বিপন্ন নদী বিপর্যস্ত জীবন
ফাইল ছবি
ড. মুহাম্মদ ইদ্রিস আলী
প্রকাশ: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ০৭:০৭ | আপডেট: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ০৫:২৯
প্রতি বছর সেপ্টেম্বর মাসের চতুর্থ রোববার বিশ্ব নদী দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে ১৯৮০ সাল থেকে। কানাডার ব্রিটিশ কলম্বিয়া রাজ্যের প্রথিতযশা শিক্ষক ও বিশিষ্ট নদী সাধক মার্ক এঞ্জেলো এই দিবসের সূচনা করেন। অতঃপর নদীর উপলব্ধি ও প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় তা দ্রুত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া প্রভৃতি দেশে ছড়িয়ে পড়ে। ২০০৫ সালে জাতিসংঘ কর্তৃক দিবসটি সমর্থিত হয়। আমাদের নদীমাতৃক বাংলাদেশে এ দিবসটি পালন শুরু হয় ২০১০ সাল থেকে। নদী মানবজীবনের অত্যন্ত অপরিহার্য অনুষঙ্গ। নদীর গুরুত্ব তুলে ধরার জন্য, নদীর প্রয়োজনীয়তাকে উপলব্ধিতে জাগিয়ে রাখার জন্য, নদী ঐতিহ্যকে ধারণ করার জন্য, নদী সংকটকে পর্যালোচনার জন্য এবং নদীর সংকটাপন্ন অবস্থাকে সর্বসাধারণ এবং নীতিনির্ধারকদের নজরে আনার জন্য বিশ্ব নদী দিবস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দিবস। মানুষের জন্য, আগামী পৃথিবীর স্বাচ্ছন্দ্য এবং জীবনের সুখ-সমৃদ্ধির জন্য। দেশে দেশে নদীর প্রবাহের শঙ্কা-সংকটকে উপলব্ধি করার জন্য, সুবিধাভোগী অংশীজনদের সামনে তুলে আনার জন্য বিশ্ব নদী দিবসের গুরুত্ব অপরিসীম। নদীর স্বাস্থ্য নিয়ে, গতিধারা নিয়ে, সংকট নিয়ে, নাব্য নিয়ে, পানি প্রবাহের গতিময়তায় নিয়ে পর্যালোচনার দিন বিশ্ব নদী দিবস।
নদীর প্রবাহের মাধ্যমে মানবজীবনের বহুবিধ উপকারিতা আজ অনস্বীকার্য। নদীর পানির স্বচ্ছতার মাধ্যম দিয়ে সুপরিবেশ ও সুস্বাস্থ্যের নিশ্চয়তা সমৃদ্ধ বিশ্বের সূচক। বাস্তুতান্ত্রিকতার ধারাবাহিকতা, সংস্কৃতির ঐতিহ্য, ছন্দ, গন্ধ, রূপ, রস নদীর নির্মল প্রবাহের প্রতিচ্ছবি। নদী ব্যবসা-বাণিজ্য, যোগাযোগ, যাতায়াতের, প্রকৃতি পরিবেশের, জলবায়ু উষ্ণায়নের প্রাকৃতিক মাধ্যম এবং পরিবেশ ভারসাম্য সুরক্ষার উপাদান। বিশ্ব নদী দিবসে আগামী প্রজন্মকে, বর্তমানের সুবিধাভোগীদের সচেতন করা, নদীকে নদীর মতো করে শুদ্ধ, সচল, পরিচ্ছন্ন, প্রবহমান রাখার প্রত্যয়ে শানিত করা।
