জাসদের দৃষ্টিতে জাতীয় বাজেটের আদর্শিক ভিত্তি
ফাইল ছবি
জিয়াউল হক মুক্তা
প্রকাশ: ২৬ জুন ২০২০ | ০২:৫১ | আপডেট: ২৬ জুন ২০২০ | ০৬:২৮
জাতীয় সংসদে গত ১১ জুন বিকেলে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল এমপি ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করেছেন। কভিড-১৯ মহামারির পরিস্থিতিতে উত্থাপিত বাজেটের উপর সংসদে বর্তমানে সীমিত পরিসরে আলোচনা চলছে। আলোচনার ভিত্তিতে পরিমার্জিত বা কোনো পরিমার্জন ছাড়াই এ মাসের শেষে তা সংসদের অনুমোদন পাচ্ছে।
এ রচনায় বর্তমান ও ভবিষ্যতের সকল অর্থনৈতিক পরিকল্পনা-দলিল ও বছরভিত্তিক বাজেটের রাজনৈতিক-অর্থনীতি বিষয়ে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল, জাসদের দুটো বক্তব্য উপস্থাপন করা হচ্ছে: প্রথমত, দেশজ মালিকানার বিষয়ে; আর দ্বিতীয়ত, দেশজ মালিকানার সাংবিধানিক নির্দেশনা বিষয়ে।
বাংলাদেশের নাগরিক ও রাজনৈতিক সমাজের দীর্ঘদিনের দাবি অনুসারে মহাজোটের সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই দেশের রাজনৈতিক-অর্থনীতিতে এক বিশাল নীতিগত পরিবর্তন নিয়ে আসে। তাহলো- ১৯৭৫ সালে তথাকথিত দাতা দেশ ও সংগঠনগুলোর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত তথাকথিত ‘প্যারিস কনসোর্টিয়াম’ প্রক্রিয়া আর পরে এ প্রক্রিয়ার নাম পাল্টে সূচিত ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ফোরাম বা বিডিএফ’ প্রক্রিয়ার নীতি-আধিপত্য বাতিল করে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে দেশজ পরিকল্পনা প্রণয়ন ও তার বাস্তবায়ন শুরু করে। সরকার তথাকথিত ‘কাঠামোগত সমন্বয় কর্মসূচি’র ‘সুগারকোটেড’ নীতি-পরিকল্পনা দলিল ‘দারিদ্র্য বিমোচন কৌশলপত্র বা পিআরএসপি’ বাতিল করে; পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াকে পুর্নবহাল করে। এখন মাঝে মাঝে বিডিএফ-সভা অনুষ্ঠিত হলেও তার নিয়ন্ত্রণে থাকে বাংলাদেশ।
দেশের বাজেটগুলো এখন সরকারের ‘রূপকল্প ২০৪১’, দ্বিতীয় ‘প্রেক্ষিত পরিকল্পনা (২০২১-২০৪১)’ আর ‘টেকসই উন্নয়ন অভিষ্ট, লক্ষ্যমাত্রা ও সূচকসমূহ’-র আলোকে প্রণীত ‘অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (২০২০-২১ - ২০২৪-২৫)’-র অধীনে প্রণীত হচ্ছে। ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেট অষ্টম পঞ্চমবার্ষিক পরিকল্পনার অধীনে প্রণীত প্রথম বাজেট; যদিও এখনও পর্যন্ত দ্বিতীয় প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ও অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার কোন দলিল পরিকল্পনা বিভাগ বা পরিকল্পনা কমিশন বা পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় প্রকাশ করেনি।
এক্ষেত্রে জাসদ মনে করে যে মূল পরিকল্পনা দলিলগুলো সংসদে আলোচনা না করে ওগুলোর আলোকে প্রণীত শুধুমাত্র বছরভিত্তিক বাজেটগুলো সংসদে আলোচনা হলো সংসদকে উপেক্ষার নামান্তর। বছর বছর বাজেটগুলো যেমন সংসদে আলোচিত হয়- তেমনি ‘প্রেক্ষিত পরিকল্পনা’, ‘টেকসই উন্নয়ন অভিষ্ট, লক্ষ্যমাত্রা ও সূচকসমূহ’ এবং ‘পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা’ও সংসদের বিশেষ অধিবেশনে এবং সংসদের বাইরেও আলোচনা করা উচিত। অতীতে এসব পরিকল্পনা দলিলগুলো উন্নয়ন-সহযোগী প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় কনসালট্যান্ট ও আমলাতন্ত্রের নেতৃত্বে প্রণীত হলেও অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়নে উন্নয়ন-সহযোগীদের সহায়তার প্রয়োজন নেই বলে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাগণ জানিয়েছিলেন। তবে, উন্নয়ন-সহযোগীদের সহায়তা না নিলেও এ বছরের জানুয়ারিতে ঢাকায় অনুষ্ঠিত বিডিএফ-এর সভায় পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের পক্ষে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার সারসংক্ষেপ উপস্থাপন করা হয়। উন্নয়ন-সহযোগীদের সাথে যদি পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করা যায়, তাহলে সংসদ ও জনগণের সাথে কেন নয়?
