ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বাস্তব বাজেটে কাল্পনিক লক্ষ্যমাত্রা?

বাস্তব বাজেটে কাল্পনিক লক্ষ্যমাত্রা?
×

সাইফুল হোসেন

প্রকাশ: ২৮ জুন ২০২০ | ০৫:৩০ | আপডেট: ২৮ জুন ২০২০ | ০৬:০১

প্যাট্রিক জ্যাক ও' রৌরকে একজন অ্যামেরিকান সাংবাদিক, যিনি রাজনীতি নিয়ে বেশ কিছু বিদ্রূপাত্মক বই রচনা করেছেন। বাজেট নিয়ে তিনি খুব সুন্দর একটা কথা বলেছেন। তার কথাটি হল, 'সরকারের উপর বাজেটের খুব বেশি কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। আবার বাজেটের উপরও সরকারের নিয়ন্ত্রণ তেমন বেশি নয়'।

সম্প্রতি উত্থাপিত বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৮.২ শতাংশকে সামনে রেখে বাজেট সাজানো হয়েছে। বর্তমান বৈশ্বিক মহামারি ও মহামন্দার এই স্থবির সময়ে প্রতিবেশী দেশ ভারত, সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনামসহ বিভিন্ন দেশে বর্তমান বছরে ঋণাত্মক অথবা যৎসামান্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হবে বলে সেসব দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক, শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। আমাদের বাংলাদেশ ব্যাংকও ক'দিন আগে বর্তমান অর্থবছরে ৩ দশমিক ৮ ও আগামী অর্থবছরে ৫ দশমিক ৭ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলন করেছিল। হঠাৎ কোন তথ্যের ভিত্তিতে তা বেড়ে বর্তমান অর্থবছরে ৫ দশমিক ৫ ও আগামী অর্থবছরে ৮ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়াল, তা বোধগম্য নয়। আবার এই বাজেটের খরচ মেটাতে রাজস্ব আয়ের যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে সেটা সার্বিক বিবেচনায় কাল্পনিক স্বপ্নে অবগাহন করা ছাড়া আর কিছু নয়। তাই স্বাভাবতই প্রশ্ন আসে সরকার কি বাজেটের উপর নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে নাকি সরকারের উপর বাজেটের নিয়ন্ত্রণ থাকছে না? 

দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্বাভাবিক কবে হবে কেউ জানে না যেখানে এখন আমাদের দেশে প্রতিদিন পাল্লা দিয়ে বাড়ছে করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যুহার, কেউ বলতে পারেনা আমাদের সাথে যাদের বাণিজ্যিক সম্পর্ক আছে তাদের অবস্থা কবে স্বাভাবিক হবে তাহলে কিসের ভিত্তিতে, কোন যুক্তিকে আমলে নিয়ে এই প্রাক্কলন করা হল সেটা বোধগম্য নয় কিছুতেই। যদি কভিড ১৯ চলে যাওয়ার একটা ডেডলাইন জানা যেত, যদি পুরোদমে সচল হত অর্থনীতির চাকা তাহলে আমরা এই প্রবৃদ্ধির আশা করতে পারতাম হয়ত।

যাহোক, এবারের বাজেটে এনবিআর থেকে আয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। এনবিআরের কর বহির্ভূত রাজস্ব আয় ধরা হয়েছে ১৫ হাজার কোটি টাকা। অনান্য খাত থেকে আয় ধরা হয়েছে ৩৩ হাজার কোটি টাকা।

উল্লেখিত যে ২০২০-২১ অর্থবছরের ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি মোকাবিলায় অভ্যন্তরীণ খাত থেকে ঋণ নেওয়া হবে ১ লাখ ৯ হাজার ৯৮৩ কোটি টাকা। বৈদেশিক ঋণ নেওয়া হবে ৮০ হাজার ১৭ কোটি টাকা। অভ্যন্তরীণ উৎসের মধ্যে ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণ নেওয়া হবে ৮৪ হাজার ৯৮৩ কোটি। এছাড়াও সঞ্চয়পত্র ও ব্যাংক বর্হিভূত খাত থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকা আয়ের লক্ষ্য রয়েছে সরকারের।

অর্থমন্ত্রী বাজেট পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে বলেন, টাকা কোত্থেকে আসবে সে চিন্তা তিনি করেননি বরং মানুষকে বাঁচাতে চেয়েছেন। তবে করোনার এই অভিঘাতের মধ্যে এতবড় বাজেট প্রণয়ন যেমন একটি সাহসী পদক্ষেপ ঠিক তেমনই টাকা কোত্থেকে আসবে, রাজস্ব খাতের আয় কেমন হবে বা আদৌ যে লক্ষ্যমাত্রা ধারন করা হয়েছে তা আদায় হবে কিনা বর্তমান ক্ষয়িষ্ণু বাস্তবতায় সেটা না খেয়াল করাটা যুক্তিসম্মত নয় মোটেও। 

