ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬

করোনাদুর্যোগে মধ্যবিত্তের বাজেট ভাবনা

করোনাদুর্যোগে মধ্যবিত্তের বাজেট ভাবনা
×

অধ্যাপক ড. এএফএম মফিজুল ইসলাম

অধ্যাপক ড. এএফএম মফিজুল ইসলাম

প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২০ | ০৬:৩৩ | আপডেট: ১১ আগস্ট ২০২০ | ০৯:২৩

নিয়মিত প্রাতঃভ্রমণে যাই চন্দ্রিমা উদ্যানে। সূর্যোদয়ের আগেই তিন তলা থেকে ধাঁই ধাঁই করে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেট পার হয়েছি মাত্র। সে কী করুণ দৃশ্য! ট্রাকভর্তি হাঁড়ি-পাতিল, খাট, তোশক-বালিশ, ফ্রিজ। বাড়িওয়ালা বকেই চলেছে, ভাড়া না দিয়ে চোরের মতো কোথায় পালাচ্ছেন? ভাড়া দিন, ট্রাক ছাড়ূন। সেদিন অফিসে গিয়ে কোনো কাজ করতে পারিনি। বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল বাচ্চা দুটোর বিষাদময় চেহারা আর সাদেক সাহেবের করুণ আকুতি। অফিস টেবিলে থরে থরে সাজানো খবরের কাগজ। চোখ বুলিয়ে যাচ্ছি, পড়ছি শুধু শিরোনাম। এক জায়গায় এসে চোখ আটকে গেল- 'করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় শেষ অস্ত্র বেছে নিল মনিকা'।

যশোরের মেয়ে মনিকা। থাকত ঢাকায়। চাকরি করত এক মধ্যম মানের কোম্পানিতে। সর্বসাকুল্যে সে হাজার পঞ্চাশেক টাকা বেতন পেত। বছর খানেক আগে তার স্বামী মারা গেছে। দুই শিশুপুত্র নিয়ে ভাড়া বাসায় থাকত। করোনা পরিস্থিতিতে সে অর্ধেক বেতন পেল প্রথম এক মাস। দ্বিতীয় মাসে কোম্পানি তাকে স্রেফ জানিয়ে দিল তার চাকরি নেই। মনিকা এমএ পাস। কোথাও হাত পাততে পারল না। এদিকে বাচ্চা দুটো না খেয়ে খেয়ে মরতে বসেছে। এর কয়েক দিন পরের ঘটনা। বাসায় ফিরছি। গেটে পা দিতে না দিতেই দারোয়ান ছুটে এসে বলল, স্যার জানেন, পাঁচ তলার সাদেক সাহেব, সেদিন যে কাঁদতে কাঁদতে দেশে চলে গেলেন, তিনি নাকি আত্মহত্যা করেছেন। ঘরে ফিরে বিছানায় টান টান হয়ে শুয়ে শুয়ে ভাবছিলাম, সাদেক সাহেব এবং মনিকা দু'জনই 'মরে বেঁচে গেছে'। কিন্তু যে সমস্ত মধ্যবিত্ত পরিবার বেঁচে মরতে বসেছে, বেঁচে ধুঁকে ধুঁকে তিলে তিলে মরছে, তাদের পরিত্রাণের উপায় কী? যদি পশ্ন করা হয়, করোনা পরিস্থিতিতে কোন শ্রেণির মানুষ অর্থনৈতিকভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে? অনেকেই বলবেন, দরিদ্র ও হতদরিদ্র যারা তারাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিন্তু আমরা কেউ কি কখনও ভেবে দেখেছি, করোনা পরিস্থিতিতে মধ্যবিত্তের কী হাল হয়েছে! যা ছিল তাও শেষ, পরিবার-পরিজন নিয়ে কে কোথায় ছিটকে পড়েছে কে জানে। বাড়িওয়ালা বের করে দিয়েছে, থাকার জায়গা নেই, খাবার কেনার অর্থ নেই। মধ্যবিত্ত যারা, তারা দেয়ালে পিঠ ঠেকলেও হাত পাততে পারে না, ধুঁকে ধুঁকে মরে। এবারের করোনা পরিস্থিতি কর্মক্ষেত্রের যে পরিবেশ সৃষ্টি করেছে, তাতে কাজ হারানো মধ্যবিত্ত শ্রেণি নীরবে-নিভৃতে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। মধ্যবিত্ত কারা? যদি ওপরের দিকের উচ্চবিত্ত ও বিত্তশালী ২০ শতাংশ, আর নিচের দিকে দরিদ্র জনগোষ্ঠী ২০ শতাংশ হয়, তাহলে বাকিটা অর্থাৎ, ৬০ শতাংশ মধ্যবিত্তের কাতারে পড়ে। তার মানে অর্ধেকেরও বেশি মানুষ মধ্যবিত্ত। ব্র্যাকসহ আরও কয়েকটি সংস্থা সম্মিলিতভাবে একটি গবেষণা করেছে। তাতে দেখা যায়, করোনাভাইরাসের কারণে নতুন করে ৫ কোটি ৩৬ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে এসেছে। এরা কারা? এরা সবাই ছিল নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ।

