ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২৬

করোনাকালে পশ্চিমবঙ্গে বিভাজনের রাজনীতি

করোনাকালে পশ্চিমবঙ্গে বিভাজনের রাজনীতি
×

গৌতম রায়

গৌতম রায়

প্রকাশ: ০৯ মে ২০২০ | ০১:২৬ | আপডেট: ০৯ মে ২০২০ | ০৩:০১

করোনাজনিত ভয়াবহ সংকট, লকডাউনের ফলে সৃষ্ট আর্থ- সামাজিক সংকট, এইসব কিছুকে ছাপিয়ে ভারতে, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে গোটা পরিবেশকে সামাজিক বিভাজনের একটা কৌশল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার প্রবণতা ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। এই প্রবণতার প্রভাবে ভারতে যেমন রাজনৈতিক হিন্দুদের লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল হচ্ছে, তেমনই বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ প্রবাহমানতাকে বিপন্ন করার, বিঘ্ন ঘটানোর একটা কৌশল এবং ষড়যন্ত্র ধীরে ধীরে প্রবল হয়ে উঠছে।

ভারতের রাজনৈতিক হিন্দু এবং তাদের সহযোগী প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িক শক্তি করোনাজনিত সংকটকে প্রথম থেকেই নিজেদের স্বার্থে ব্যবহারে খুব বেশি রকম সক্রিয়। তাদের এই সক্রিয়তারই একটি অঙ্গ হল, বাংলাদেশে যে গণতান্ত্রিক পরিবেশ রয়েছে, ধর্মনিরপেক্ষ আবহাওয়া প্রবাহিত হচ্ছে, সম্প্রীতির একটি শক্তিশালী বুনিয়াদ প্রবাহমান বাংলাকেই প্রতীয়মান করছে, এই সবকিছুকে বিনষ্ট করা। কারণ, রাজনৈতিক হিন্দু বা রাজনৈতিক ইসলাম- এদের কারো কাছেই সম্প্রীতি, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা- এসব কোনো অবস্থাতেই কাম্য নয়। সমাজবিকাশে এই তিনটি পর্যায় শক্তিশালী হলে কোনো ধর্মেরই মৌলবাদী, সাম্প্রদায়িক শক্তি তাদের কায়েমী স্বার্থকে এগিয়ে নিতে পারে না। তাই করোনাকে কেন্দ্র করে ভারতের সাম্প্রদায়িক শক্তি ও তাদের সহযোগীরা নিজের দেশ এবং প্রতিবেশী বাংলাদেশে সামাজিক বিভাজনকে আরো শক্তিশালী করতে আদাজল খেয়ে নেমে পড়েছে।

করোনার কারণে ভারতে লকডাউন শুরু হওয়ার সাথে সাথেই দিল্লিতে নিজামুদ্দিনে তাবলিগ জামাতের প্রার্থনা ঘিরে গোটা ভারতজুড়ে একটা ভয়ঙ্কর সাম্প্রদায়িক বিভাজন শুরু হয়ে গেল। আরএসএস-বিজেপি যেটা চেয়েছিল, সেটা অবিজেপি রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মী-সমর্থকেরা একেবারে স্বেচ্ছায় করে দিলেন। সব থেকে যন্ত্রণার বিষয় হল, পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থী রাজনীতি করেন, এমন মানুষজনেরাও কোনো তথ্য, যুক্তির ধারপাশ দিয়ে হাঁটলেন না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও নিশ্চুপ রইলেন। প্রচারটা এমনই হল যে, তাবলিগ জামাতে অংশ নেওয়া মানুষদের জন্যই করোনা ভারতে তথা পশ্চিমবঙ্গে মহামারির আকার নিয়েছে। তাবলিগে অংশ নেওয়া সব মানুষই যেহেতু জন্ম পরিচয়ে মুসলমান, তাই করোনা-মহামারি আর মুসলমান সমাজকে এক বন্ধনীভুক্ত করে ফেলা হল।

নিজেদের বামপন্থী বলে পরিচয় দেওয়া ভূমিস্তরে কাজ করা থেকে শুরু করে বামপন্থী দলগুলোর সদর দপ্তরের সর্বক্ষণের কর্মী, সকলেই নিজ নিজ এলাকায় তাবলিগ জামাতে অংশ নেওয়া যতো 'মুসলমান' আবিষ্কার করে ফেললেন, ততো তাবলিগের সমর্থক, ভক্ত , শিষ্য ও বুঝি গোটা বিশ্বে নেই। এই সাম্প্রদায়িক অভিষ্পার বিরুদ্ধে প্রথম সারির বামপন্থীরা তাৎক্ষণিক কোনো কথাও বললেন না। একমাত্র সরব হলেন মো. সেলিম। বিষয়টা কি তাহলে এমনই যে, মুসলমান সমাজের ভালোমন্দ নিয়ে, তাদের বিরুদ্ধে সংগঠিত চক্রান্ত ঘিরে বলার দায় এমন বামপন্থীদেরই, যারা জন্মসূত্রে মুসলমান? সেলিম প্রকাশ্যে সরব হওয়ার পর বিবৃতি দিলেন সীতারাম ইয়েচুরি। কেন এমন ঘটবে?

