আরটিপিসিআর ও প্লাজমা থেরাপি
ড. রবিউল হাসান ভুঁইয়া
প্রকাশ: ০৩ জুন ২০২০ | ০৭:৫৩ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর -০০০১ | ০০:০০
প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসের বিস্তারে বিশ্ব বিপর্যস্ত। প্রতি মুহূর্তে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা বাড়ছে। টেস্টের মাধ্যমে শনাক্তকরন ও উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা দিলেও মৃত্যুর মিছিল কোন ভাবেই থামছেনা।
করোনা ভাইরাস শনাক্তের গোল্ড-স্ট্যান্ডার্ড টেস্ট পদ্ধতি আরটিপিসিআর শুরুর দিকে শুধুমাত্র রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউটে (আইইডিসিআর) ব্যবহৃত হতো। সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় আইইডিসিআরে নমুনা টেস্টের চাপ বাড়ে এবং দ্রুত নমুনা টেস্টের জন্য আরটিপিসিআর মেশিনের সংখ্যা বাড়ানোর জন্য দাবি উঠতে থাকে।
জাপানে গবেষণার সময় আরটিপিসিআর মেশিন বিষয়ে অভিজ্ঞতা ছিল। চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার বিভাগেও (বায়োকেমিস্ট্রি এন্ড মলিকুলার বায়োলজি) এই মেশিন রয়েছে। ব্যক্তিগত দায়িত্ববোধ ও সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষা মাথায় রেখে করোনা মোকাবেলায় সহযোগিতার উদ্দেশ্যে ২৫ মার্চ আমার ফেসবুক ওয়ালে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম। যার মর্মকথা হলো, আরটিটিসিআর মেশিনে ৩ ঘন্টায় ৯৬ জনের নমুনা টেষ্ট করা যায় এবং অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে এ মেশিন আছে। সরকার চাইলে এ দূর্যোগে মেশিনগুলো এবং সংশ্লিষ্ট রিসোর্সপার্সন বা গ্রাজুয়েটদের কাজে লাগাতে পারে। স্ট্যাটাসটি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের নজরে আসে।
কয়েকদিনের মধ্যে ফৌজদারহাটস্থ বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজেজ (বিআইটিআইডি) এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন থেকে এ বিষয়ে সহযোগিতার অনুরোধ আসে চবির উপাচার্য প্রফেসর ড. শিরীণ আখতার বরাবর। চবির উপাচার্যের তাৎক্ষনিক ও দূরদর্শী উদ্যোগে ৭ এপ্রিল বায়োকেমিস্ট্রি এন্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগের আরটিপিসিআর মেশিনটি বিআইটিআইডি-কে হস্তান্তর করা হয়। চবির প্রশংসনীয় উদ্যোগের পর আরও কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় কাজ শুরু করেছে এবং ইতিমধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ও করোনা টেস্ট উপযোগী ল্যাব করেছে।
সকল জেলায় এ মেশিন ও সংশ্লিষ্ট জনবল দিলে নমুনা জট বা টেস্ট বিড়ম্বনা অনেকাংশে কমবে। এ ক্রান্তিকালে সরকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের আরটিপিসিআর মেশিন ও সংশ্লিষ্ট গ্রাজুয়েটদেরকে যুক্ত করতে পারে। প্রয়োজনে গ্রাজুয়েটদের নিয়োগ দিতে পারে।

আরটিপিসিআর মেশিন বিষয়ক স্ট্যাটাসের পরদিন ২৬ মার্চ আরেকটি স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম যে, করোনা আক্রান্ত রোগীর জীবন বাঁচানোর শেষ চেষ্টা হিসেবে নিরাময়কারির ব্লাড-প্লাজমার (পরোক্ষ এন্টিবডি থেরাপি) প্রয়োগ চিকিৎসকগন যেন বিবেচনা করেন। থেরাপিটি হলো করোনায় আক্রান্ত থেকে নিরাময় হয়ে উঠা ব্যক্তির ব্লাড-প্লাজমা (ভাইরাস ও অন্যান্য ইনফেক্সাস স্কিনিংয়ের পর) আক্রান্ত রোগীর শরীরে প্রবেশ করালে রোগী নিরাময় হয়ে উঠতে পারে। কারণ পূর্বে নিরাময়কারি ব্যক্তির ব্লাড-প্লাজমায় এন্টি-কবিড-১৯ এন্টিবডি (প্রতিরোধ ক্ষমতা) উৎপন্ন হয়ে আছে, যা আক্রান্ত রোগীর নিরাময়ে দারুন ভুমিকা রাখবে।
প্লাজমা থেরাপি ১৮৯০ সালের পদ্ধতি। ১৯১৮ সালে এইচওয়ানএনওয়ান ইনফ্লুয়েন্জা ভাইরাস মহামারীতে ১৭০০ রোগীরকে ব্লাড-প্লাজমা প্রয়োগে ভাল ফল হলেও কোন উপসংহারে আসা যায়নি। ২০০২-০৩ সালে সার্স ছড়িয়ে পড়ার সময় ৮০ রোগীকে ব্লাড-প্লাজমার প্রয়োগে ভাল ফলাফল পেয়েছে হংকং। এছাড়া ইবোলার ক্ষেত্রেও এ পদ্ধতির কিছু সাফল্য পাওয়া গিয়েছে।
কোভিড চিকিৎসার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশে ২৭ এপ্রিল প্রথমবারের মতো ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক ডাঃ জোয়ারদার রাকিন মনজুরের রক্ত থেকে প্লাজমা সংগ্রহ শুরু হয়। ইতিমধ্যে প্লাজমা থেরাপি প্রয়োগে রোগীর শারীরিক উন্নতির লক্ষণসহ সাফল্য পাওয়ার দাবী করেছে বিভন্ন সরকাির-বেসরকারি হাসপাতাল। করোনা আক্রান্ত রোগীর ব্লাড-প্লাজমা পেতে সরকারের পক্ষ থেকে সচেতনতা ও প্রচারণা প্রয়োজন।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়