গত ৩০ জুন ঘোষিত হয়েছে বাংলাদেশ বাজেট ২০২০-২১। বাজেটপূর্ব আলোচনা টেবিলে অনেকে অনেক পরামর্শ দিয়েছেন। কেউ কেউ বলেছেন, এ বছরের বাজেট হতে হবে হেলথ বাজেট, এটি আমাদের বেঁচে থাকার বাজেট। কেউ কেউ বলেছেন, ২০২০-২১ অর্থবছরের সংকোচনমূলক বাজেট চাই না, চাই সম্প্রসারণমূলক বাজেট। কিন্তু মধ্যবিত্তের বাঁচার বাজেটের কথা তেমন উচ্চারিত হয়নি। উল্লেখ করা যেতে পারে যে, করোনা পরিস্থিতিতে গরিবদের কথা চিন্তা করে সরকার নানা কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। আগের ১০ টাকা দরে চাল বিক্রির কর্মসূচির সঙ্গে সরকার এখন তাদের ত্রাণসহায়তা দিচ্ছে, নগদ অর্থও দিচ্ছে। কিন্তু মধ্যবিত্তের সমস্যা রাষ্ট্রীয়ভাবে সমাধানের লক্ষণীয় উদ্যোগ চোখে পড়ে না। মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে সরকারের মনোযোগ থেকে দূরে রাখা হলে সমাজের জন্য এর ফল ভালো হবে না। গত দুই দশকে বাংলাদেশের যে উন্নয়ন ঘটেছে তা মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিস্তৃতি এবং এই শ্রেণির জনগণের চাহিদা বৃদ্ধির কারণে ঘটেছে তা অনস্বীকার্য। তবে এবারের বাজেটকে পুরোপুরি মধ্যবিত্ত বিবর্জিত বাজেট বলা যাবে না। বাজেটে বেশকিছু খাতের উল্লেখ ও বরাদ্দ আছে যা আংশিকভাবে হলেও নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তরা উপকৃত হবে। তবে তা যথেষ্ট কিনা তা বিবেচ্য বিষয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, বাজেটে সরকার 'কৃষিবীমা' চালুর যে প্রস্তাব করেছে, সেটি নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত কৃষক উপকৃত হবে। সাম্প্রতিক বন্যা ও করোনা পরিস্থিতিতে এটির দ্রুত বাস্তবায়নের প্রয়োজন এটা বলাই বাহুল্য। অন্যদিকে, তরুণ উদ্যোক্তা সৃষ্টিতে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে এবারের বাজেটে। প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দের কথা বলা হয়েছে। সরকার শিল্প খাতে দক্ষ কর্মসৃজনের গতি বাড়ানোর লক্ষ্যে ব্যবসা ও বিনিয়োগ পরিবেশ আধুনিকায়ন এবং দক্ষ জনগোষ্ঠীর অধিক হারে কর্মে প্রবেশ উপযোগী আইন-বিধি, নীতি-কৌশল সংস্কারের জন্য তিন বছর মেয়াদে কার্যক্রম শুরু করেছে। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, 'গত অর্থবছরে ১০টি আইন-বিধি, নীতি-কৌশল প্রণয়ন অথবা সংস্কার সম্পন্ন হয়েছে। আগামী দুই বছরে অবশিষ্ট সংস্কারকাজ সম্পাদন করে ক্রমবর্ধমান জনশক্তির জন্য মানসম্পন্ন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে। ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে বলা হয়েছে, সরকারি যে পেনশন ব্যবস্থা রয়েছে তাতে জনসংখ্যার খুব সামান্য একটি অংশ এই সুবিধার আওতায় রয়েছেন। দেশের সংগঠিত ও অসংগঠিত ক্ষেত্রের সব কর্মীর ক্রমান্বয়ে পেনশন সুবিধার আওতায় আনতে শিগগিরই ইউনিভার্সাল পেনশন অথরিটি গঠন করবে সরকার। ধরে নিতে পারি, নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের অনেকে এই সুবিধার আওতায় পড়বে। তার পরও প্রশ্ন থেকে যায়, নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের কত ভাগ এসব সুবিধা ভোগ করতে পারবে। তারা তো বিশাল জনগোষ্ঠী, সমগ্র জনগোষ্ঠীর ৬০ ভাগ। বাজেটে আলাদাভাবে তার প্রতিফলন নেই।\হকরোনা পরিস্থিতিতে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ যারা চাকরি হারিয়েছে, যাদের ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প ধ্বংসের মুখে, তাদের ব্যাপারে কোনো জরিপ নেই। জরিপ করে এমন সব পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে এই শ্রেণির মানুষ আবার উঠে দাঁড়াতে পারে। ভারতে এই শ্রেণির মানুষকে কেবল স্বল্প সুদেই ঋণ দেওয়া হচ্ছে না, এদের জামিন ছাড়াই ঋণ দেওয়া হচ্ছে। এদের ছেলেমেয়েদের উপবৃত্তি দেওয়া আশু প্রয়োজন, নইলে তারা আর আগের স্কুলে ফিরে যেতে পারবে না। এই শ্রেণির মানুষ খেয়ে না খেয়ে ছেলেমেয়েদের ভালো স্কুলে, ইংরেজি স্কুলে ভর্তি করিয়েছে। ছেলেমেয়েদের দুশ্চিন্তায় এরা যেন পাগলপ্রায় না হয়, আর অর্থনৈতিক টালমাটাল অবস্থায় এই শ্রেণির মানুষ যেন মানসিক রোগীতে পরিণত না হয়।