সম্প্রতি পরিকল্পনা দলিলগুলোর কিছু কিছু বাংলা ভাষায় পাওয়া গেলেও, অতীতে সেগুলো কনসালট্যান্ট ও আমলাদের নেতৃত্বে ইংরেজি ভাষায় রচিত হতো, ফলে সেগুলোতে আগ্রহ ও অভিগম্যতা ছিলো কম আর পরিণতিতে পরিকল্পনার অনুধাবন ও বাস্তবায়নে দেখা দিত সমস্যা। এখানে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার কৃষি খাতের ব্যর্থতা বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের নিজের একটি পর্যালোচনামূলক অভিজ্ঞতার উল্লেখ করা যেতে পারে যে— পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান একটি সমস্যা হলো পরিকল্পনা বিষয়ে আমলাতন্ত্র ও রাজনৈতিক কর্তৃত্বের অনুধাবনের ঘাটতি। পরিকল্পনাগুলো কাগজেই থেকে যাচ্ছিল।
সুতরাং, পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের দেশজ মালিকার যে প্রক্রিয়া বাংলাদেশ শুরু করেছে- যেগুলোর অধীনে বছর বছর বাজেট প্রণীত হয়- তা সফল করতে হলে এগুলোতে সার্বভৌম সংসদ ও জনগণের মতামত নিতে হবে, আর অবশ্যই তা মাতৃভাষায়।
এবারে আলোচনা করা যাক পরিকল্পনা দলিল ও বাজেটের রাজনৈতিক-অর্থনীতির দ্বিতীয় বিষয়টিতে— দেশজ মালিকানার সাংবিধানিক নির্দেশনা বিষয়ে। ১৯৭০ সালের ১২ আগস্ট ছাত্রলীগের সভায় স্বাধীন সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব পাস হয়। ১২ নভেম্বর বেতার-টেলিভিশনে বঙ্গবন্ধু তার নির্বাচনী ভাষণে ‘অন্যায়, অবিচার ও শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা’ গড়ে তোলার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। আর ১৯৭১-এর ৩ মার্চ বঙ্গবন্ধুর সম্মতি ও উপস্থিতিতে ‘স্বাধীন বাংলাদেশ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’-এর ‘স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের ঘোষণা ও কর্মসূচি’তে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করে যে ‘তিনটি লক্ষ্য অর্জন’ করার ঘোষণা দেয়া হয় তার দ্বিতীয়টিতে বলা হয়, ‘স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ গঠন করে অঞ্চলে অঞ্চলে ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে বৈষম্য নিরসন করে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি চালু করে কৃষক শ্রমিক রাজ কায়েম করতে হবে।’ মুক্তিযুদ্ধের পরও বঙ্গবন্ধু তার ১৯৭০-এর নির্বাচনী অঙ্গীকারের ধারাবাহিকতায় বারবার সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি কায়েমের কথা বলেছেন- যার সর্বোচ্চ প্রতিফলন দেখা গিয়েছে দেশের সংবিধানে চার মূলনীতির একটি হিসেবে ‘সমাজতন্ত্র’ ঘোষণার মাধ্যমে।
১৯৭৫ সাল থেকে একের পর এক সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশের সংবিধান থেকে নির্বাসিত হয় সমাজতন্ত্রের মূলনীতি। মহাজোট সরকার এ সংবিধানকে ১৯৭২-এর মূল চেতনায় ফিরিয়ে আনে। সমাজতন্ত্র এখন দেশের চার মূলনীতির একটি।
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, সরকারের পরিকল্পনা মন্ত্রী ও আরও অনেকে প্রকাশ্যে সমাজতন্ত্রের বিরোধিতা করেন এবং ‘ব্যবহারিক প্রয়োজনে আমরা একটি পুঁজিবাদী দেশ’— এরকম ঘোষণা দেন। জাসদ মনে করে সংবিধান রক্ষার শপথ করে ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করে দেশকে পুঁজিবাদী দেশ ঘোষণা করা ও পুঁজিবাদী অর্থনীতি অনুসরণের প্রকাশ্য ঘোষণা দেয়া এক ধরনের ডাবল-স্ট্যান্ডার্ড; সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক। এ ধরনের আচরণ থেকে সরকারের নীতি নির্ধারকদের বের হয়ে আসতে হবে।
