সমকালীন প্রসঙ্গ
শিক্ষায় নারীর জয়রথ: ছেলেরা কি পিছিয়ে পড়ছে?
ছেলে ও মেয়ে উভয়ের জন্যই শিক্ষার ব্যয় কমানো দরকার
সোহান আল মেরাজ
প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬ | ২০:০৩ | আপডেট: ২৩ অক্টোবর ২০২৬ | ২০:০৪
চারপাশে যখন মেয়েদের এগিয়ে যাওয়ার গল্প আর সাফল্যের ঝাণ্ডা ওড়ার জয়ধ্বনি শোনা যায়, ঠিক তখনই দেখছি এক অদ্ভুত নীরব দীর্ঘশ্বাস। যে অগ্রগতির আলোকছটায় আমরা আত্মহারা, তার আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে অন্য এক প্রজন্মের ভবিষ্যৎ। এর জন্য কি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতাই দায়ী নয়?
গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের সমাজচিত্রে নারীর শিক্ষা একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে। একসময় দারিদ্র্য, বাল্যবিবাহ আর সামাজিক নানা বাধার প্রাচীর ডিঙিয়ে মেয়েদের স্কুলে যাওয়া ছিল প্রায় অসম্ভব এক স্বপ্ন। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সেই চিত্র বদলে গেছে। ১৯৯৪ সালে চালু হওয়া সরকারের মেয়েদের মাধ্যমিক শিক্ষায় উপবৃত্তি কর্মসূচি এক্ষেত্রে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছে। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের গবেষণা বলছে, এই একটিমাত্র কর্মসূচি মাধ্যমিক স্তরে মেয়েদের অংশগ্রহণ এবং শিক্ষা সম্পন্ন করার সুযোগ নাটকীয়ভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। যেখানে ১৯৯৬ সালে মাধ্যমিক পর্যায়ে ছাত্রী ভর্তির হার ছিল মাত্র ৪১ শতাংশ, সেখানে ২০১৬ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৭২ শতাংশে।
শুধু মাধ্যমিক বা উচ্চ মাধ্যমিকের ইতিহাস ঘাটলেই দেখা যাবে, বিগত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে পাসের হার এবং সর্বোচ্চ ফল বা জিপিএ-৫ অর্জনে ছেলেদের পেছনে ফেলে অপ্রতিরুদ্ধ গতিতে এগিয়ে রয়েছে মেয়েরা। উদাহরণস্বরূপ, সাম্প্রতিক মাধ্যমিক (এসএসসি) ও উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, এইচএসসিতে মেয়েদের পাসের হার ছিল ৬২.৯৭ শতাংশ, যেখানে ছাত্রদের ছিল ৫৪.৬০ শতাংশ—অর্থাৎ মেয়েরা উল্লেখযোগ্য ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে। শুধু তাই নয়, সাম্প্রতিক এসএসসিতেও পাসের হার এবং জিপিএ-৫ প্রাপ্তিতে মেয়েরাই শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে। এ বছর ৬৩ হাজার ৮৯৬ জন ছাত্রী জিপিএ-৫ পেলেও ছাত্ররা পেয়েছে ৫২ হাজার ৭৮০ জন—অর্থাৎ শুধু পূর্ণাঙ্গ জিপিএ অর্জনেই হাজার হাজার ছাত্রীর পেছনে পড়ে আছে ছেলেরা। শিক্ষা বোর্ডের দীর্ঘ ধারাবাহিকতা বলছে, ২০১০ সালের পর থেকে উচ্চ মাধ্যমিকে এবং ২০১৬ সাল থেকে মাধ্যমিকে ধারাবাহিকভাবে মেয়েরাই পাসের হারে এগিয়ে রয়েছে। এই অর্জন নিঃসন্দেহে আমাদের সামাজিক রূপান্তরের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়গুলোর একটি।
কিন্তু মুদ্রার অপর পিঠে লুকিয়ে আছে উদ্বেগজনক বাস্তবতা, যা আমাদের সাফল্যের আনন্দকে ম্লান করে দেয়। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের ‘অ্যানুয়াল প্রাইমারি স্কুল স্ট্যাটিস্টিক্স’ অনুযায়ী, প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ার হার ছেলেদের ক্ষেত্রে মেয়েদের তুলনায় বেশি। আবার বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার ‘ন্যাশনাল চাইল্ড লেবার সার্ভে’ অনুযায়ী, দেশে ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী কর্মরত শিশুদের একটি বড় অংশই ছেলে শিশু এবং শিশুশ্রমে নিয়োজিত শিশুদের বড় একটি অংশ ছেলে। এর অর্থ দাঁড়ায়, শ্রমবাজারে ছেলেদের প্রবেশের প্রবণতা বেশি এবং তাদের কাঁধে ভর করছে পরিবার চালানোর নির্মম আর্থিক দায়িত্ব।
অনেকেই প্রশ্ন তোলেন, মেয়েদের শিক্ষায় সরকারি সাহায্য বা উপবৃত্তি কি তবে ছেলেদের পিছিয়ে পড়ার সরাসরি কারণ? সমাজবিজ্ঞান ও বিভিন্ন গবেষণা বলছে, এই ধারণার কোনো সরাসরি ভিত্তি নেই। বরং মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ বাড়লে তার ইতিবাচক প্রভাব তাদের ভাই ও পরিবারের অন্য সদস্যদের ওপরও পড়ে। কিন্তু সমস্যাটি অন্যত্র। ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্টে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, পরিবারে মেয়েদের স্কুলে ভর্তির সম্ভাবনা বেশি দেখানো হলেও, ভর্তির পর উচ্চতর শিক্ষার ব্যয়ে ছেলেরা বেশি সুবিধা পেতে পারে। অর্থাৎ, দরিদ্র পরিবারগুলোতে যখন অর্থনৈতিক সংকট তীব্র হয়, তখন টিকে থাকার লড়াইয়ে দুই ভাই-বোনের মধ্যে এক নির্মম বৈষম্য তৈরি হয়। পরিবার যখন মনে করে মেয়েকে পড়ালে উপবৃত্তি পাওয়া যাবে বা খরচ কমবে, তখন তাকে স্কুলে রাখা হয়; আর অন্যদিকে ছেলেকে কাজে পাঠিয়ে পরিবারের তাৎক্ষণিক আয়ের পথ খোঁজা হয়। ফলে শিক্ষা তখন অধিকার না হয়ে নিছক বেঁচে থাকার হিসাব-নিকাশে পরিণত হয়।
এই সংকটের স্থায়ী সমাধান মেয়েদের উপবৃত্তি বন্ধ করা বা তাদের সুযোগ কেড়ে নেওয়া নয়। বরং দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত উভয় পরিবারের ছেলে ও মেয়ে উভয়ের জন্যই শিক্ষার ব্যয় কমানো, কঠোরভাবে শিশুশ্রম প্রতিরোধ করা এবং ঝরে পড়ার ঝুঁকিতে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। শিক্ষা কোনো নির্দিষ্ট লিঙ্গের একচ্ছত্র অধিকার হতে পারে না। আমাদের জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন এক বৈষম্যহীন সমাজ গড়া, যেখানে কোনো শিশুই কেবল দারিদ্র্যের কারণে বা পেটের দায়ে শিক্ষাঙ্গন থেকে ছিটকে পড়বে না।
সোহান আল মেরাজ: এডুএনভয়, শিক্ষা অধিকার সংসদ এবং শিক্ষার্থী, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়