ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

অধিকার

বিসিএসে ভেরিফিকেশনের নামে স্বপ্নভঙ্গ

বিসিএসে ভেরিফিকেশনের নামে স্বপ্নভঙ্গ
×

কাজী আরিফুর রহমান

প্রকাশ: ২৬ মে ২০২৬ | ০৮:২৪

অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে জনপ্রশাসনে নিরপেক্ষতা নিশ্চিতকরণে গঠিত সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনের ৯.২ নম্বর অনুচ্ছেদে প্রস্তাব করা হয়েছিল- ‘পুলিশ ভেরিফিকেশন- বিসিএস পরীক্ষায় কৃতকার্য হওয়ার পরে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় চূড়ান্ত নিয়োগের পূর্বে পুলিশ বিভাগের কাছে শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারী মামলা আছে কিনা সে সম্পর্কে প্রতিবেদন চাইবে। প্রয়োজনে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় দুর্নীতি দমন কমিশনে প্রতিবেদন চাইতে পারে’।
এর আগে বলা হয়েছিল, ‘পদোন্নতির ক্ষেত্রে পুলিশ বা কোনো গোয়েন্দা বিভাগের কাছে রাজনৈতিক পরিচয় জানতে চাওয়ার প্রথা বাতিল করার সুপারিশ করা হলো। কারণ জনপ্রশাসনে রাজনীতিকরণ এ স্তর থেকেই শুরু হয়’।
২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে এসব সুপারিশ গ্রহণ করে ড. মুহম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। সংস্কার কমিশনের কতিপয় প্রস্তাবনায় আন্তঃক্যাডার দ্বন্দ্ব বাড়লেও উল্লিখিত বিষয়টি সর্বজনীন কল্যাণকর হওয়ায় সকল চাকুরিজীবীর চাকুরিজীবনে ‘ভেরিফিকেশন’ নামক নিরন্তর বিড়ম্বনা দূর হবে বলে অনেকে আশাবাদী হয়েছিলেন।

এই সংস্কার প্রস্তাবনা গ্রহণ করে যখন তিনি প্রশংসা কুড়াচ্ছেন, মুদ্রার ওপিঠে তখন আমার মতো অনেকেই পুলিশ, এনএসআই, ডিজিএফআইয়ের কঠিন তদন্তের মুখোমুখি হয়ে আতঙ্কিত নির্ঘুম রাত কাটিয়ে চাকুরীজীবন শুরু করার আশায় আছি। বিসিএসের গেজেটের পূর্বে এর আগে কবে ডিজিএফআইয়ের তদন্ত হয়েছে, আমার জানা নেই। তবে এই বিরল ঘটনা ঘটেছে ৪৩তম বিসিএস ব্যাচে। আগে তদন্ত হতো এনএসআইয়ের, ৩৫ ব্যাচ থেকে তাদের তদন্তও আর হয়নি বলে শুনেছি। এরপর থেকে শুধু জেলা প্রশাসন আর পুলিশের ডিএসবির ভেরিফিকেশন চলছিল। কিন্তু ব্যতিক্রম ৪৩ বিসিএস ব্যাচ, যাদের প্রথমে জেলা প্রশাসন আর পুলিশের ভেরিফিকেশন চলছিল, এরপর আসলো ঘটনাবহুল ৫ আগস্ট, তারপর আবার নতুন করে ভেরিফিকেশন হয়ে প্রথম গেজেট হলো। সেই গেজেট প্রকাশের পর সরকার ঘনিষ্ঠ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের আপত্তির কারণে প্রথম গেজেট বাতিল করে আবার এনএসআই এবং ডিজিএফআইকে দিয়ে তদন্ত শুরু হলো। তারপর অধিকতর পুন:তদন্ত শেষে দ্বিতীয় গেজেট হলো।

