বন্যায় আমনের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে করণীয়
আব্দুল হাই রঞ্জু
প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২০ | ০৩:৩৮
কুড়িগ্রামে দফায় দফায় বন্যায় কৃষকের স্বপ্ন চুরমার হয়ে গেছে। চতুর্থ দফা বন্যার পর কৃষক নতুন করে বীজতলা ফেলে ও দূরদূরান্ত থেকে আমনের চারা এনে রোপণ করে স্বপ্ন বুনছিলেন। দুর্ভাগ্য, অতিবৃষ্টি ও উজানের পানির ঢলে পঞ্চমবারের বন্যায় আমনের আবাদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বিশেষ করে কুড়িগ্রামের ধরলা, ব্রহ্মপুত্রের তীরবর্তী এলাকার কৃষকরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন।
বন্যার কারণে উঠতি আমনের জমি পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় এসব জমির লাগানো চারা একেবারেই পচে গেছে। এখন নিজেদের খাবার ও গবাদি পশুর খাবার কীভাবে জোটাবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক পরিবারগুলো। এমন পরিস্থিতিতে যেহেতু আর আমন ধানের চারা লাগানো সম্ভব নয়, সেহেতু নষ্ট হয়ে যাওয়া এসব জমিতে অন্যান্য ফসলের চাষাবাদ করেই চাষিদের ঘুরে দাঁড়াতে হবে। এ জন্য সরকারিভাবে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে বিনামূল্যে বীজ, সারের ব্যবস্থার পাশাপাশি স্বল্প সুদে কৃষি ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে।
এমনিতেই বর্তমানে গো-খাদ্যের বড় সংকট। বিশেষ করে রৌমারী, রাজিবপুর ও চিলমারী উপজেলার মানুষ চড়া দামে ধানের আঁটি (গো-খাদ্য) কিনে গরুকে খাওয়াচ্ছেন। অনেকেই আবার কাঁচা আমন ধান জমি থেকে কেটে গরুকে খাওয়াচ্ছেন। দিনাজপুর অঞ্চল থেকে ট্রাকে ট্রাকে ধানের শুকনা আঁটি এনে কুড়িগ্রামে গো-খাদ্যের চাহিদা পূরণ করা হচ্ছে। আমন ধান নষ্ট হওয়ায় নিকট ভবিষ্যতে গো-খাদ্যের তীব্র সংকট হবে আশঙ্কা করা হচ্ছে। যদিও জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক বলেন, এ বছর পঞ্চম দফার বন্যায় নিম্নাঞ্চলের জমির আমন ধানের ক্ষতি হলেও অবশিষ্ট এলাকায় এবার বাম্পার ফলন হবে। ফলে ঘাটতি পুষিয়ে নেওয়া অনেকাংশেই সম্ভব হবে। তাছাড়া ক্ষতিগ্রস্তদের সরকারি সহায়তা চাওয়া হয়েছে। এ ছাড়া পরিত্যক্ত জমিতে বিকল্প ফসল চাষাবাদেরও পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
জেলা কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, চলতি বছর প্রথম দফার বন্যায় তেমন কোনো ক্ষতি না হলেও দ্বিতীয় ও তৃতীয় দফার বন্যায় জেলায় প্রায় ১৭ হাজার ৫৫৬ হেক্টর জমির ফসল বন্যার পানিতে তলিয়ে যায়। এর মধ্যে আমন বীজতলা ১ হাজার ৪০৯ হেক্টর, আউশ ৫ হাজার ২১৭ হেক্টর, সবজি ৯৫৩ হেক্টর, পাট ৯ হাজার ২৩৫ হেক্টর, তিল ৩০৫ হেক্টর, মরিচ ২০৫ হেক্টর ও চিনা ১৪০ হেক্টর ক্ষতিগ্রস্ত হয়। উল্লেখ্য, দ্বিতীয় ও তৃতীয় এই দুই দফায় ১ লাখ ৩৪ হাজার ৮৫৮ কৃষকের মোট ১৪০ কোটি ৬৭ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। এই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে তৃতীয় দফা বন্যার পর ২৭ হাজার ৭৬১ জন কৃষককে সবজি বীজ, ১০৫টি কমিউনিটি বীজতলা ও শতাধিক ভাসমান বীজতলা এবং ১১২টি ট্রে বীজতলা প্রস্তুত করে বিনামূল্যে আমন চারা বিতরণ করা হয়েছে।