নদীর প্রতি ব্যক্তিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতাকে পর্যালোচনা করা। বিশ্বব্যাপী এসবই এ দিবসের আলোচনা-পর্যালোচনার মুখ্য বিষয়। পৃথিবীতে দেশে দেশে মানুষ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীর প্রাকৃতিক মূলধনগুলো সংকোচন এবং বিপন্নতার প্রচলিত যে ব্যবস্থা চালু হয়েছে, তাকে কোনোভাবেই সভ্যতা বলা যায় না। নদীর কোনো প্রকার বিপন্নতা, বিষণ্ণতা, বিপদগ্রস্ততা, দূষণ সভ্যতার অনুষঙ্গ-অঙ্গ হতে পারে না।
তেরশত নদীর দেশ বাংলাদেশ। এককালের পঁচিশ হাজার কিলোমিটারের জলপথের বাংলাদেশ। নদীমাতৃক দেশ বাংলাদেশ। বিস্তৃত অববাহিকা ও জীবন্ত বদ্বীপ দেশটির ঐতিহ্য, সামাজিকতা, সংস্কৃতিকে নদীময় করে রেখেছে। বাংলাদেশের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, প্রাকৃতিক ঐতিহ্য এর নদী।
কবিতার ভাষায় তেরশত নদীর দেশ বাংলাদেশ। হাজার বছরের বাঙালিয়ানার শিকড় বহমান বৈচিত্র্যময় নদনদীর ঐতিহ্য আর ইতিহাসে পরিপূর্ণ।
বাংলাদেশের মানুষের যা কিছু ঐতিহ্য, ইতিহাস, সংস্কৃতি সবকিছুতেই নদীর আশ্রয়-প্রশ্রয় বিমূর্ত। এ দেশের ঐতিহ্যিক গান ভাটিয়ালি, পল্লিগীতি, জারিসারি, প্রভৃতিতে নদী জীবন্ত, বিমূর্ত উপাখ্যান। নদীর জলে অবগাহন, নদীর জলে পরিশুদ্ধি, নদীর জলে চাষবাস এ দেশের মানুষকে প্রকৃতিবান্ধব করে, প্রকৃতির সন্তানে রূপান্তরিত করে। প্রকৃতির সঙ্গে মিশিয়ে রাখি।
নদীর পাড়ে হাটবাজার, গঞ্জ, নগর, শহর গড়ে প্রকৃতির ছোঁয়ায় মানুষের সমাজ বিনির্মাণ ও চর্চিত হয়েছে প্রাচীন বাংলার জনপদ থেকে। বাংলাদেশের চাষযোগ্য ভূমিতে নদীর পলি পতন, ঐতিহ্যগতভাবে জমির উর্বরা বৃদ্ধি করেছে। এ দেশের মানুষের আদি পেশা কৃষিকে সমৃদ্ধ করেছে নদী এবং তার পলি ও পললভূমি। নদীর সঙ্গে মানুষের দৈনন্দিন আচার-আচরণ, সংমিশ্রণ, সংশ্নেষণ বাঙালির বাঙালিয়ানার অনুষঙ্গ হয়ে ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করেছে। বেদনায়, তাড়নায়, বিসর্জনে, বিহ্বলতায়, বিপদে-আপদে নদী এ দেশের মানুষের নির্বাক নিত্যসঙ্গী থেকেছে সব সময়। পানিতে ভাসা, সাগর থেকে জাগা অবিরাম বৃষ্টিপাত, বন্যা-খরার দেশ বাংলাদেশ। উজান থেকে বয়ে আসা আন্ত ও আন্তর্জাতিক পলিবহা, পলি পতনের দেশ বাংলাদেশ। সমতল পলিপৃক্ত মাটির বুক চিরে সোহাগে হয়ে যাওয়া মায়াবী নান্দনিক নদীর দেশ বাংলাদেশ।