এর আগে দলীয় সরকার ক্যাডার সার্ভিসে বিশেষত পুলিশ ক্যাডারে ১৯৮১ সালের বিসিএস নিয়োগ বিধিমালার কুখ্যাত অসাংবিধানিক ধারা ৬(২)এ মোতাবেক অনেককে চাকরিচ্যুত করলেও পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে সুবিচার পেয়েছেন। অবশ্য এবারের ঘটনা উল্টো ; প্রথমে প্রতিকার তারপর প্রতিশোধ। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের ১ সপ্তাহের মধ্যে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কালে অনুষ্ঠিত ২৮ থেকে ৪২তম বিসিএসে সর্বমোট গেজেট বঞ্চিত ২৫৯ জনকে গেজেটেড করে। এরপর তারাই আবার ৪৩তম বিসিএসে গেজেট বঞ্চিত করলো ২২৭ জনকে। ৪৩তম বিসিএসে ৩ বার গেজেট প্রকাশ করা হলেও শেষবারে ২২৭ জনের ১৬২ জনকে গেজেটভুক্ত করলেও সবশেষ বাদ পড়লো ৬৫ জন। আর পরবর্তী ৪৪তম বিসিএসের চলমান ভাইভা বাদ দিয়ে পুনরায় ভাইভা নিয়ে ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনা সর্বমোট ৩ বার ফল প্রকাশ করে চূড়ান্ত নিয়োগে গেজেট বঞ্চিত করলো ১৮৬ জনকে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের ১৫ টি বিসিএসে(২৮-৪২তম) গেজেট বঞ্চিত ২৫৯ জনকে গেজেট ভুক্ত করে মাত্র ২ টি বিসিএসে (৪৩ ও ৪৪তম) ৬৫+১৮৬= ২৫১ জনকে গেজেট বঞ্চিত করা হলো। এছাড়া গেজেটেড হয়ে চাকরিরত অবস্থায় কারণ দর্শানো ছাড়া ৪০, ৪১ ও ৪৩তম বিসিএসের বিভিন্ন ক্যাডারের (প্রশাসন, পুলিশ, পররাষ্ট্র, অডিট ও শিক্ষা) ২৬ জনকে অপসারণ করলো। সবমিলিয়ে ২৫১+২৬= ২৭৭ জনকে বিনা দোষে তাদের মেধায় অর্জিত চাকরি করার অধিকার কেড়ে নেওয়া হলো। এর মানে এই নয় যে, আমি আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের গেজেট বঞ্চিত হওয়ার ঘটনাকে সমর্থন করছি। শুধু আওয়ামী লীগ সরকার নয়, বিএনপি সরকারও তাদের আমলে অনেককে গেজেট বঞ্চিত ও অপসারণ করেছে, এমনকি এবার সরকার গঠনের পর ৪৩ ব্যাচের পুলিশের ৪জন এএসপিকে ইতোমধ্যে অপসারণ করেছে । এজন্য কোন নির্দিষ্ট সরকার নয়, কোন সরকারের কাছেই এটি মেধাবী তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশা নয়। মেধায় চাকরি পেলে অবশ্যই তাকে ফৌজদারি বা রাষ্ট্রবিরোধী অপরাধ না করলে নিয়োগ দিয়ে চাকরি করার সুযোগ দেওয়াই সাংবিধানিক অধিকার। 

বিসিএসে চাকরি করার স্বপ্নে বিভোর কত তরুণের জীবনকে ওনার সরকার ধ্বংস করেছে; কত শত পরিবারকে অর্থনৈতিক সামাজিকভাবে পঙ্গু করেছে; কত মায়ের চোখের পানি ঝরিয়েছে, তার হিসাব কি কেউ করেছে কখনো। মাস্টার্সে থাকাকালীন বিয়ে করলেও চাকরি শুরুর পর সংসারজীবন শুরু করেছিলাম। অথচ আমার ১০ মাসের ছোট্ট সংসার ভেঙে দেওয়া হলো এক নোটিশে। আমরা আবার সংসারহীন। অথচ জীবনের প্রথম দুটো বিসিএসেই সফলতার স্বাক্ষর রেখে ক্যাডার সার্ভিসে চাকরি করার সুযোগ পেয়েও আজ আমি বেকার।

এর প্রতিকার জরুরি। এভাবে রাজনৈতিক বিবেচনায় সরকারি চাকরি বঞ্চিত করার অধিকার কোনো সরকারের নেই।


কাজী আরিফুর রহমান: প্রাক্তন শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]

 

আরও পড়ুন

×