এ কাজটি করতে সরকারের অর্থ জোগানের খুব একটা সমস্যা হবে তা আপাতত মনে হচ্ছে না। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশকে ৭৩ কোটি ২০ লাখ ডলার ঋণ সহায়তা দিচ্ছে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ছয় হাজার ২২২ কোটি টাকার সমান। এর আগে বাংলাদেশকে ৫০ কোটি ডলারের সহায়তা দিয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক। এদিকে নয়াদিল্লির সেন্টার অব পলিসি রিসার্চের অধ্যাপক ব্রাহ্ম চ্যালানির হিসাবমতে, বাংলাদেশে মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি সরকারি ঋণ হলো জাতীয় প্রবৃদ্ধির শতকরা প্রায় ১৪ ভাগের সমতুল্য। এই ঋণ সহনীয়। কাজেই বলা চলে, নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষকে বাঁচাতে গিয়ে সরকারকে অসহনীয় ঋণের মধ্যে পড়তে হবে না। নিম্ন ও মধ্যবিত্তের সমস্যা সমাধানের জন্য সরকারের যতটা না অর্থ জোগানের প্রয়োজন, তার চেয়ে বেশি প্রয়োজন সদিচ্ছার। স্বাস্থ্য খাতের আর্থিক ব্যবস্থাপনা মানুষকে বিদগ্ধ করেছে। শিক্ষিত চাকরি হারা মধ্যবিত্ত এবং ধ্বংসপ্রায় ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প মালিকদের জন্য বিশেষ বিশেষ প্রকল্প হাতে নিতে হবে দ্রুত এবং সেই সঙ্গে জোর দিতে হবে সৎ ও সঠিক আর্থিক ব্যবস্থাপনায়।

করোনা পরিস্থিতিতে মধ্যবিত্তের প্রথমত একটি জরিপ প্রয়োজন এবং তাদের বাঁচার জন্য সুস্পষ্ট রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা প্রয়োজন। যে পরিকল্পনায় থাকবে মধ্যবিত্তের সমস্যাভিত্তিক সুস্পষ্ট উপ খাত, পৃথক পৃথক বরাদ্দ এবং অর্থ ব্যবস্থাপনার সঠিক নির্দেশনা। মধ্যবিত্তই উন্নয়নের চাবিকাঠি। এরা তাদের আয়ের পুরোটাই খরচ করে। ফলে চাহিদা সৃষ্টি হয়, উৎপাদন বাড়ে, উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়। কাজেই দেশের উন্নয়নের স্বার্থেও মধ্যবিত্তের জন্য এ মুহূর্তে প্রয়োজন নতুন নতুন পরিকল্পনা ও প্রকল্প এবং তার সৎ ও সঠিক বাস্তবায়ন।

লেখক উপাচার্য, সাউথইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়। 


আরও পড়ুন

×