দেশে মানুষ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে প্রাকৃতিক ঐতিহ্য- ঐশ্বর্য নদী বিপদাপন্ন, বিপদসংকুল হয়ে পড়েছে। গত শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকেই নদী-ঐতিহ্যে সংকটের সূচনা হয়েছে। নদী কমে এসেছে সাতশতে। বিপন্নতার ধারাবাহিকতায় নদীর সংখ্যা এখন হয়েছে সাড়ে চারশত। ৫৭টি আন্তর্জাতিক নদী বিপদাপন্ন। নাব্য নিয়ে, দখল-দূষণ নিয়ে, অস্তিত্বের সংকট নিয়ে। দেশি এবং আন্তর্জাতিক পীড়নে দেশের সিংহভাগ নদী এখন মহাসংকটাপন্ন।
দক্ষিণের চিত্রা, কীর্তনখোলা, ভৈরব, রূপসা, কপোতাক্ষ; উত্তরের করোতোয়া, ইছামতি, নারোদ, বড়াল, তিস্তা, সুরমা, ব্রহ্মপুত্র, কংস, সোমেশ্বরী নিজেদের বিপন্নতাকে নিরবচ্ছিন্নভাবে জানান দিয়ে যাচ্ছে। দখলদার ও ভূমিদস্যুদের দুর্দমনীয় প্রতাপে বিলীন হওয়ার বিহ্বলতায় আক্রান্ত দেশের শতাধিক নদনদী। পাবনার ইছামতি, কিশোরগঞ্জের নরসুন্দা, বগুড়ার করতোয়া, শাহজাদপুরের বড়াল, ছোট করতোয়া, নাটোরের নারোদ, তাড়াশের বেহুলা, গাইবান্ধার ঘাঘট, রংপুরের শ্যামাসুন্দরী, নেত্রকোনার সোমেশ্বরী, কুমিল্লার গোমতী, জামালপুরের ব্রহ্মপুত্র বিপন্নতায় বিদিশাগ্রস্ত নদীমাতৃক বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী নদনদী।
মানচিত্র থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার পথে দেশের ঐতিহ্যবাহী নদীগুলোর আহাজারি আমরা শুনতে পাই না। ২০১৯ সালে জুলাই মাসে বহু পথ মাড়িয়ে এ দেশের নদীগুলো জীবন্ত সত্তা হিসেবে আইনি স্বীকৃতি পেয়েছে। নদীর অভিভাবক সৃষ্টি হয়েছে। ভয়ানক দূষণের শিকার দেশের প্রায় সব নদীই নানা প্রকার মানবিক অপকর্ম ও নির্যাতনের শিকার। দেশের অনেক নদীকেই বারবার আদালতের শরণাপন্ন হতে হচ্ছে। পৃথিবীর দেশে দেশে নদীকে আইনি সুরক্ষা দেওয়ার প্রক্রিয়া চালু হয়েছে ২০১৭ সাল থেকে।
বাংলাদেশের নদীগুলোর প্রধান সংকট- দখল, দূষণ, নাব্য সংকট এবং অবৈধভাবে নদীদেহ লুণ্ঠন বালু, মাটি উত্তোলন, প্রবাহের সংকোচন। পৃথিবীর দেশে দেশে সচল নদীর পানি প্রবাহকে পবিত্র প্রবাহ ধরে, মাতৃত্বের সম্মান দিয়ে, দেবতার আসনে বসানোর রীতিপ্রথা প্রচলিত আছে। এ দেশও এই প্রথার বাইরে নয়।
ঢাকার বুড়িগঙ্গা এবং তুরাগ, বালু, চট্টগ্রামের কর্ণফুলী-হালদা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নদী। কর্ণফুলী নদীর আর্থিক গুরুত্ব বিবেচনায় একে অন্যতম প্রধান অর্থকরী নদী বলা হয়। এই নদী আমাদের দেশের অর্থনীতির প্রাণপ্রবাহ এবং বহির্বাণিজ্যের প্রধান মাধ্যম। নদীটির প্রতি উদাসীনতা, অবহেলা, নির্লিপ্ততা আমাদের অপরাধ হিসেবে গণ্য হওয়া উচিত। দূষণে, দখলে, উৎপীড়নে নদীটির বিপদাপন্নতা অবর্ণনীয়। নদীটি আমাদের অভ্যন্তরীণ এবং