ঢাকা শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬

কাজলের হাতে হাতকড়া কেন?

কাজলের হাতে হাতকড়া কেন?
×

সাইফুর রহমান তপন

প্রকাশ: ১৯ মে ২০২০ | ১০:১৫ | আপডেট: ১৯ মে ২০২০ | ১৩:৪৭

আমরা জেনেছিলাম, দৈনিক পক্ষকাল সম্পাদক শফিকুল ইসলাম কাজল গত ১০ মার্চ 'নিখোঁজ' হয়ে গিয়েছিলেন। তাকে সর্বশেষ দেখা গিয়েছিল ওই দিন সন্ধ্যা সাতটার কিছু আগে রাজধানীর হাতিরপুলে। সেখানকার মেহের টাওয়ারে তার পত্রিকার অফিস। অফিস থেকে নেমে তখন মোটর সাইকেলে উঠছিলেন। এর পর থেকেই নিখোঁজ, মোবাইল ফোন বন্ধ। পরিবার তার সাথে কোনো যোগাযোগ স্থাপন করতে পারছিল না।

পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে চকবাজার থানার (তার বাসা ওই এলাকায়) পুলিশও 'চেষ্টা করে' তার কোনো খোঁজ পাচ্ছিল না। কিন্তু অপহরণের ৫৩ দিন পর আমাদেরকে যশোরের বেনাপোল থানার পক্ষ থেকে জানানো হল, কাজলকে ভারত থেকে নিজ দেশে 'অনুপ্রবেশের' দায়ে গ্রেফতার করা হয়েছে। একজন ব্যক্তি দুই দেশের সীমান্ত রক্ষীদের ফাঁকি দিয়ে কীভাবে ভারতে গেলেন? আবার সেখান থেকে দেশেও ফিরে এলেন?

বাংলা ট্রিবিউনের একই রিপোর্টে লেখা হয়েছে, নিখোঁজের ঠিক ৩০তম দিনে (৯ এপ্রিল) কাজলের ফোন নম্বরটি বেনাপোলেই চালু হয়েছিল। চকবাজার থানার যে এসআই কাজলের কেসটির তদন্ত কর্মকর্তা তাকে উদ্ধৃত করে পত্রিকাটি আরও লিখেছে, 'নিখোঁজ সাংবাদিক কাজলের ফোন নম্বরটি চালু হয়েছিল। লোকেশন দেখিয়েছে বেনাপোল। তবে করোনা পরিস্থিতির কারণে এবং নম্বরটি চালু থাকার সময় কম হওয়ায় বেনাপোলে কোনও অভিযান চালানো সম্ভব হয়নি।'

এ বক্তব্য থেকে এটা স্পষ্ট যে, কাজল ২ মে নয়, এর অন্তত ২৩ দিন আগে থেকেই বেনাপোলে ছিলেন। পুলিশ একটু তৎপর হলেই তাকে উদ্ধার করা যেত। তাদের তৎপর না হওয়ার জন্য করোনাকে দায়ী করা হচ্ছে বটে, কিন্তু করোনা তো ৩ মে'ও ছিল। তখন তো কাজলকে গ্রেফতারে সমস্যা হয়নি! এমনকি করোনা সতর্কতা উপেক্ষা কওে তার গা স্পর্শের মাধ্যমে তাকে হাতকড়া পরাতেও পুলিশের কোনো দ্বিধা হয়নি!

কাজলকে হাতকড়া পরানো হলো কেন? তিনি কি কোনো দাগী আসামী? আর নিজ দেশে কোনো নাগরিক অবৈধ অনুপ্রবেশ করে কীভাবে? কোন আইন অনুসারে তাঁকে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী আখ্যা দিয়ে গ্রেফতার করা হলো এবং হাতকড়া পরিয়ে আদালতে তোলা হলো, আমাদেও জানা নেই। তবে আইনটি যদি ১৯৫২ সালের কন্ট্রোল অব এন্ট্রি এক্ট হয়- সাধারণত এ আইনেই এদেশে অনুপ্রবেশকারীর বিচার হয়ে থাকে- তাহলে বলতে হয়, এ আইন অনুযায়ী কাজলের বিরুদ্ধে কোনো মামলাই হয় না; কারণ তিনি বাংলাদেশের নাগরিক, আর আইনটিতে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী বলতে এমন অপরাধে জড়িত কোনো 'ভারতীয়'কে বোঝানো হয়েছে। এ আইনের সাজাও তেমন কিছু না, সর্বোচ্চ মাত্র এক হাজার টাকা জরিমানা বা এক বছরের জেল অথবা উভয় দণ্ড।

