ঢাকা মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬

অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম দ্রুত বাস্তবায়নের রূপরেখা

অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম দ্রুত বাস্তবায়নের রূপরেখা
×

জাহিদুল করিম

প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২০ | ০৯:১৫ | আপডেট: ২৩ জুন ২০২০ | ১০:২৩

বিশ্বব্যাপী মহামারি করোনার কারণে সোশ্যাল ডিসটেন্স যেখানে সর্বাধিক অগ্রাধিকার পাচ্ছে, সেখানে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করা নিয়ে ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট সকল মহলে বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। কিন্তু অনেকের মনে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে আমাদের দেশের দূর্বল ইন্টারনেট সেবা, বিদ্যুৎ সমস্যা এবং অনলাইন শিক্ষা সহায়ক অনেক ধরণের শিক্ষা উপকরণের স্বল্পতা রয়েছে। আবার অনেক ছাত্র ছাত্রী দরিদ্র জনগোষ্ঠি থেকে এসেছে,  তারা কিভাবে এই অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমে অংশ নিবে। এই ক্ষেত্রে শিক্ষকদের চাইতে শিক্ষার্থীদের সীমাবদ্ধতা বেশি রয়েছে। একটি বিষয় দেখে ভালো লাগছে যে, এখন অনেকেই অনলাইন শিক্ষার গুরুত্ব বুঝতে পেরেছেন এবং সময়ের সাথে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে।   

প্রশ্ন হচ্ছে, কী করলে আমাদের শিক্ষার্থীরা অনলাইন ক্লাস করতে আগ্রহী হবে? সম্প্রতি আমি ১৫টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৪০০ শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের উপর একটি জরিপ চালিয়ে দেখেছি শতকরা প্রায় ৩০ ভাগ শিক্ষার্থীর কোন স্মার্টফোন, ল্যাপটপ, ডেস্কটপ অথবা অন্যকোনো ইলেকট্রনিক ডিভাইস নেই যার মাধ্যমে তারা অনলাইন ক্লাসে অংশ নিতে পারে। শতকরা প্রায় ৪০ ভাগ শিক্ষার্থীর সার্বক্ষনিক ভাবে ইন্টারনেটসেবা ব্যবহার করার সুযোগ নেই। তবে তাদের মধ্যে ১০ ভাগ শিক্ষার্থী মোবাইল ডাটা ব্যবহার করে দিনে ২-৫ ঘন্টা সীমিতভাবে ইন্টারনেট সেবা গ্রহণ করতে পারছে। অনেক শিক্ষার্থী বলছে আমাদের শুধু প্রয়োজন একটি কম্পিউটার বা স্মার্ট ফোন এবং ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ। এই দুটি সুবিধা পেলে শতকরা ৯৫ ভাগ শিক্ষার্থী অনলাইন ক্লাসে অংশ নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।  তাহলে কিভাবে আমরা এই দুটি সেবা তাদের পৌছে দিতে পারি। সমাধান দুই ভাবে হতে পারে।  

প্রথমটি হলো, শিক্ষার্থীদের আমরা বিভাগীয় শিক্ষার্থী কল্যাণ তহবিলের অর্থ থেকে, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের যে বৃত্তি প্রদান করে থাকে এবং আবাসিক হল গুলো বন্ধ থাকায় যে অর্থ আমরা সঞ্চয় করেছি তা একত্র করে সকল শিক্ষার্থীকে অথবা শুধু দরিদ্র শিক্ষার্থীদের ৮,০০০ টাকার মধ্যে একটি স্মার্টফোন ক্রয়ের ব্যবস্থা করে দিতে পারি । আর ইন্টারনেট ব্যবহারের জন্য তাদের ইন্টারনেট মডেম ক্রয় অথবা ব্রডব্যান্ড সেবা নেয়ার জন্য আরো ২,০০০ টাকা সহ সর্বমোট ১০,০০০ টাকা প্রদান করতে পারলে এই সমস্যার সমাধান হতে পারে। মনে রাখতে হবে এই ১০,০০০ টাকা এককালীন বড় অর্থ মনে হতে পারে কিন্তু এই ইনভেস্টমেন্ট থেকে আমরা আগামী ২/৩ বছর যে উপকার পাবো তা আর্থিক মূল্যে এর চেয়ে কম হবে না।     