বহির্বাণিজ্যের শতভাগ সম্পাদন করার প্রধান মাধ্যম। বিগত প্রায় এক দশক যাবৎ মহাখনন বা ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের নামে নদীটির ওপর যে অত্যাচার-উৎপীড়ন চালানো হয়েছে, তা অবর্ণনীয়। নদীটি ব্যবসা ও অর্থনীতি মাধ্যম থেকে নিজেই ব্যবসার উপাদানে পরিণত হয়েছে। লোভাতুর মানুষ এটিকে নিয়ে ব্যবসা করছে। আমাদের নির্লিপ্ততা, প্রশাসনিক অবহেলা, অপেশাদারিত্ব, রাজনৈতিক উদাসীনতা, অদূরদর্শিতা, ভূমিদস্যুদের অপতৎপরতা, শিল্প মালিকদের অসাধুতা নদীটিকে ধারাবাহিকভাবে নির্যাতন করে যাচ্ছে। মেরে ফেলতে চেষ্টা করছে। বিশ্ব নদী দিবসে অত্যন্ত দায়িত্বশীলতার সঙ্গে নদীটির পাশে থাকার প্রত্যয়, প্রতিজ্ঞা আমাদের ভেতর জাগ্রত করতে হবে।
আইনি সত্তা পাওয়া নদীগুলোর আইনি অধিকার এখনও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। দেশে 'রিভারাইন পিপল' নামে একটি নদীবান্ধব বোদ্ধা গ্রুপ ২০১৫ সাল থেকে প্রতি বছর ১৭ আগস্টকে 'নদী অধিকার দিবস' হিসেবে পালন করে আসছে। জাতিসংঘ 'কনভেনশন অন দ্যা ল অব দ্য নন নেভিগেশনাল ইউজেস অব ইন্টারন্যাশনাল ওয়াটার কোর্সেস' বা জাতিসংঘ পানি প্রবাহ সনদ, ১৯৯৭ আন্তঃসীমান্ত বা আন্তর্জাতিক অভিন্ন নদীর একটি বিশ্ব স্বীকৃত রক্ষাকবচ। ১৯৯৭ সালের ২১ মে যখন প্রস্তাব আকারে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ কর্তৃক সনদটি গৃহীত হয়, তখন বাংলাদেশও এর পক্ষে ভোট দিয়েছে। অতঃপর দীর্ঘসময় বাংলাদেশের নির্লিপ্ততা দুঃখজনক, দুর্ভাগ্যজনক, অপরিণামদর্শী।
বাংলাদেশ আন্ত ও আন্তর্জাতিক নদীগুলোর প্রবাহ ক্ষেত্র। উদাসীনতা পরিহার করে আমাদের আইন পরিষদে জাতিসংঘের সনদটিতে অনু সমর্থন দিলে আমাদের নদীগুলো জাতিসংঘ পানি প্রবাহ সনদের আওতায় আন্ত ও আন্তর্জাতিকভাবে সুরক্ষা পাবে। এ সুযোগ গ্রহণ করে আমাদের নদীগুলোকে সংকটমুক্ত করা অত্যন্ত জরুরি। এ ক্ষেত্রে কোনো প্রকার উদাসীনতা কোনোভাবেই কাম্য নয়। যেহেতু আমাদের নদনদীগুলোর চূড়ান্ত উৎস আন্তঃসীমান্ত, তাই এই সনদের সুবিধাপ্রাপ্ত আমাদের নদীগুলো।
বিশ্ব নদী দিবসে আমরা দাবি জানাই, 'জাতিসংঘ পানি প্রবাহ সনদ ১৯৯৭' খুব স্বল্প সময়ে অনুস্বাক্ষরিত হয়ে আমাদের নদীর পানি প্রবাহের রক্ষাকবচ হিসেবে ভূমিকা রাখবে। আমাদের মাতৃসত্তা নদীমাতৃক বাংলাদেশের বিপন্ন নদীগুলো সুরক্ষা পাবে। বিশ্ব নদী দিবসে সর্বসাধারণের পক্ষে একান্ত কামনা এটি।
- বিষয় :
- বিপন্ন নদী
- ড. মুহাম্মদ ইদ্রিস আলী
