ধূসর আকাশের নক্ষত্র
নজরুল ইসলাম বাসন
প্রকাশ: ১৯ ডিসেম্বর ২০২০ | ০৫:১৫
কয়েকদিন আগে খুব ঘনিষ্ঠ এক বয়স্ক ভদ্রলোকের সঙ্গে ফোনে আলাপ হচ্ছিল, তিনি প্রথম প্রজন্মের লন্ডনি, দেশে-বিদেশের বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একজন ধনাঢ্য দানবীর, সেলিব্রেটি হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন। তার প্রচুর ধনসম্পদ, ঐশ্চর্য, দান-খয়রাতের জন্য বিখ্যাত এই ভদ্রলোকের আশপাশে প্রচুর লোক থাকত। লেখক, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক নেতাদের উপচেপড়া ভিড় থাকত তার বাংলোয়। তার গাড়িবহর যখন ছুটত বিভিন্ন অনুষ্ঠানে- লেখক, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক নেতাদের জন্যে বিভিন্ন গাড়ি বরাদ্দ করা থাকত। এই সেদিনও তিনি রাজার মতো চলাফেরা করতেন। এখন বয়সের ভারে নুইয়ে পড়েছেন। সিলেটের সেই অশতিপর মানুষটি আমার ফোন ধরে দুঃখ করে বললেন, যাক তুমি না হয় ফোন করে খবর নিছস, বুড়ো হয়ে গেছি। এখন আর কেউ খবর নেয় না। এ সময়ে এ রকমই হয়, হবে। এটাই মেনে নিয়েছেন হয়তো।
লন্ডনের বিখ্যাত গায়ক হিমাংশু গোস্বামীও সেদিন ফোন করে বললেন, মাঝেমধ্যে খবর লইওরে বা, কোন দিন মরি যাইমু। হিমাংশুদার মতো গায়করা এক সময়ের সেলিব্রেটিরা নক্ষত্রের মতো আলো ছড়িয়েছেন। বয়স হয়ে গেছে, আজ আর তাদের খবর কেউ রাখে না। শুধু সেলিব্রেটিরা নন, সাধারণ ৬০ প্লাস মানুষের জীবনের একাকীত্বও এর চাইতে কিছু ভিন্ন নয়। যারা সাধারণ মানুষ তারাও নিঃসঙ্গতায় ভুগছেন। এই নিঃসঙ্গ মানুষগুলোর জীবন এক সময় হাসি গানে আনন্দে পরিপূর্ণ ছিল। বয়সের কারণে তাদের পরিবার, বন্ধুবান্ধব থেকে আলাদা করে দিয়েছে। এক সময় আসবে তখন দেখা যাবে এ ধরনের মানুষগুলো ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। দেশে থাকার সময় যাদের চিনতাম জানতাম তাদের অনেকেই আজ আর বেঁচে নেই, হারিয়ে গেছেন। এখন আমি লন্ডনের পপলার স্টেপনি এলাকায় বসবাস করেছি ৩৫ বছর ধরে। এই এলাকার প্রবীণ লোক অনেকেই এখন বেঁচে নেই। গত ৩৫ বছরে লন্ডনের অনেকের সঙ্গে পরিচয় ও জানাশোনা হয়েছিল, তারাও অনেকে এই নশ্বর পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। ষাটোর্ধ্ব যারা আছেন তারাও ভালো নেই। তাদের কারও ঠিকানা হয়েছে ডে কেয়ার সেন্টার বা কেয়ারার্স হোম। বাংলাদেশে যাকে বলা হয় বৃদ্ধাশ্রম।
বর্তমান সময়ে মোবাইল ও ইন্টারনেট, সোশ্যাল মিডিয়া কাছের মানুষকে করেছে দূর, আর দূরের মানুষকে এনে দিয়েছে মুঠোর ভেতরে। ভার্চুয়াল ওয়ার্ল্ড আমাদের জীবনে আমূল পরিবর্তন এনে দিয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়াতে কয়েক হাজার মাইল দূরের খবর আপনি নিমেষেই পেয়ে যাবেন। কেউ যদি আপনাকে না জানায় তাহলে পাশের বাড়ির কেউ মারা গেলেও আপনি জানতে পারবেন না। কয়েকদিন আগে দেখলাম আমার ফ্ল্যাটের নিচে কফিনবাহী কালো গাড়ির ভেতরে সাদা ফুল দিয়ে সুশোভিত করে লেখা ড্যাড। কারও বাবা মারা গেছেন। সন্ধ্যার সময় যখন হাঁটতে বেরিয়েছি তখন এক প্রতিবেশীকে জিজ্ঞাসা করলাম, আমাদের বিল্ডিং-এ আজ কে মারা গেলেন? হায়রে প্রতিবেশী আমরা জানলামও না শববাহী শকট কার লাশ নিতে এসেছে? কারও কাছ থেকে জানতে হবে কার লাশ আজ এই বিল্ডিং থেকে নেওয়া হচ্ছে?
