জেলা পর্যায়ে চালু হোক পরীক্ষামূলক প্লাজমা থেরাপি
ফাইল ছবি
ড. রবিউল হাসান ভুঁইয়া
প্রকাশ: ২৯ জুন ২০২০ | ০১:৫৬
প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের বিস্তারে গোটা বিশ্ব বিপর্যস্ত। এ ভাইরাস মোকাবেলায় টেস্টের মাধ্যমে শনাক্তকরণ, আলাদাকরণ ও উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা দিলেও মৃত্যুর সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলছে।
প্রথম থেকেই ধারণা ছিল যে ভ্যাকসিন অথবা নিরাপদ ও কার্যকরী ওষুধ আবিষ্কার সময় সাপেক্ষ। তাই গত ২৬ মার্চ আমার ফেসবুক ওয়ালে স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম যে, করোনা আক্রান্ত রোগীর জীবন বাঁচানোর শেষ চেষ্টা হিসেবে নিরাময়লাভকারীর ব্লাড-প্লাজমার (পরোক্ষ এন্টিবডি থেরাপি) প্রয়োগ চিকিৎসকগণ যেন বিবেচনা করেন। আমাদের দেশে তখনো প্লাজমা থেরাপি আলোচনায় আসেনি। স্ট্যাটাসটি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের নজরে আসে। অবশ্য এরপরপরই বিভিন্ন দেশে করোনায় আক্রান্ত রোগীর উপর প্লাজমা থেরাপির সফল ট্রায়ালের খবর জানা যায়।
ব্লাড-প্লাজমা (রক্তরস) বা পরোক্ষ এন্টিবডি থেরাপি হচ্ছে, একজন নিরাময়লাভকারীর শরীরে উৎপন্ন এন্টিবডি অন্য আক্রান্ত রোগীর শরীরে প্রবেশ করিয়ে ভাইরাসকে অকার্যকর করা। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠা ব্যক্তির ব্লাড-প্লাজমা আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে প্রয়োগ করলে আক্রান্ত ব্যক্তি দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠতে দারুণ ভুমিকা রাখে। প্লাজমা থেরাপি ১৮৯০ সালের পদ্ধতি। এ থেরাপি প্রয়োগে ১৯১৮ সালে স্প্যানিশ ফ্লু মহামারী, ২০০২-০৩ সালে সার্স ও ইবোলার ক্ষেত্রে কিছু সাফল্য পাওয়া গিয়েছে। ২৭ মার্চ ও ৬ এপ্রিল চীনের পরীক্ষামূলক প্লাজমা থেরাপির ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে সফলতার খবর নামকরা বিজ্ঞান সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়। এতে উন্নত বিশ্ব প্লাজমা থেরাপির প্রয়োগ নিয়ে আরও আশাবেঞ্জক হয়ে উঠে।
স্বাস্থ্য-মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে জাতীয় টেকনিক্যাল কমিটি গঠিত হওয়ার পরই কমিটির প্রধান প্রফেসর ডা. মো. শহীদুল্লাহ ও সদস্য সচিব প্রফেসর ডা. মীরজাদী সেব্রীনা ফ্লোরা বরাবর আমি একটি ইমেল করেছিলাম প্লাজমা থেরাপির উদ্যোগ নিতে। পরবর্তীতে আমি ব্যক্তিগতভাবে প্লাজমা থেরাপি বিষয়ক সাব কমিটির প্রধান অধ্যাপক ডা. মহিউদ্দিন আহম্মেদ খানের সঙ্গে যোগাযোগ করি যেন প্লাজমা থেরাপির পরীক্ষামূলক ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল দেশব্যাপী বিস্তৃত করে এবং রোগীর সংখ্যা বাড়ায়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্লাজমা থেরাপির গড়পড়তা প্রয়োগ বন্ধ করতে বললেও এর পরীক্ষামূলক ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল হিসেবে প্রয়োগে নিষেধ করেনি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ পরীক্ষামূলক ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল হিসেবে করোনা আক্রান্ত রোগীর উপর প্লাজমা থেরাপির প্রয়োগ করে আসছে। আমেরিকাও পরীক্ষামূলক ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল হিসেবে তাদের ফুড ও ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেসনের অনুমোদনে এক্সফানডেন্ট এক্সেস প্রোগ্রামের আওতায় মায়ো ক্লিনিক্যালের মাধ্যমে দেশব্যাপী করোনা আক্রান্ত ১৬ হাজার রোগীর উপর প্লাজমা থেরাপির প্রয়োগ করছে। তারা দেশব্যাপী ৫ হাজার রোগীর উপর এ থেরাপি প্রয়োগ করার পর মায়ো ক্লিনিক্যালের প্রধান মাইকেল জয়নার বলেন, এ থেরাপি নিরাপদ এবং পরবর্তী ধাপে এর কার্যকারিতা দেখবেন। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতও পরীক্ষামূলক ন্যাশনাল ট্রায়ালের অংশ হিসেবে বিভিন্ন শহরে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর উপর প্লাজমা থেরাপি প্রয়োগ করছে। শুধু ভারতের নাগপুরেই করোনা আক্রান্ত ৫০০ রোগীর উপর প্লাজমা থেরাপি প্রয়োগের পরিকল্পনা করছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পাশাপাশি ইতিমধ্যে আমাদের দেশেও প্লাজমা থেরাপি প্রয়োগে রোগীর শারীরিক উন্নতির লক্ষণসহ সাফল্য পাওয়ার দাবী করছে বিভিন্ন হাসপাতাল। প্লাজমা থেরাপির সফলতা কিছুটা প্রতীয়মান হওয়ায় আক্রান্ত রোগীর উপর এ থেরাপি প্রয়োগে মানুষের আকাঙ্ক্ষা বাড়ছে যা সোশ্যাল মিডিয়ায় বিভিন্ন স্থানে প্লাজমার চাহিদা দেখে দারুণভাবে প্রতীয়মান হয়।
এদিকে করোনা আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসায় প্লাজমা সংগ্রহ ও সরবরাহের উদ্দেশ্যে নিরাময়লাভকারীর হতে প্লাজমা পেতে সরকারের তথ্য ও প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী অনলাইন প্লাটফরম `সহযোদ্ধা` প্লাজমা নেটওয়ার্ক উদ্বোধন করেন। পাশাপাশি রক্ত সরবরাহকারী সংগঠন বাঁধন, সন্ধানীসহ আরও কিছু সংগঠন প্লাজমা সংগ্রহ ও সরবরাহের উদ্দেশ্যে কাজ করে যাচ্ছে।
যেহেতু আমাদের দেশে ভেন্টিলেশনের স্বল্পতা আছে এবং বিভিন্ন জায়গায় এ থেরাপি প্রয়োগে সফলতাও শোনা যাচ্ছে। তাই, পরীক্ষামূলক ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের আওতায় সব জেলা শহরে প্লাজমা ব্যাংক স্থাপন করা প্রয়োজন। যাতে চিকিৎসকের পরামর্শক্রমে করোনায় আক্রান্ত রোগীর জীবন বাঁচানোর শেষ চেষ্টা হিসেবে প্লাজমা থেরাপি প্রয়োগ করতে পারে। পাশাপাশি ব্লাড-প্লাজমা পেতে সরকারের পক্ষ থেকে নিরাময়লাভকারীদের উদ্বুদ্ধ করার উদ্যোগও নেওয়া প্রয়োজন।
সহযোগী অধ্যাপক, প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
- বিষয় :
- করোনাভাইরাস
- প্লাজমা
- ভাইরাস
- থেরাপি