কৃষকরা নতুন উদ্যোগে পুনরায় আমন ধান চাষ শুরু করার দুই সপ্তাহের মধ্যেই ভারি বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে ধরলা নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় আমন আবাদ, মাষকলাই, চিনা বাদাম ও শাকসবজি পানিতে তলিয়ে যায়। কৃষি বিভাগ সূত্রে আরও জানা গেছে, চতুর্থ ও পঞ্চম দফার বন্যায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনও নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি। তবে সেপ্টেম্বরের দুই দফায় ১৯ হাজার ২৩ হেক্টর ফসল বন্যার পানিতে তলিয়ে যায়। উল্লেখ্য, ১৮ হাজার ৮২০ হেক্টর আমনের আবাদ। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ৪ হাজার ২০৫ হেক্টর, উলিপুরে ৯৫০ হেক্টর, চর রাজিবপুরে ৭৫০ হেক্টর, রৌমারীতে ৯৫০ হেক্টর, নাগেশ্বরীতে ৬ হাজার ৫৫ হেক্টর, উলিপুরে ৯৫০ হেক্টর এবং রাজারহাটে ১ হাজার হেক্টর জমির আমন আবাদ বন্যার পানিতে নিমজ্জিত হয়। আর পঞ্চম দফার বন্যায়ও আমন আবাদের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
মূলত কুড়িগ্রাম জেলার অর্থনীতি কৃষিনির্ভর। এ জেলায় শিল্পকলকারখানা বলতে তেমন কিছুই নেই। একমাত্র কৃষি চাষাবাদ ও কৃষি মজুরিই অধিকাংশ মানুষের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। এ বছর দফায় দফায় বন্যার কবলে পড়ে কৃষি চাষাবাদ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় কৃষকের অবস্থা খুবই খারাপ। এর ওপর আবার বৈশ্বিক মহামারি করোনার ছোবলে কুড়িগ্রামের অর্থনীতির নাজুক অবস্থা। বিশেষ করে কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা ও রাজারহাট উপজেলায় ব্যাপকভাবে সবজির চাষাবাদ হয়ে থাকে। এ বছর টানা বর্ষণের কারণে সবজির আবাদ নষ্ট হয়ে যায়।
ফলে অন্যান্য প্রান্ত থেকে সবজি এনে স্থানীয় চাহিদা পূরণ করা হচ্ছে। এ কারণে কুড়িগ্রামে প্রতিটি সবজির আকাশচুম্বী মূল্য। ফলে সাধারণ ভোক্তাদের চড়া মূল্যেই সবজি কিনে খেতে হচ্ছে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত আমন আবাদের পরিত্যক্ত জমিতে অন্যান্য ফসলের চাষাবাদ করতে হবে। যে কারণে স্বল্প সুদে কৃষি ঋণ বিতরণ, বিনামূল্যে বীজ ও সারের সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। কারণ মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে পরিত্যক্ত জমিতে বিভিন্ন জাতের শস্যের চাষাবাদ করে ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পাবে। যেন আগামী সেচ মৌসুমে কৃষক বেশি করে বোরোর চাষাবাদ করতে পারে। একমাত্র দেশীয়ভাবে খাদ্যশস্য উৎপাদন বৃদ্ধি করেই বৃহৎ জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, যার কোনো বিকল্প নেই।
- বিষয় :
- চতুরঙ্গ
- আব্দুল হাই রঞ্জু