নিজামুদ্দিনে যেহেতু বাংলাদেশেরও বেশ কিছু মানুষ এসেছিলেন, তাই ভারতে লকডাউন শুরু হওয়ার কয়েকদিন আগের সেই প্রার্থনা সভা ঘিরে পশ্চিমবঙ্গে নীরবে চলল বাংলাদেশ বিদূষণ। একটিবারও কেউ প্রশ্ন তুললেন না, কেন এই লকডাউন ঘোষণাতে কেন্দ্রীয় সরকার অহেতুক দেরি করলেন? ভারত সরকারের কাছে কি দেশের মানুষের প্রাণের চেয়ে অনেক বেশি জরুরি ছিল মধ্যপ্রদেশে বিজেপির সরকার তৈরি? নিজামুদ্দিন ঘিরে সঙ্ঘ- বিজেপির স্বার্থবাহী মুসলমান বিদ্বেষ আর সেই বিদ্বেষে বাংলাদেশকে জড়িয়ে দেওয়া ঘিরে কেন একটি শব্দ উচ্চারণ করলেন না মমতা? প্রতিবাদ করলে, মুখ খুললে কি তার 'প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতা' বিঘ্নিত হতো?

রাজধর্ম পালনের থেকে বিভাজনের রাজনীতি এবং প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতা- এই দুটিই হল মমতার কাছে সব থেকে গ্রহণযোগ্য কৌশল। মমতা তার শাসনকালের প্রায় দশ বছরে মুসলমান সম্প্রদায়ের উন্নতির নাম করে এমন কিছু ছেলেভোলানো পথ দিয়ে হেঁটেছেন, যাতে মুসলমান সম্প্রদায়ের উন্নতির বদলে, তাদের দুরবস্থা আরো তীব্র হয়েছে। মুসলমান সমাজের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে আজ পর্যন্ত মমতা একটি পদক্ষেপও নেননি। ধর্মীয় আবরণের ভিতরে মমতা মুসলমান সমাজকে আবদ্ধ রেখে একদিকে রাজনৈতিক হিন্দুদের মুসলমান বিদ্বেষকে প্রচারের আলোতে আনতে সাহায্য করেছেন। অপরদিকে একটা বড় অংশের বামপন্থীদের বামন মনষ্কতা থেকে অনেক দূরে ঠেলে দিয়ে তাদের 'রাজনৈতিক হিন্দু' মানসিকতার অনেকখানি কাছাকাছি নিয়ে আসতেও সাহায্য করেছেন।

তিস্তার পানির ন্যায্য ভাগ থেকে বাংলাদেশকে বঞ্চিত করার প্রধান ষড়যন্ত্রী হলেন মমতা। অথচ মমতার এই আন্তর্জাতিক রীতি লঙ্ঘনকারী ভূমিকা ঘিরে এপারের বাঙালির ভেতরে কোনো তাপ-উত্তাপ নেই। এমনটা তো নয়ের দশকে গঙ্গার পানি বণ্টন ঘিরে ছিল না। গঙ্গার পানির ন্যায্য হিসসা বাংলাদেশকে দেওয়ার প্রশ্নে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর যে ঐতিহাসিক ভূমিকা তা ঘিরে তো পশ্চিমবঙ্গের মানুষ কোনো নেতিবাচক ভূমিকা দেখাননি। 

এই পরিস্থিতি আজ বিনষ্ট হয়ে যেতে বসেছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাংলাদেশের মানুষদের ভাতে মারা, পানিতে মারার মানসিকতার ভেতর দিয়ে। ভারত সরকারের পরিচালক আরএসএসের রাজনৈতিক শক্তি বিজেপি তাদের মুসলমান বিদ্বেষী মানসিকতার যে প্রয়োগ আন্তর্জাতিক শিষ্টাচারের খাতিরে বাংলাদেশের প্রতি করতে পারে না, তাদের হয়ে সেই কাজটাই করে দেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দুর্ভাগ্যের বিষয়, যে বামপন্থীরা স্বাধীন বাংলাদেশকে সার্বিক স্বীকৃতির জন্য প্রথম তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কাছে দাবি জানিয়েছিলেন, সেই বামপন্থীরা আজ মমতার এই ভয়ঙ্কর অমানবিক প্রবণতা সম্পর্কে নিশ্চুপ।


লেখক: ইতিহাস গবেষক

আরও পড়ুন

×