ওই মামলায় স্থানীয় আদালত থেকে জামিন পাওয়ার পর টানা ৫৩ দিন অপহরণকারীদের ডেরায় থেকে শারিরীক ও মানসিকভাবে বিধ্বস্ত কাজলকে পুলিশ ছেড়ে দেয়নি, বরং ৫৪ ধারায় গ্রেফতার দেখিয়ে জেলে পাঠিয়েছে। একই সাথে ১৪ দিন কোয়ারেন্টাইন মানার কথা বলে আদালতে প্রতিকার চাওয়ার অধিকার থেকে তারা তাকে বঞ্চিত করেছে। সবাই জানেন, করোনা সংক্রমণ ঠেকানোর লক্ষ্যে সরকার নিয়ম করেছে, কেউ ভারত বা অন্য দেশ থেকে দেশে আসলে তাকে বাধ্যতামূলকভাবে ১৪ দিন প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হয়। অবশ্য বলা হচ্ছে, কাজলের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ঢাকায় দায়েরকৃত দুটি মামলা আছে। সেগুলোতে তাকে যেন গ্রেপ্তার করা যায় সেজন্যই তাকে যশোরে আটকে রাখা হয়েছে।

এটা ঠিক, ফেসবুকে 'ভুল, আক্রমণাত্মক ও অবমাননাকর' বক্তব্য প্রচারের অভিযোগে কাজলের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে দুটো মামলা হয়েছে। এবং এ পরিপ্রেক্ষিতে কাজলের পরিবারের পক্ষ থেকে সরকারের প্রতি আহ্বানও রাখা হয়েছিল যে, কাজল যদি কোনো অপরাধ কওে থাকেন তাহলে তাকে যেন আদালতে সোপর্দ করা হয়; অর্থাৎ একটা আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাতে কাজলের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের সুরাহা করা হয়। কিন্তু তাদের ওই আহ্বান অন্তত গত ৫৩ দিন এক প্রকার অরণ্যে রোদনই রয়ে গেছে।

যা হোক, আমরা এখন আশা করতে পারি যে, একজন সাংবাদিককে নিয়ে, এ দেশের বিগত কয়েক দশকের স্বৈরাচার-সাম্প্রদায়িকতা-সন্ত্রাসবিরোধী সংগ্রামে যার অবদান অনেকের চেয়ে কম নয়, ইঁদুর-বেড়াল খেলা যথেষ্ট হয়েছে। আইনি প্রক্রিয়ায় হলেও অবিলম্বে তাকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া উচিত, নিশ্চিত করা দরকার তার স্বাভাবিক জীবন যাপনের অধিকার।

একই সাথে এটাও বলা দরকার যে, অপপ্রচারের শিকার যে কোনো নাগরিকের যেমন আইনি প্রতিকার পাওয়ার অধিকার আছে, তেমনি আদালতের মাধ্যমে যে কোনো অভিযুক্ত ব্যক্তির নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের সুযোগ পাওয়ারও অধিকার আছে। আর উভয় পক্ষের এ অধিকার নিশ্চিত করাই একটা গণতান্ত্রিক সরকারের দায়িত্ব। কথাটা এ কারণে বলা হল যে, মামলার স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় কাজলকে গ্রেফতার করা যেত, বিচারের মুখোমুখি করা যেত। কিন্তু তা না করে মামলা হওয়ার কয়েক ঘন্টার মধ্যেই তিনি অপহৃত হলেন।

রাষ্ট্রের পরিচালক হিসেবে সরকারের মনে রাখা উচিত, এভাবে একদিকে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটা সভ্য রাষ্ট্র গড়ার কাজ ব্যাহত হয়, আরেকদিকে নিয়ম-শৃঙ্খলাপন্থি মানুষদের ওপর বর্বরদের আধিপত্য করার সুযোগ তৈরি হয়, পরিণামে রাষ্ট্র নিজেই দুর্বল হয়। লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত একটা রাষ্ট্রের, তাও যখন ওই মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দলটিই তা পরিচালনা করছে, ভবিতব্য এমনটা হতে পারে না।

লেখক: সাংবাদিক, সাবেক ছাত্রনেতা



আরও পড়ুন

×