মিডিয়া ও তথ্য সাক্ষরতা সপ্তাহ
সচেতন সমাজ গঠনে আমাদের সম্মিলিত দায়িত্ব
মিডিয়া ও তথ্য সাক্ষরতা সপ্তাহ উপলক্ষে ইউনেস্কোর পোস্টার
দিলারা বেগম ও মো. হাসিনুল ইলাহী
প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৬ | ১৯:৫৯ | আপডেট: ২৬ অক্টোবর ২০২৬ | ২১:০৪
বৈশ্বিক মিডিয়া ও তথ্য সাক্ষরতা সপ্তাহ কেবল একটি বার্ষিক উদ্যাপন নয়; বরং এটি আরও তথ্যসমৃদ্ধ, সমালোচনামূলকভাবে সচেতন ও দায়িত্বশীল সমাজ গড়ে তোলার একটি সামাজিক আন্দোলন। ২০১২ সালে ইউনেস্কোর নেতৃত্বে এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সহযোগিতায় এ উদ্যোগের সূচনা হয়। এর লক্ষ্য হলো, প্রত্যেক মানুষের মধ্যে দায়িত্বশীলভাবে তথ্য অনুসন্ধান, মূল্যায়ন, ব্যবহার ও বিনিময়ের প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা নিশ্চিত করা। ২০২১ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ আনুষ্ঠানিকভাবে ২৪ থেকে ৩১ অক্টোবরকে বৈশ্বিক মিডিয়া ও তথ্য সাক্ষরতা সপ্তাহ হিসেবে ঘোষণা করে। এর ফলে উদ্যোগটি আরও বিস্তৃত স্বীকৃতি পায় এবং সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ ও ব্যক্তিপর্যায়ে অংশগ্রহণের সুযোগ জোরদার হয়। এই সপ্তাহের উদ্দেশ্য শুধু কয়েকটি অনুষ্ঠান আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং মানুষ কীভাবে তথ্য বোঝে, গণমাধ্যমের বার্তা যাচাই করে, অপতথ্যের মোকাবিলা করে এবং পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ করে সেসব ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী ইতিবাচক পরিবর্তন আনা। সর্বোপরি, এটি মানুষকে ক্ষমতায়িত করা, জনপরিসরে তথ্যভিত্তিক অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, সহনশীল ও জ্ঞানসমৃদ্ধ সমাজ গড়ে তোলার আন্দোলন।
২০২৬ সালের বৈশ্বিক মিডিয়া ও তথ্য সাক্ষরতা সপ্তাহ ২৪ অক্টোবর থেকে ‘আমরা প্রত্যেকেই ভূমিকা রাখতে পারি: সবার জন্য মিডিয়া ও তথ্য সাক্ষরতা’ প্রতিপাদ্যে শুরু হতে যাচ্ছে। এ প্রতিপাদ্য একটি তথ্যসমৃদ্ধ ও দায়িত্বশীল সমাজ গঠনে ব্যক্তি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকার, গণমাধ্যম ও কমিউনিটির সম্মিলিত দায়িত্বকে তুলে ধরে। ২৪ থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত এই আয়োজন ক্রমেই জটিল হয়ে ওঠা তথ্যপরিবেশে মিডিয়া ও তথ্য সাক্ষরতার গুরুত্ব সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করবে।
আমরা এমন এক পৃথিবীতে বাস করছি, যেখানে মাত্র কয়েকটি ক্লিকেই অসংখ্য তথ্য পাওয়া যায়। সংবাদ, ছবি, ভিডিও, মতামত ও জনসংশ্লিষ্ট বার্তা, আমাদের কাছে টেলিভিশন, সামাজিক মাধ্যম এবং বিভিন্ন ওয়েবসাইট মাধ্যমে পৌঁছায়। তথ্য পাওয়ার এই অভূতপূর্ব সুযোগ যোগাযোগ ও অংশগ্রহণের নতুন পথ তৈরি করেছে; তবে এর সঙ্গে একটি বড় প্রশ্নও দেখা দিয়েছে: কোন তথ্য নির্ভরযোগ্য, কোনটি বিভ্রান্তিকর এবং কোন তথ্য আমাদের মনোযোগ পাওয়ার যোগ্য–তা আমরা কীভাবে বুঝব?
এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উত্তর হলো মিডিয়া ও তথ্য সাক্ষরতা, যা বর্তমান তথ্যসমাজে সবার জন্য প্রয়োজনীয় কিছু দক্ষতার সমষ্টি। ইউনেস্কোর মতে, মিডিয়া ও তথ্য সাক্ষরতা হলো এমন জ্ঞান, দক্ষতা, মনোভাব ও মূল্যবোধের সমন্বয়, যা মানুষকে দায়িত্বশীলভাবে তথ্য ও গণমাধ্যমের বিষয়বস্তু অনুসন্ধান, যাচাই, মূল্যায়ন, ব্যবহার এবং তৈরিতে সক্ষম করে। এর মাধ্যমে মানুষ মিডিয়া ও তথ্যব্যবস্থা কীভাবে কাজ করে তা বুঝতে পারে, পক্ষপাত শনাক্ত করতে পারে, তথ্যসূত্রের বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাই করতে পারে এবং সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এর সঙ্গে ডিজিটাল অধিকার, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং তথ্য ও প্রযুক্তির নৈতিক ব্যবহার সম্পর্কেও সচেতনতা জড়িত। তাই মিডিয়া ও তথ্য সাক্ষরতা শুধু স্মার্টফোন চালানো, ইন্টারনেট ব্যবহার করা বা সামাজিক মাধ্যমে সক্রিয় থাকার দক্ষতা নয়। আমরা যে তথ্যের মুখোমুখি হই, তা নিয়ে সমালোচনামূলকভাবে চিন্তা করা এবং সমাজে অর্থবহভাবে অংশগ্রহণ করার সক্ষমতাই এর মূল কথা।
দৈনন্দিন জীবনে তথ্যের প্রভাব বিবেচনা করলে মিডিয়া ও তথ্য সাক্ষরতার গুরুত্ব স্পষ্ট হয়। শিক্ষা, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য, পরিবার, সরকারি সেবা ও নাগরিক জীবনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে মানুষ তথ্যের ওপর নির্ভর করে। তথ্য ভুল হলে বা ইচ্ছাকৃতভাবে বিকৃত করা হলে এসব সিদ্ধান্ত প্রভাবিত হতে পারে। মিথ্যা দাবি ব্যক্তিগত যোগাযোগের নেটওয়ার্কে ছড়িয়ে পড়তে পারে, বিভ্রান্তিকর বিজ্ঞাপন ভোক্তাদের ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে এবং গুজব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সুনাম নষ্ট করতে পারে। তথ্য যাচাইয়ের দক্ষতার অভাব মানুষকে অনলাইন প্রতারণা, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ও প্রভাবিত করার প্রচেষ্টার ঝুঁকিতেও ফেলতে পারে। মিডিয়া ও তথ্য সাক্ষরতা মানুষকে চিন্তাভাবনা করে তথ্য গ্রহণ, প্রমাণ ও মতামতের পার্থক্য বোঝা এবং কখন আরও যাচাই প্রয়োজন তা শনাক্ত করতে সহায়তা করে।
এটি জনজীবনে তথ্যভিত্তিক অংশগ্রহণকে শক্তিশালী করে এবং তথ্য পাওয়ার অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও মানসম্মত শিক্ষাকে সমর্থন করে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশের ফলে এসব চ্যালেঞ্জ আরও জটিল হয়েছে। জেনারেটিভ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বিশ্বাসযোগ্য লেখা, ছবি, অডিও রেকর্ডিং ও ভিডিও তৈরি করতে পারে। ডিপফেকের মাধ্যমে এমন ধারণা তৈরি করা সম্ভব যে কোনো ব্যক্তি এমন কথা বলেছেন বা কাজ করেছেন, যা বাস্তবে ঘটেনি। কৃত্রিমভাবে তৈরি ছবি ও বানানো উদ্ধৃতিও আসল প্রমাণ হিসেবে ছড়িয়ে পড়তে পারে। স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাও ব্যবহারকারীর কাছে কোন তথ্য কীভাবে নির্বাচন, সুপারিশ ও উপস্থাপন করা হবে, তাতে প্রভাব ফেলে। শিক্ষা, গবেষণা, সৃজনশীলতা ও যোগাযোগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করলেও এর তৈরি তথ্যের মধ্যে ভুল থাকতে পারে বা বিভ্রান্তিকর দাবি পুনরুৎপাদিত হতে পারে। ফলে কোনো ছবি বা ভিডিও বাস্তবসম্মত দেখলেই সেটিকে সত্য বলে ধরে নেওয়া যায় না।
