভয়ই জানতাম আমরা কলকাতায়। প্রথম রাতে যোগাযোগ করতে পারিনি। পরের দিন সকালে আমরা যখন নিউ মার্কেটের কাছে একটি হোটেলে নাস্তা করছি তখন রাসেল ও তার দুই সহকর্মী হোটেলের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। পরে এক সঙ্গে অনেকটা সময় আড্ডা দিলাম এবং চা খেলাম। আমি পরে ব্যাঙ্গালুরুতে চলে গেলাম আর রাসেলরা দেশে।

২০ সেপ্টম্বর রাজশাহী ফিরে আসি। পরের দিন রাসেল ব্রেন স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়। ওকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া থেকে শুরু করে রাতে হেলিকপ্টারে করে ঢাকায় পাঠানো পর্যন্ত রাসেলের সাথেই ছিলাম। প্রথম কয়েক দিন আমরা খুবই হতাশার মধ্যে ছিলাম; কারণ রাসেল ছিল ডিপ কোমায়। প্রথম থেকেই রাসেল বঙ্গবন্ধু বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ডা. কনক কান্তি বড়ুয়া স্যারের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন ছিল।ওনার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টায় ২৫ দিন পরে রাসেলের জ্ঞান ফেরে।
জ্ঞান ফিরলেও একের পর এক জটিলতা দেখা দেয় ওর শরীরে। সময়ের সাথে সাথে ওর অবস্থার কিছুটা উন্নতি হওয়া শুরু হয়েছিল। আমরাও আশা করতে শুরু করেছিলাম যে রাসেল সুস্থ হয়ে ফিরে আসবে আমাদের মাঝে। এর মধ্যে কয়েক বার রাসেলকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখেও এসেছি। হাসপাতালের বেডে ওকে চেনা যেতো না। সুঠাম দেহের অধিকারী তরকাজা এক যুবক শীর্ণকায় হয়ে গেছে। ওকে দেখে প্রথম দিন চিনতে বেশ কিছুটা সময় লেগেছিল। কিন্তু মনের মধ্যে একটি আশা ছিল যে রাসেল সুস্থ হয়ে ফিরে আসবে মতিহার চত্বরে।

এই অবস্থা চলাকালীন রাসেলের শ্বাসনালীতে একটি জটিল সমস্যা দেখা দেয়, যেটির চিকিৎসা বাংলাদেশে সম্ভব হচ্ছিল না বিধায় তাকে চেন্নাইতে নিয়ে যাওয়া হয়। চেন্নাই থেকে ফিরে ঢাকায় অপারেশনের মাধ্যমে খুলে রাখা স্কালের অংশটি পুনরায় প্রতিস্থাপন করা হয় রাসেলে মাথায়। ফলে আমরা সবাই আশান্বিত হতে থাকি। এর মধ্যে দেশে করোনার প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। যদিও রাসেলের গলায় প্রতিস্থাপিত ট্রাকোসটমি খোলার প্রয়োজন ছিল, কিন্তু করোনার কারণে ডাক্তাররা তাকে ক্লিনিকে রাখা নিরাপদ মনে করেননি। তাই তাকে ঢাকায় তার বোনের বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। এখানে বলে রাখা ভালো যে, ভারত ও বাংলাদেশের ডাক্তারদের পরামর্শ ছিল তাকে যেন পারিবারিক আবহে রাখা হয় এবং তার সাথে বেশি বেশি কথা বলা হয়। ফলে বোনের বাসায় ভালোই ছিল। কিন্তু, ট্রাকোসটমিই ওর জন্য কাল হলো। রাতে সেটি খুলে যাওয়ার পর প্রচণ্ড কাঁশি ও শ্বাসকষ্ট শুরু হয় তার।

বোনের ছেলে সম্রাটসহ আত্মীয় স্বজন রাত ৩টা থেকে বিভিন্ন নামি বেসরকারি হাসপাতালে তাকে নিয়ে ঘুরে রেড়িয়েছেন। কিন্তু কোন নামি হাসপাতাল তাকে ভর্তি নেয়নি। রাসেল কিন্তু করোনা রোগী ছিল না। আমরা আবার আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার নগ্ন দশা প্রত্যক্ষ করলাম। সর্বশেষ তারা যখন রাসেলকে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি করায় তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। রাসেলের ভাগ্নের সাথে কথা বলে জেনেছি- ট্রাকোসটমির নলটি সঠিকভাবে প্রতিস্থাপন করে একটু অক্সিজেন দিলে হয়তো রাসেল আবার স্বাভাবিক হয়ে যেতো। রাসেল অসুস্থ হওয়ার পর আমরা বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যসহ অন্যান্য ডাক্তারদের আন্তরিকতার উদাহরণ দেখেছি। আবার শেষ বেলায় বেসরকারি হাসপাতালে রোগী ভর্তিতে অনীহার কারণে রাসেলের মতো উদীয়মান একজন একাডেমিশিয়ানকে আমরা হারালাম। যদিও একথা শতভাগ নিশ্চিত করে বলা যায় না যে, রাসেল সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে আমাদের মধ্যে ফিরে আসত। তবে তার প্রয়াণটা ত্বরান্বিত হলো দেশের কয়েকটি নামকরা হাসপাতালে তাকে ভর্তি না করার কারণে।

রাসেলকে হারিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সদস্যরা অত্যন্ত বিমর্ষ ও ব্যথিত। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস হলো করোনার কারণে সদা হাস্যোজ্জ্বল রাসেলকে আমরা কেউ শেষবারের জন্য দেখতে পেলাম না। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এমন ব্যক্তি খুঁজে পাওয়া খুবই কঠিন যিনি বলবেন রাসেল তার সাথে কোনো দিন খারাপ অচরণ করেছে। ওর মুখে সব সময় হাঁসি লেগে থাকতো। কিন্তু করোনার সামাজিক দূরত্ব রক্ষার কারণে শেষ বেলাতেও রাসেল আমাদের থেকে অনেক দূরেই রয়ে গেল।

রাসেলের মতো একজন শিক্ষকের এই বয়সে হারিয়ে যাওয়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় তথা দেশের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। আজকে সারাদিন ফেসবুকে রাসেলের ছাত্র-ছাত্রী ও সহকর্মীদের ওর প্রতি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ দেখে আবার উপলব্ধি করলাম ও কতটা প্রিয় ছিল সবার কাছে। রাসেলকে হারিয়ে আমি শুধু একজন সহকর্মীকে হারালাম না বরং আমার ছোট ভাইকে হারালাম।

এই মুহূর্তে সবচেয়ে খারাপ লাগছে রাসেলের ৮ বছরের মেয়ে প্রজাপতির জন্য। সে হয়তো মৃত্যুর প্রকৃত অর্থ বুঝতে শেখেনি। সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করি রাসেল যেন স্বর্গবাসী হয় এবং তার পরিবারকে এই শোক কাটিয়ে ওঠার শক্তি দেন। জীবিত রাসেল আমাদের কাছে আর কোনো দিন ফিরবে না। কিন্তু রাসেলের হাসি মাখা মুখ সারা জীবন আমার চোখের সামনে ভাসবে।

লেখক: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের শিক্ষক

আরও পড়ুন

×