দ্বিতীয় উপায় হলো শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষাঋণ কার্যক্রম চালু করা। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের জন্য শিক্ষার্থীদের স্টাডি লোন দেয়া হয় কিন্তু আমাদের দেশে এইধরণের কোন সুযোগ এখনো শিক্ষার্থীদের জন্য তৈরী হয়নি।  এখনই এই ধরণের সুযোগ তৈরী করা দরকার।  সরকার ইতোমধ্যে বিভিন্ন খাতে আর্থিক প্রণোদনা ঘোষণা করেছে কিন্তু শিক্ষা খাতে এইধরণের প্রণোদনা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।  ২ থেকে ৩ শতাংশ সুদে যদি দরিদ্র শিক্ষার্থীদের ১০,০০০ থেকে ৫০,০০০ টাকা পর্যন্ত ৪/৫ বছর মেয়াদে স্টাডি লোন দেয়া যায় তাহলে এই সমস্যার অনেক সহজেই সমাধান হবে। উক্ত জরিপে দেখা গেছে শতকরা প্রায় ৭০% শিক্ষার্থী এই ধরণের শিক্ষাঋণ গ্রহণে ইচ্ছুক কারণ তাদের অনেকেই প্রাইভেট টিউটোরিং সেবা দিয়ে অথবা খন্ড কালীন চাকুরী করে শিক্ষাখরচ জোগাড় করছে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে এই সুযোগ গুলো বন্ধ হয়ে গেছে। কাজেই শিক্ষা ঋণ ছাড়া তাদের পক্ষে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমে অংশ নেয়া অনেকটা অসম্ভব।

এখন, শিক্ষকরা অনলাইন ক্লাস নিতে আগ্রহী হবেন? আমাদের দেশের শিক্ষকদের অনেক প্রতিভা রয়েছে তা আমরা দেশের বাহিরে গেলেই দেখতে পাই।  অনেক শিক্ষক গবেষণা, শিক্ষা ছাড়াও বিভিন্ন ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে দেশে ও  বিদেশে সম্মান অর্জন করছেন।  সুযোগের অভাবে আবার অনেকেই তাদের প্রতিভার বিকাশ ঘটাতে পারছেন না।  এমন বাস্তবতায় অনলাইন ক্লাস শুরু করতে আমাদের শিক্ষকদের যা যা প্রয়োজন তা প্রদানের ব্যবস্থা করা খুব বেশি কঠিন কাজ নয়। সাম্প্রতিক সময়ে আমার ১৫ টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭৫ জন শিক্ষকের উপর করা একটি জরিপে দেখা গেছে শতকরা ৮০ ভাগ শিক্ষক অনলাইন ক্লাস নেয়ার পক্ষে।  অধিকাংশ শিক্ষক যে বিষয়গুলোতে তাদের উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেছেন তা হলো কিভাবে ফাইনাল পরীক্ষা নেয়া হবে এবং পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন হবে।

অনলাইনে এক্সাম নিতে গেলে আমাদের প্রথমে লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম নামের ভার্চুয়াল প্লাটফর্ম তৈরি করতে হবে । যেমন ব্ল্যাকবোর্ড বা ক্যানভাস নামক ভার্চুয়াল প্লাটফর্মে ক্লাস নেয়া থেকে শুরু করে এসাইনমেন্ট, কুইজ, মিড্ টার্ম এবং সেমিস্টার ফাইনাল এক্সাম গ্রহণ করা যায়। এই জন্য আমাদের ওপেন বুক এক্সাম নেয়ার বিষয়টি গ্রহণ করতে হবে। উন্নত দেশগুলোতে ওপেন বুক এক্সাম খুব সাধারণ একটি বিষয় কারণ এই পদ্ধতিতে এক্সাম নিলে সময় নির্ধারণ করা থাকে ফলে কোন শিক্ষার্থী যদি স্টাডি না করে তাহলে তারপক্ষে নির্ধারিত সময়ে এক্সাম শেষ করা সম্ভব হয় না। আর এমন নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শিক্ষার্থীর পক্ষে কোন অসাধু উপায় অবলম্বন করা কিংবা অন্যদের সাথে কথা বলে এক্সাম দেয়া অত্যন্ত দুরূহ কাজ। যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশুনা করার সময় আমি দেখেছি যে, এক্সাম হলে বসে পরীক্ষা দেয়ার চাইতে অনলাইনে ওপেন বুক এক্সামগুলো আরো বেশি স্বচ্ছতার মধ্যে নেয়ার এবং দেয়ার সুযোগ হতো।  

অধিকাংশ এক্সামগুলো মাল্টিপল চয়েস, ছোট প্রশ্ন, বড় এসাইনমেন্ট, কেইস স্টাডিস এবং অনলাইনে ডিসকাশন এর মাধ্যমে মূল্যায়ন করা হতো।  তবে ঐ ধরনের প্লাটফর্মে ফাইনাল এক্সাম পরীক্ষার উত্তর মাইক্রোসফট অফিস ওয়ার্ড ফাইলে দিয়ে তা অনলাইনে আপলোড করার সিস্টেম এবং শিক্ষক কে মেইল করার ব্যবস্থা ছিল। সম্প্রতি বাংলাদেশের একটি স্বনামধন্য সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি যে, প্রতি ফ্যাকাল্টির জন্য একটি করে ক্যানভাস অথবা ব্ল্যাকবোর্ড এর মতো প্লাটফর্ম  তৈরী করতে মাত্র ৫ থেকে ১০ লক্ষ টাকা ব্যয় হয় । আর পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য এমন একটি প্লাটফর্ম তৈরী করতে ২০ লক্ষ টাকা খরচ হয়। তবে এতবড় প্লাটফর্ম তৈরী করতে অনেক জটিলতা রয়েছে এবং এটি তৈরিতে সময় বেশি লাগবে যেহেতু আমরা এই সিস্টেমে এখনো অভ্যস্থ হইনি। এছাড়া সফটওয়্যারটির সাপোর্ট এবং মেইনটেন্যান্স এর জন্য সেমিস্টারে প্রতি শিক্ষার্থীর পিছনে মাত্র ৫০ থেকে ৭০ টাকা খরচ হবে। কিন্তু এই প্লাটফর্মে শিক্ষার্থীরা কোর্সে ইনরোল করা থেকে শুরুকরে, অ্যাটেনডেন্স, পরীক্ষায় অংশগ্রহণসহ, এসাইনমেন্ট জমা এবং তাদের ফলাফল দেখার যাবতীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করতে পারে।  তবে এসকল সুবিধা পুরোপুরি তৈরী করতে ৩ থেকে ৬ মাস সময় প্রয়োজন হবে।  আর এইসময়ের মধ্যে আমরা চাইলে জুম্, স্কাইপে, গুগল ক্লাস রুম, গুগল ফর্ম এগুলো ব্যবহার করে সাময়িক ভাবে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে নিতে পারি। এইসকল সফটওয়্যারগুলো আমরা অনলাইনে ফ্রি পেতে পারি। 

ইতোমধ্যে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের কয়েকজন শিক্ষক জুম্ সফটওয়্যার পরীক্ষামূলক ভাবে ব্যবহার করে অনলাইনে কিছু ক্লাস নিয়েছেন এবং বলেছেন ৮০% থেকে ৯০% শিক্ষার্থী ভার্চুয়াল ক্লাসে উপস্থিত হয়েছেন।  এতে আমরা বুঝতে পারি অনলাইন ক্লাসে অধিকাংশ শিক্ষার্থীর আগ্রহ রয়েছে। 

উল্লেখ্য যে, গুগল ফর্ম ব্যবহার করে আমরা সকল ধরণের এক্সাম নিতে পারি।  তবে ওই ক্ষেত্রে আমাদের ওপেন বুক এক্সাম অনুমোদন দিতে হবে। আর শিক্ষার্থীরা যেন অন্যের উত্তর অথবা ইন্টারনেট থেকে কপি পেস্ট না করে ঐজন্য একটি প্লেজারিজম সফটওয়্যার থাকতে হবে যেন শিক্ষকরা ঐটা দিয়ে শিক্ষার্থীদের উত্তরগুলো চেক করে দেখতে পারে। আর অবশ্যই এইক্ষেত্রে সিঙ্গেল এক্সামিনার প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।  

এই ধরণের প্লাটফর্মগুলো আমরা এখন করোনাকালীন সময়ে অথবা এমন দুর্যোগ ভবিষ্যতে আসলে যেন সম্পূর্ণরূপে ব্যবহার করতে পারি তার প্রস্তুতি এখন থেকে নিতে হবে।  পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও আমরা যেন এগুলো পুরোপুরি বন্ধকরে না দেই।  প্রতিটি বিভাগে কমপক্ষে ৪/৫ টি কোর্স অনলাইনে নেয়ার প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকতে পারে যেন পরবর্তীতে এমন দুর্যোগে আমরা আবার তা পুরোপুরি ব্যবহার করতে পারি।  

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক এবং সভাপতি, ম্যানেজমেন্ট স্টাডিস বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×