এনবিআর থেকে যে আয় সরকার ধরেছে ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। তা বর্তমান প্রেক্ষাপটে কার্যত অসম্ভব। কয়েকমাস ধরে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, পেশাজীবী ও শ্রমিক এবং প্রান্তিক চাষিদের কর্মহীন হয়ে পড়া, শিল্প ও সেবা খাতের অচলাবস্থা, আমদানি রপ্তানি বাণিজ্যে স্থবিরতা, দেশে-বিদেশে কর্মহীন মানুষের সংখ্যা ভীতিকরভাবে বেড়ে যাওয়া সরকারের আয়কে সংকুচিত করছে প্রতিনিয়ত। ব্যাংকিং খাতের আয়ও কমে যাচ্ছে উল্লেখযোগ্য হারে যা ঋণাত্মক প্রভাব ফেলবে রাজস্ব আয়ে, অর্থনীতিতে।  

রাজস্ব আদায়ের চিত্রে চোখ ফেরালে দেখি ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই থেকে জানুয়ারি), যখন কোভিডের কোন নামগন্ধও ছিলনা, রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি হয়েছে ৩৯ হাজার ৫৪২ কোটি টাকা। জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত এই ঘাটতি ছিল ৩১ হাজার ৫০৭ কোটি টাকা। এনবিআর সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। এই অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ছিল ১ লাখ ৬৪ হাজার ৬৯ কোটি টাকা। তবে এই সময়ে শুল্ক-কর মিলিয়ে আদায় হয়েছে ১ লাখ ২৪ হাজার ৫২৭ কোটি টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার ৭৬ শতাংশ। এতে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩৯ হাজার ৫৪২ কোটি টাকা। 

চলতি অর্থবছরের সাত মাস ধরেই রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি বেড়ে চলেছে। প্রথম মাস অর্থাৎ জুলাইতে ২ হাজার ৪১৫ কোটি টাকা কম রাজস্ব আদায় হয়। পরে জুলাই থেকে আগস্টে এই ঘাটতি দাঁড়ায় ৯ হাজার ৩১৮ কোটি টাকা, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরে ১৪ হাজার ৯০৭ কোটি টাকা, জুলাই থেকে অক্টোবরে ২০ হাজার ২২১ কোটি টাকা এবং জুলাই থেকে নভেম্বরে তা দাঁড়ায় ২৬ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা। এনবিআরকে লক্ষ্য অর্জনে গত অর্থবছরের চেয়ে ৪৫ শতাংশের বেশি রাজস্ব আদায় করতে হবে। কিন্তু সাত মাসে রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি মাত্র ৬ দশমিক ৭২ শতাংশ। এই লক্ষ্য অর্জনে রাজস্ব আদায়ে গতি বাড়াতে হবে দ্বিগুণের বেশি। এবার গত অর্থবছরের ২ লাখ ৮০ হাজার ৬৩ কোটি টাকার সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও ১৬ দশমিক ২৬ শতাংশ বেশি রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য রয়েছে এনবিআরের।

প্রস্তাবিত বাজেটে আয়ের যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবার সম্ভাবনা যেহেতু ক্ষীণ তাই বাধ্য হয়ে সরকারকে দেশি বিদেশি ঋণের উপর নির্ভর করতে হবে। সরকার ব্যাংকিং খাত থেকে যে ৮৪ হাজার ৯৮৩ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার চিন্তা করছে, রাজস্ব আয় উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেলে সেই ঋণের পরিমান অনেক বেড়ে যাবে। চলতি বাজেটে সরকারের এই ঋণ লক্ষ্যমাত্রা ছিল মাত্র ৪৭ হাজার কোটি টাকা যা সরকার বছরের অর্ধেক সময়ের মধ্যেই শেষ করে ফেলেছে। তাই এবার ও এই লক্ষ্যমাত্রা অর্থবছরের অর্ধেক সময়ের মধ্যে শেষ হবার সম্ভাবনা আছে যদি করোনার প্রভাব দুই এক মাসের মধ্যে শেষ হয়। না হলে এই ঋণ চলে যাবে লক্ষ্যমাত্রার প্রায় দিগুণ যা ব্যক্তিখাতের ঋণ প্রবাহ কমিয়ে বিনিয়োগ, আয়, কর্মসংস্থানসহ নানাবিধ ইম্প্যাক্ট তৈরি করবে সামস্টিক অর্থনীতিতে। আর সার্বিক ফলশ্রুতিতে কমে যাবে জাতীয় আয়। জাতীয় আয়ের প্রবৃদ্ধি হবে বাধাগ্রস্থ। বাজেটে ঘোষিত ৮.২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অধরাই থেকে যাবে। 

তবে যদি সরকার কম প্রয়োজনীয় বা অপ্রয়োজনীয় খরচ কমায়; কালো টাকা সাদা করার প্রতি কঠোর হতে পারে; বিদেশে পাচারকৃত টাকার কিয়দংশ ফেরত আনতে পারে; রাজস্বনীতির সংস্কার করে আয় বাড়াতে পারে; রাষ্ট্রযন্ত্রের চাকাগুলোকে সত্যিকার অর্থে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে; তাহলে অনেক টাকা যেমন বাঁচবে তেমনি অনেক টাকা আয় বাড়বে যা প্রবৃদ্ধিকে তরান্বিত করবে। না হলে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার রাজস্ব আয় দিয়ে খরচ মিটিয়ে প্রাক্কলিত প্রবৃদ্ধি অর্জন স্বপ্নই থেকে যাবে বাস্তবের মুখ দেখবে না। 

লেখক: অর্থনীতি বিশ্লেষক; ফাউন্ডার ও সিইও ফিনপাওয়ার লিডারশীপ ইন্টারন্যাশনাল

[email protected]


আরও পড়ুন

×