‘আমরা প্রত্যেকেই ভূমিকা রাখতে পারি: সবার জন্য মিডিয়া ও তথ্য সাক্ষরতা’–এই প্রতিপাদ্য মিডিয়া ও তথ্য সাক্ষরতা প্রসারে সম্মিলিত দায়িত্বের ওপর গুরুত্বারোপ করে। বর্তমান জটিল তথ্যপরিবেশে চলার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা সবার মধ্যে গড়ে তোলা কোনো একক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সম্ভব নয়। তথ্য শেয়ার করার আগে তা যাচাই করে, ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিকে সম্মান করে, ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষিত রেখে এবং অনলাইনে দায়িত্বশীলভাবে যোগাযোগের মাধ্যমে প্রত্যেক ব্যক্তি অবদান রাখতে পারেন। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে দেখা বিষয়বস্তু নিয়ে প্রশ্ন করতে অভিভাবকেরা শিশুদের উৎসাহিত করতে পারেন। তরুণেরা তাদের ডিজিটাল দক্ষতা কাজে লাগিয়ে তথ্যবহুল ও গঠনমূলক বিষয়বস্তু তৈরি করতে পারে।
মিডিয়া ও তথ্য সাক্ষরতা প্রসারের দায়িত্ব সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রের ওপর বিস্তৃত। সরকার সহায়ক নীতি প্রণয়ন, মিডিয়া ও তথ্য সাক্ষরতা শিক্ষায় অর্থায়ন এবং জাতীয় উদ্যোগের সমন্বয় করতে পারে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের তথ্য মূল্যায়ন এবং তৈরি করার প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করতে পারে। সাংবাদিক ও গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান পেশাগত মান বজায় রাখতে, ঘটনার প্রেক্ষাপট তুলে ধরতে এবং ভুল হলে স্বচ্ছভাবে সংশোধন প্রকাশ করতে পারে। সমাজের নাগরিক সংগঠনগুলো এমন জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাতে পারে, যারা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ থেকে প্রায়ই বঞ্চিত থাকে। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান বিষয়বস্তু সুপারিশের পদ্ধতি সম্পর্কে স্বচ্ছতা বাড়াতে এবং বিকৃত বিষয়বস্তু প্রতিবেদন করার সহজলভ্য ব্যবস্থা দিতে পারে। ইউনেস্কোর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থা গবেষণা, শিক্ষাসামগ্রী, নীতিগত দিকনির্দেশনা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে অবদান রাখতে পারে। এসব উদ্যোগ বিচ্ছিন্নভাবে নয়, বরং পরস্পরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করলে সবচেয়ে বেশি কার্যকরী হবে।
মিডিয়া ও তথ্য সাক্ষরতা কোনো একটি পেশা, প্রতিষ্ঠান বা প্রজন্মের একক দায়িত্ব নয়। এটি আজীবন প্রয়োজনীয় এমন একটি দক্ষতা, যা মানুষকে তথ্যের জগতে চলতে, সমাজে অংশ নিতে এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের বিষয়ে বিবেচনাপূর্ণভাবে সাড়া দিতে সাহায্য করে। বাংলাদেশে ব্যক্তি পর্যায়ের দায়িত্ব, শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার, কমিউনিটির সম্পৃক্ততা, প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা এবং সহায়ক জাতীয় নীতিকাঠামোর মধ্যে সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন। বৈশ্বিক মিডিয়া ও তথ্য সাক্ষরতা সপ্তাহ ২০২৬-এর বার্তা তাই সহজ, কিন্তু জরুরি: তথ্যপরিবেশ গঠনে প্রত্যেকের ভূমিকা রয়েছে। যাচাই করা প্রতিটি বার্তা, দায়িত্বশীল পোস্ট, সমালোচনামূলক প্রশ্ন, তথ্যসমৃদ্ধ শ্রেণিকক্ষের আলোচনা এবং কমিউনিটিভিত্তিক শেখার উদ্যোগ আরও তথ্যসমৃদ্ধ সমাজ গঠনে অবদান রাখতে পারে। মিডিয়া ও তথ্য সাক্ষরতাকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে গ্রহণ এবং শুধু আনুষ্ঠানিক উদ্যাপনে সীমাবদ্ধ না রেখে ধারাবাহিক কর্মসূচির মাধ্যমে আমরা সবাই একত্রে সাধারণ মানুষকে কেবল তথ্যের ভোক্তা নয়, বরং ডিজিটাল যুগের সচেতন, দায়িত্বশীল ও সক্রিয় অংশগ্রহণকারী হিসেবে গড়ে তুলতে পারি ।
অধ্যাপক ড. দিলারা বেগম: ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির ইনফরমেশন স্টাডিজ বিভাগের চেয়ারম্যান এবং মিডিয়া অ্যান্ড ইনফরমেশন লিটারেসি নেটওয়ার্ক বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট
মো. হাসিনুল ইলাহী: ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির ইনফরমেশন স্টাডিজ বিভাগের চেয়ারম্যান সিনিয়র লেকচারার এবং মিডিয়া অ্যান্ড ইনফরমেশন লিটারেসি নেটওয়ার্ক বাংলাদেশের সেক্রেটারি
- বিষয় :
- মিডিয়া
- মিডিয়া ও তথ্য সাক্ষরতা