আমাদের বিল্ডিং-এর এক প্রতিবেশী মা-বাপ হারানো যুবক ড্যানি। এই বিল্ডিংয়ে তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা। পাড়ার প্রায় সবাইকে চেনে এবং সবার সঙ্গে হাই হ্যালো করে। ড্যানিকে পেয়ে গেলাম তার ফ্ল্যাটের বারান্দায়। তাকে জিজ্ঞেস করলাম- ড্যানি আমাদের বিল্ডিংয়ের কে মারা গেল জানো? ড্যানি বলল- তোমাদের ব্লকের জন মারা গিয়েছিল। তার শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে কেউ আসেনি, আমি আর আমার বোন জনকে শেষ বিদায় জানালাম। আমার প্রতিবেশী অথচ আমি তার মুখ ঠিক মনে করতে পারলাম না। আমাদের ব্লকে ৩২টি ফ্ল্যাটে আমরা কেউ কেউ দশ-বিশ বছর ধরে বসবাস করছি। কারও সঙ্গে কারও সম্পর্ক নেই। প্রতিবেশী যারা বুড়ো হয়ে যাচ্ছেন তারা ঘরেই থাকেন বেশিরভাগ সময়। এক সময় মারা গেলে কালো কফিনবাহী গাড়ি এসে নিয়ে যায়। কেউ কারও খবর রাখে না।
আরেক ধরনের কাহিনি আছে। বাবা বা মা মারা গেলে দাফনের কিংবা বিদেশে বলা হয় ফিউনারেল খরচ নিয়ে ছেলেমেয়েদের ঝগড়াও হয়ে থাকে। সচ্ছল বাবা হয়তো জীবিতকালে ছেলেমেয়েদের মাঝে সম্পত্তি ভাগবাটোয়ারা করে দিয়েছেন। কোনো ছেলে হয়তো বেশি বাগিয়ে নিয়েছে, কোনো ছেলে হয়তো কম পেয়েছেন। মেয়ে হয়তো পাননি। তখনই ফিউনারেলের খরচ নিয়ে ঝগড়া শুরু হয়। একে অন্যকে বলেন, বাবা তোমাকে বেশি দিয়েছে, কাজেই তুমি ফিউনারেলের খরচ বহন কর। অন্যজন বলে তোমাকে বাবা বেশি দিয়ে গেছে, তুমি খরচ বহন কর। এতো গেল লাশ দাফনের খরচের কথা। কোনো সময় দেখা যায়, বাবা বা মা হাসপাতালে মারা গেছেন ছেলে বা মেয়ে দূরের কোনো শহরে বা বিদেশ থাকে। তাদের তখন ফিউনারেলে আসাও হয়ে ওঠে না। এমনকি অন্য শহরে থাকলেও অনেকে ফিউনারেলে না এসেও বাবা-মার শেষকৃত্য অনুষ্ঠান করিয়ে ফেলেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছু বদলে গেছে। কোনো কোনো পরিবারে বাবা-মা বৃদ্ধ হয়ে গেলে তাকে দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেখানেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
যারা চলে গেছেন তাদের দিন ফুরিয়েছে। যারা বেঁচে আছেন তাদের রয়েছে সীমাহীন কষ্ট। শুধু পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে নয়, বাংলাদেশেও এখন প্রবীণদের উজ্জ্বল আকাশ ক্রমশ ধূসর হয়ে উঠছে। বৃদ্ধাশ্রমগুলোতে অনেককে ঠাঁই নিতে হচ্ছে। বৃদ্ধাশ্রমে যারা ঠাঁই নিচ্ছেন হয়তো তাদের স্বামী মারা গেছেন, এখন তাকে দেখাশোনা করার কেউ নেই বা কারও স্ত্রী মারা গেছেন বৃদ্ধকে দেখাশোনা করার কেউ নেই। একজন বৃদ্ধ লোক যখন একা হয়ে যান তখন তাকে দেখাশোনার কেউ থাকে না। যারা বৃদ্ধ হয়ে যান তাদের কারও কারও মাবাবা, ভাইবোনও মারা যায়। বন্ধুবান্ধবও মারা যায়। তাই বয়স্ক লোকদের দেখাশোনা করার কেউ থাকে না।
আমি গত ৫ বছর ধরে অবসরে আছি। আমার বয়স এখন ষাটের বেশি। কয়েকদিন আগে আমাদের একটা হোয়াটসঅ্যাপস গ্রুপে একজন একটা পোস্ট শেয়ার করেছিলেন- মানুষের বয়স যখন ৬০ হয়ে যায় সমাজে সে তখন অপাঙ্ক্তেয় হয়ে পড়ে। এ নিয়ে জো ডাপিন নামের চীনের একজন লেখক দ্য স্কাই গেটস ডার্ক সৌলিম্ব নামে একটি উপন্যাস লিখেছেন। বইটি প্রকাশিত হবার আগেই মাও ডান সাহিত্য পুরস্কার পেয়ে গেছে উপন্যাসটি। গুগল ঘেঁটে এই উপন্যাসটি সম্পর্কে বেশি কিছু তথ্য পাইনি। তবে যা পেয়েছি তা খুব ইন্টারেস্টিং। কিছু তথ্য পেয়েছি, আমার মতো যারা ষাটোর্ধ্ব তাদের সঙ্গে অভিজ্ঞতা শেয়ার করার জন্য এই লেখা।
বিশ্বে এখন ৬০ বছর বয়সী মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। ধীরে ধীরে তাদের আকাশের আলো নিভে গিয়ে অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে। এখন কিছু কিছু বিব্রতকর ও অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে বৃদ্ধদের। পুরুষ বা নারী যেই হোন না কেন ষাটোর্ধ্ব সকলের জন্যেই উজ্জ্বল আকাশ এখন ধূসর রং ধারণ করবে। প্রস্তুতি নিয়ে এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে। পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলতে হবে।
- বিষয় :
- চতুরঙ্গ
- নজরুল ইসলাম বাসন
