ঢাকা শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬

মারুফাও কি প্রতীকী চরিত্র?

মারুফাও কি প্রতীকী চরিত্র?
×

মুহম্মদ মোফাজ্জল

প্রকাশ: ২৬ মে ২০২০ | ১৪:২৯ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর -০০০১ | ০০:০০

নেত্রকোনা জেলার বারহাট্টা উপজেলার একটি ইউনিয়ন চেয়ারম্যানের গৃহকর্মী ছিল ১৪ বছরের মারুফা আক্তার। গত ৯ মে পার্শ্ববর্তী মোহনগঞ্জ উপজেলা সদরে চেয়ারম্যানের বাসাবাড়িতে মেয়েটিকে ফাঁসিতে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখার পর তাকে নিকটস্থ হাসপাতালে নিলে ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনার পর কিছু সংবাদমাধ্যমে দেয়া বক্তব্যে মারুফার মা অভিযোগ করেন- তিনি মেয়ের শরীরে আঘাতের ‘সুস্পষ্ট’ চিহ্ন দেখতে পেয়েছেন এবং এটি ছিল ‘হত্যাকাণ্ড’। তিনি গণমাধ্যমকে আরো জানান যে, মেয়ের ঘটনায় থানায় মামলা দায়ের করতে গিয়ে ঘটনা ভিন্ন দিকে ঘুরাতে কথিত প্রচেষ্টার মুখোমুখি হয়েছেন। 

যাহোক, শেষ পর্যন্ত অভিযুক্ত চেয়ারম্যান গ্রেফতার হন। ১৩ মে দৈনিক সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়- ‘নেত্রকোনার মোহনগঞ্জে গৃহর্কমী মারুফা আক্তারকে (১৪) হত্যার অভিযোগে বারহাট্টা উপজলোর সিংধা ইউপি চয়োরম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগরে সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক শাহ মাহবুব মোর্শেদ কাঞ্চনকে সোমবার রাতে গ্রপ্তোর করা হয়ছে। মঙ্গলবার তাকে আদালতে পাঠিয়েছে পুলিশ।’

প্রথমে এলাকার অল্প সংখ্যক মানুষ মারুফার অভিযুক্ত হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন। ধীরে ধীরে প্রতিবাদকারী ছাত্র-জনতার সাথে সাধারণ নারী-পুরুষের সংখ্যা বাড়তে থাকে। প্রথমে দু’তিনটি জায়গায় মানববন্ধন হয়। তারপর জেলার অন্যান্য উপজেলা সদর, গ্রাম্য বাজার এবং জেলা সদরে অভিযুক্ত হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের দাবিতে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এমনও দেখা গেছে একটি বাড়ির উঠোনে ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায় বিচারের দাবিতে এক গৃহবধু অল্প ক'জনকে নিয়ে ব্যানার হাতে দাঁড়িয়ে আছেন।

গ্রেফতারের পর অভিযুক্ত চেয়ারম্যানের জামিনপ্রাপ্তিতে অনেকে হতাশা ব্যক্ত করেছেন। মেয়েটিকে হত্যার অভিযোগ ঘিরে আলোচনা, সমালোচনা, নিন্দা, সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায় বিচারের দাবি এখন আর কংশের দুই অববাহিকা মোহনগঞ্জ ও বারহাট্টায় সীমাবদ্ধ নেই। গণমাধ্যম আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বদৌলতে সে আলোচনা দেশের গণ্ডিও অতিক্রম করেছে। যথাযথ তদন্ত সাপেক্ষে প্রকৃত অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে খোলা চিঠি লিখে প্রতিবাদকারীর কাতারে শামিল হয়েছেন কবি নির্মলেন্দু গুণ। তার বাড়িও অভিযুক্ত নির্মমতার শিকার মারুফার উপজেলায়। 

মারুফার ঘটনায় অভিযুক্ত শাহ্ মাহবুব মোর্শেদ কাঞ্চন বারহাট্টা উপজেলার সিংধা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান। আর ঘটনাটি ঘটেছে পার্শ্ববর্তী উপজেলা মোহনগঞ্জ সদরে তার বাসাবাড়িতে। মারুফা তার বাসায় গৃহকর্মীর কাজে নিযুক্ত হয়েছিল। দুই উপজেলাতেই চেয়ারম্যান পরিচিত। সে সুবাদে মারুফার ঘটনায় এলাকার সংক্ষুব্ধ মানুষজনের অধিকাংশই চেয়ারম্যানকে চেনেন। তিনি ইতোপূর্বে একাধিকবার ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হয়েছেন এবং ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতির সাথেও তার সম্পৃক্ততা আছে। তাই তিনি সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থানের কারণেও পরিচিত ব্যক্তি।