পুঁজিবাদ হচ্ছে সামাজিক বঞ্চনার মাধ্যমে সম্পদের পুঞ্জিভবনের ব্যবস্থা; আর সমাজতন্ত্র হচ্ছে জনগণের অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তির এক ব্যবস্থা। খুব স্পষ্ট করে মনে রাখা দরকার যে ‘বাজার অর্থনীতি’ একটি কন্টিনাম বা বিস্তৃতি আর এ বিস্তৃতিতে রয়েছে অনেক পয়েন্ট বা অবস্থান- একদম বামের অবস্থানে রয়েছে গোড়া বা চিরায়ত সমাজতন্ত্র, মাঝামাঝি অবস্থানে রয়েছে মানবিক সমাজতন্ত্র বা কল্যাণ অর্থনীতি, আর সর্ব ডানে রয়েছে পুঁজিবাদ। সমাজতন্ত্র, কল্যাণ অর্থনীতি ও পুঁজিবাদ- এ সবই বাজার অর্থনীতি, কিন্তু প্রত্যেকটি আবার প্রত্যেকটি থেকে আলাদা।
গোড়া বা চিরায়ত সমাজতন্ত্রে রাষ্ট্র সম্পদের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে ও নাগরিকদের তা ব্যবহার করতে দেয়। বাংলাদেশের সংবিধান সম্পদের তিন ধরনের মালিকানার কথা বলে- ব্যক্তিগত, সমবায় ও রাষ্ট্রীয় মালিকানা। এর বাইরে বাংলাদেশে আরও এক ধরনের মালিকানা আছে- সম্প্রদায়গত মালিকানা- যার সাংবিধানিকে স্বীকৃতি প্রয়োজন। সুতরাং সম্পদের মালিকানা বিচারে বাংলাদেশের সংবিধান এক ধরনের মানবিক সমাজতন্ত্র বা কল্যাণ অর্থনীতির কথা বলে- যা বাজার অর্থনীতিকে স্বাধীনতা ও অন্তর্ভুক্তির জন্য একটি হাতিয়ার বা উপায় হিসেবে ব্যবহার করে। পুঁজিবাদ জনগণের অন্তর্ভুক্তিকে উপেক্ষা করে বাজারকে সীমাহীন স্বাধীনতা দেয়।
বাজারকে সীমাহীন স্বাধীনতা দেওয়ার পুঁজিবাদী মুক্তবাজার অর্থনীতি কৃষক-শ্রমিক-নারী-যুবক-ছাত্রদের স্বীকৃত ন্যায্য অধিকারগুলো অস্বীকার করে। বিশ্বব্যাপী পুঁজিবাদী মুক্তবাজার অর্থনীতি বৈষম্য-দারিদ্র্যের বৃদ্ধি ছাড়া আর কিছু দিতে পারছে না। তা পরিবেশ-প্রকৃতিকে ধ্বংস করছে। শীতল যুদ্ধের অবসানের পর শান্তি প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু মুক্তবাজার অর্থনীতির স্বর্গরাজ্য পশ্চিমা পুঁজিবাদী দেশগুলো তীব্র অর্থনৈতিক সংকটে নিমজ্জিত হয়ে একদিকে যুদ্ধ উন্মাদনা তৈরি, যুদ্ধ রপ্তানি ও যুদ্ধব্যবসা করে টিকে থাকার চেষ্টা করে আর অন্যদিকে অর্থনৈতিক উদার নীতিবাদ ও উৎপাদনে নতুন নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার করে টিকে থাকার চেষ্টা করে। নিকট ভবিষ্যতেও তারা সদ্য সূচিত চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সম্ভাব্য সুবিধাগুলোকে একচেটিয়াভাবে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে টিকে থাকার চেষ্টা করবে।
জাসদ মনে করে বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্য পুঁজিবাদী মুক্তবাজার অর্থনীতির ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না। নিত্যপণ্যের বাজার সিন্ডিকেটের হাতে জনগণ যেন বন্দী না হন, কৃষক যেন ফসলের লাভজনক মূল্য থেকে বঞ্চিত না হন, শ্রমিক যেন ন্যূনতম মজুরি থেকে বঞ্চিত না হন, উদ্যোক্তা যেন সহায়তা ও সংরক্ষণমূলক পদক্ষেপ থেকে বঞ্চিত না হন- সেজন্য পুঁজিবাদী মুক্তবাজার অর্থনীতির ভুল ও ব্যর্থ ধারণা থেকে বের হয়ে বাংলাদেশের সংবিধান নির্দেশিত সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যে সমুদয় পরিকল্পনা দলিল ও বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। সমাজের চাহিদাকে প্রাধান্য দিয়ে উদ্যোক্তা-উৎপাদকের ভূমিকা ও বাজার শক্তির সাথে রাষ্ট্রের ভূমিকার সমন্বয় সাধন করে অর্থনীতিকে ঢেলে সাজাতে হবে।
লেখক: জাসদ কেন্দ্রীয় কার্যকরী কমিটির প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক।