অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নীরব চালিকাশক্তি হতে পারে ইন্স্যুরেন্স খাত
মো: তানভীর হামীম
মো: তানভীর হামীম
প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬ | ১৭:৫১
একটি দেশের অর্থনীতি কত দ্রুত অগ্রসর হবে, তা শুধু বিনিয়োগ, শিল্পায়ন কিংবা রপ্তানির ওপর নির্ভর করে না। ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগ, ব্যবসা সম্প্রসারণ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কতটা আস্থা পাচ্ছেন, সেটিও প্রবৃদ্ধির জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়লে উদ্যোক্তারা নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হয়ে ওঠেন, ফলে অর্থনীতির গতিও শ্লথ হয়।
এই অনিশ্চয়তা কমিয়ে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের জন্য আরও পূর্বানুমানযোগ্য অর্থনৈতিক পরিবেশ তৈরি করে ইন্স্যুরেন্স। তাই আধুনিক অর্থনীতিতে ইন্স্যুরেন্সকে শুধু ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা হিসেবে নয়, বরং সঞ্চয়কে বিনিয়োগে রূপান্তর, উদ্যোক্তাদের আস্থা বৃদ্ধি এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি হিসেবে দেখা হয়।
ইন্স্যুরেন্সের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এটি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ঝুঁকি এককভাবে বহনের পরিবর্তে বৃহত্তর পরিসরে ভাগ করে দেয়। ফলে উদ্যোক্তারা নতুন কারখানা স্থাপন, ব্যবসা সম্প্রসারণ কিংবা নতুন খাতে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত আরও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিতে পারেন। কারণ একটি অগ্নিকাণ্ড, দুর্ঘটনা বা বড় ধরনের ক্ষতি পুরো ব্যবসাকে ভেঙে দেবে—এই আশঙ্কা অনেকটাই কমে আসে। একইভাবে একটি পরিবারের জন্য বড় অসুস্থতা বা দুর্ঘটনা মানেই বহু বছরের সঞ্চয় শেষ হয়ে যাওয়া নয়। অর্থাৎ ইন্স্যুরেন্স শুধু ক্ষতির পর ক্ষতিপূরণ দেয় না; ক্ষতির ভয় কমিয়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখে।
দেশের সঞ্চয়কে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে রূপান্তরেও ইন্স্যুরেন্সের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। লাখো গ্রাহকের কাছ থেকে নেওয়া প্রিমিয়াম একটি স্থিতিশীল দীর্ঘমেয়াদি তহবিলে পরিণত হয়, যা সরকারি বন্ড, করপোরেট বন্ড, অবকাঠামোসহ বিভিন্ন উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করা যায়। এতে আর্থিক বাজারে দীর্ঘমেয়াদি পুঁজির জোগান বাড়ে এবং উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য টেকসই অর্থায়নের ভিত্তি তৈরি হয়। অর্থাৎ মানুষের সঞ্চিত অর্থ শুধু নিরাপত্তাই দেয় না, অর্থনীতিতে নতুন বিনিয়োগেরও জোগান সৃষ্টি করে।
স্বাস্থ্য ও জীবন বিমার অর্থনৈতিক প্রভাব আরও বিস্তৃত। একটি দেশে যত বেশি মানুষ এই সুরক্ষার আওতায় আসে, তত কম পরিবার চিকিৎসা ব্যয়ের ধাক্কায় সঞ্চয় হারায় বা দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে পড়ে। একই সঙ্গে সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য ব্যয়ের চাপও কমে, ফলে শিক্ষা, অবকাঠামো ও দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নের মতো খাতে আরও বেশি সম্পদ বরাদ্দের সুযোগ তৈরি হয়। বাংলাদেশের বাস্তবতায় বিষয়টি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