অন্য দিকে এটাও নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, নির্মমতার শিকার মারুফাকে নিরানব্বই শতাংশের বেশি লোকজন কখনো দেখেননি। তারপরও আর্থ-সামাজিক অবস্থার বিবেচনায় অন্তর্দৃষ্টিতে মারুফাও সকলের খুব চেনা। সেই চেনার মাঝে খুব একটা হেরফের হয় না। মারুফা ছোট্ট এক প্রাণ। প্রায়ই দেখা যায় ক্ষুধা আর প্রাণের দায়ে মারুফাদের জীবনচক্র একটি ফ্রেমে বন্দি। মারুফার বাবা এলাকার এক ফেরিঘাটে খুন হয়েছিলেন। সেই খুনের মামলা মারুফার মাকে টানতে হচ্ছে। তিনি নিজেও ঢাকায় গৃহকর্মীর কাজ করেন। সম্ভবত তার আরেকটি মেয়েও অন্যের বাড়িতে কাজ করে। দিনাতিপাতের জন্য মা-বাবা ইচ্ছায়, অনিচ্ছায় বা কখনো নিতান্ত বাধ্য হয়েই মারুফার মত মেয়েদের অন্যের বাড়িতে পাঠান। কোন কোন গৃহকর্তার বাড়িতে তারা মনে কষ্ট পেলে, গালমন্দের শিকার হলে, আঘাত পেলে, লালসা বা শারীরিক নির্যাতনের শিকার হলে ঠোঁট চেপে কষ্ট অবদমন করে। প্রায়ই তারা অসহায় নির্যাতন, ধর্ষণ, আত্মহনন বা আত্মহত্যার শিকার হয়ে সংবাদ শিরোনাম হয়। এমন শিরোনামও দেখা গেছে যে, এসব মেয়েরা সমাজে অনুসরণযোগ্য মানব-প্রদীপের নীচের অন্ধকারে নিগৃহীত হয়েছে। যিনি নারী অধিকার নিয়ে কাজ করেন কিংবা যে গানের শিল্পীর কণ্ঠে পাথরেও ফুল ফুটে তাদের বাড়িতেও এসব মেয়ের নিগৃহীত হওয়ার ঘটনা আমাদের সমাজে বিরল নয়।

আর্থিক অস্বচ্ছলতার কারণে গৃহকর্তার অনুগ্রহে বেঁচে থাকা মেয়েদের যেমন রাজধানীর সুউচ্চ ভবনের বেলকনিতে ঝুলতে দেখা গেছে তেমনি তাদেরকে মফস্বলের বড় বাড়িতেও নির্যাতিত হতে দেখা গেছে। দুর্ঘটনার কিছু দিন পর আলোচনা ও প্রতিবাদ স্থিমিত হয়ে যায় কিংবা গৃহকর্তারা সব কিছু ম্যানেজ করে নেন। সমাজ বাস্তবতা আর আর্থিক পরাধীনতায় এ যেন অস্বচ্ছল পরিবারের মেয়েদের এখনো এক অমোঘ নিয়তি। তারা নির্যাতিতার এক প্রতীকী চরিত্র। সেই অর্থে নেত্রকোনার মারুফাও কি এক প্রতীকী চরিত্র? এসব প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে মারুফার ময়নাতদন্তের বস্তুনিষ্ট রিপোর্ট এবং প্রশাসনের নিবিড় ও নির্মোহ তদন্তের ওপর। সেই তদন্তে অভিযুক্ত চেয়ারম্যানও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবেন না। প্রতিবেদনসমূহ পাওয়ার আগ পর্যন্ত চেয়ানম্যান আইনি পরিভাষায় ভাষায় অভিযুক্ত হিসেবেই বিবেচিত হবেন।

আপাতত অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে মারুফা ইস্যুতে এলাকার বর্তমান জনপ্রতিনিধিদের পাশপাশি যারা জনমনে ভবিষ্যৎ রাজনীতির বীজ বুনছেন তারাও একটি পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছেন। সেই পরীক্ষাটি কোন মাইনর বা সাবসিডিয়ারি কোর্সের নয়। পাশপাশি প্রশাসনের ওপর জনমনের আস্থা রক্ষার্থে এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সরকারকে সহযোগিতা প্রদানে অভিযুক্ত মারুফা ‘হত্যাকাণ্ডে’ সাধারণের দাবিকৃত নিরপেক্ষ ও নিবিড় তদন্তকে পাশ কাটানোর সুযোগ এখন আর নেই। মনে রাখতে হবে, মারুফাও মানুষ ছিল। তাকে এখন কথিত নির্যাতনের প্রতীকী চরিত্র মনে করলে সেটা হবে আরেকটি বড় ভুল। 

লেখক ও নির্মাতা


আরও পড়ুন

×