আন্তর্জাতিক গবেষণাও ইন্স্যুরেন্স ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সম্পর্ককে আরও সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরে। এলসেভিয়ার প্রকাশিত ‘রিসার্চ ইন গ্লোবালাইজেশন’ জার্নালের ‘ইনস্যুরেন্স ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ইকোনমিক গ্রোথ: অ্যা সিস্টেমেটিক রিভিউ’ শীর্ষক গবেষণায় বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে পরিচালিত ৫৩টি গবেষণার ফলাফল বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, বিশেষ করে উদীয়মান অর্থনীতিতে ইন্স্যুরেন্স খাতের বিকাশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে। কার্যকর নিয়ন্ত্রক সংস্কার, প্রতিযোগিতামূলক বাজারব্যবস্থা, প্রযুক্তিনির্ভর সেবা এবং আর্থিক সেবায় সহজ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা গেলে এই প্রভাব আরও বাড়তে পারে।
গবেষণাটি আরও বলছে, জীবনবিমা দীর্ঘমেয়াদে সঞ্চয়, মূলধন গঠন ও আর্থিক বাজারের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অন্যদিকে সাধারণ বিমা কৃষি, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ খাতকে সুরক্ষা দিয়ে অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়তা করে।
আমাদের দেশের ইন্স্যুরেন্স খাতের এই বিপুল সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার একটি কার্যকর মাধ্যম হতে পারে ব্যাংকাস্যুরেন্স। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ ব্যাংক এ কার্যক্রম অনুমোদন দেয় এবং ২০২৪ সালের মার্চে এর আনুষ্ঠানিক যাত্রা হয়। ২০২৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে ব্যাংকাস্যুরেন্স কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) থেকে প্রয়োজনীয় পরিচালন লাইসেন্স ও অনুমোদন পেয়েছে ১৪টি ব্যাংক। একই সময়ে ১০টি জীবনবিমা ও ৭টি সাধারণ বিমা কোম্পানি ব্যাংকের সঙ্গে অংশীদারিত্বে এ কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ব্যাংকের বিদ্যমান গ্রাহকভিত্তি, বিস্তৃত শাখা নেটওয়ার্ক এবং মানুষের তুলনামূলক বেশি আস্থাকে কাজে লাগিয়ে বিমা সেবাকে আরও সহজলভ্য করার একটি নতুন পথ তৈরি হয়েছে। যথাযথ তদারকি, গ্রাহক সুরক্ষা ও কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে ব্যাংকাস্যুরেন্স বিমার পরিধি বাড়ানোর পাশাপাশি আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয় ও উৎপাদনশীল বিনিয়োগেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এই অগ্রযাত্রাকে টেকসই করতে ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি, নীতিনির্ধারক ও অন্যান্য অংশীজনের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। ইতোমধ্যে গার্ডিয়ান লাইফ ইন্স্যুরেন্স, মেটলাইফ ও প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্সের মতো প্রথম সারির প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত দাবি নিষ্পত্তি ও গ্রাহকসেবার মানোন্নয়নের মাধ্যমে খাতটির প্রতি মানুষের আস্থা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। পাশাপাশি কার্যকর নিয়ন্ত্রক তদারকি ও স্থিতিশীল নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে ইন্স্যুরেন্স খাত দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে আরও বড় অবদান রাখতে পারবে।
পরিশেষে, আগামী দশকের অর্থনীতিকে আরও স্থিতিশীল, প্রতিযোগিতামূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে চাইলে ইন্স্যুরেন্সকে আর নিছক একটি আর্থিক সেবা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এই খাতের বিকাশ মানে শুধু বেশি পলিসি বিক্রি নয়; বরং অর্থনীতিতে আস্থা, দীর্ঘমেয়াদি পুঁজি এবং টেকসই প্রবৃদ্ধির ভিত্তি আরও শক্তিশালী করা। তাই ইন্স্যুরেন্স খাতের উন্নয়ন মূলত বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সক্ষমতায় বিনিয়োগ।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ই-মেইল: '[email protected]'