ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বিশেষ লেখা

জলাভূমি রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের

জলাভূমি রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের
×

ড. আইনুন নিশাত

প্রকাশ: ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২১ | ১২:০০ | আপডেট: ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২১ | ১৬:১৩

জলাভূমির গুরুত্ব নিয়ে বিশ্বব্যাপীই ভাবনা-চিন্তা বেড়েছে। পৃথিবী থেকে বিভিন্ন কারণে হারিয়ে যাচ্ছে প্রাকৃতিক সম্পদ। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, পৃথিবীতে যে হারে বন ধ্বংস হচ্ছে, তার থেকেও অনেক দ্রুত হারে জলাভূমি হারিয়ে যাচ্ছে। গত দুই-তিনশ বছরে পৃথিবীর জলাভূমির ৯০ শতাংশ হারিয়ে গেছে।

সবার টনক নড়ছে; কারণ জলাভূমি পৃথিবীতে নানা ধরনের 'ফ্রি সার্ভিস' দিয়ে থাকে। জলাভূমি প্রাকৃতিক দুর্যোগে কাজ করে, বন্যার সময় পানি ধরে রেখে ভাটিতে বন্যার প্রকোপ কমায়। আমাদের দেশে নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া অঞ্চলে যে বিস্তীর্ণ জলাভূমি আছে, সেগুলো না থাকলে দেশের অন্যত্র প্রচণ্ড বন্যা হতে পারত। একইভাবে চলনবিল রাজশাহী-বগুড়া অঞ্চলকে মারাত্মক বন্যার হাত থেকে রক্ষা করে। অনেক ক্ষেত্রে আমরা গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি সম্পর্কে অবহিতই নই। যেমন- বিক্রমপুর এলাকার আড়িয়ল বিল একশ বছর আগে গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি ছিল। সেটা সংকীর্ণ হতে হতে এখন মুন্সীগঞ্জে অল্প কিছু অংশ নিয়ে অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। বরিশাল, ঝালকাঠি, পিরোজপুর কিংবা বাগেরহাট অঞ্চলে বিস্তীর্ণ জলাভূমি ছিল।

বিশ্বব্যাপী জলাভূমি রক্ষা করার জন্য আন্দোলন গড়ে উঠেছে। এ কারণে প্রতিবছর ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে বিশ্ব জলাভূমি দিবস পালন করে পৃথিবীকে মনে করিয়ে দেওয়া হচ্ছে- জলাভূমি রক্ষা করা উচিত। এগুলো মানুষকে খাদ্য উৎপাদনে সহায়তা করে, সেচের পানি সরবরাহ করে, বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ও জলজ প্রাণী এই জলাভূমিতে জীবন ধারণ করতে পারে। জলাভূমির সঠিক ব্যবস্থাপনার তাগিদ আরও বেড়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে এর সম্পর্ক অনুধাবন করে। জলাভূমি বোধ হয় যে কোনো প্রতিবেশ ব্যবস্থার মধ্যে সবচেয়ে বেশি কার্বন ধরে রাখতে পারে। বহু দেশে জলাভূমিতে পিট কয়লার আধার রয়েছে। আমাদের দেশেও মাদারীপুর, শরীয়তপুর, ফরিদপুর ও গোপালগঞ্জ অঞ্চলে প্রচুর 'পিটসয়েল' রয়েছে। এই পিটসয়েল যতক্ষণ জলাভূমিতে থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত কার্বন ধরে রাখা যাবে।

১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ইরানের রামসার শহরে গৃহীত আন্তর্জাতিক সনদে জলাভূমির যে সংজ্ঞা দেওয়া হয়, সেটাই এখন সর্বজনীন। এতে বলা হয়েছে, স্থায়ী বা অস্থায়ী, বদ্ধ কিংবা বহমান, নোনা অথবা মিষ্টি- যে কোনো জলাধারই হচ্ছে জলাভূমি। যে কারণে আমাদের নদীগুলোও জলাভূমি, সুন্দরবনও জলাভূমি। বস্তুত বাংলাদেশে প্রথম যে জলাভূমিকে বিশ্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল, সেটি সুন্দরবন। একই সঙ্গে উপকূল অঞ্চলে ভাটার সময় ছয় মিটার গভীর পর্যন্ত পানি থাকে এমন ভূমিকেও জলাভূমি হিসেবে ধরা হয়। আমাদের দেশজুড়েই রয়েছে জলাভূমির বিস্তার।

ঢাকা শহরের পূর্ব, পশ্চিম কিংবা দক্ষিণ দিকেও বিস্তীর্ণ এলাকা জলাভূমি ছিল। এগুলো ভরাট করে আমরা আবাসস্থল বানিয়েছি। ঢাকা শহরের পূর্ব দিকে গেলে এখনও বিস্তীর্ণ জলাভূমি দেখা যাবে। কিন্তু ভয় হচ্ছে, এখন থেকে ১০-১৫ বছরের মধ্যেই এগুলো ভরাট করে নাগরিক আবাসন বানানো হবে।

১৯৭২ সালের রামসার সনদের উদ্দেশ্য হলো, সদস্য দেশগুলোর অভ্যন্তরে গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমিগুলো বিশেষত, পরিযায়ী পাখি ও মাছের প্রজনন কেন্দ্রগুলো 'রামসার সাইট' ঘোষণা করা। তাহলে সমগ্র বিশ্ব এসব জলাভূমি রক্ষণাবেক্ষণে সহযোগিতা করবে। এমনকি যদি একটি জলাভূমি দুই বা ততোধিক দেশের মধ্যে বিস্তৃত হয়, তাহলে আন্তর্জাতিকভাবে সেখানে সহযোগিতামূলক পদক্ষেপ নেওয়াও রামসার কনভেনশনের উদ্দেশ্য।

প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে আমাদের বেশ কিছু যৌথ জলাভূমি রয়েছে। এর মধ্যে সুন্দরবনের প্রতিবেশসম্মত ব্যবস্থাপনার জন্য বাংলাদেশ ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী উদ্যোগী হয়েছেন। তবে আমরা খুব বেশি এগোতে পারিনি। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, যদি আগামী ২৬ মার্চ ভারতের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে আসেন এবং দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা হয়, তাহলে অবশ্যই সুন্দরবন ব্যবস্থাপনার বিষয়টি আলোচ্যসূচিতে থাকবে। আমাদের উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বাড়ছে। যে কারণে সামুদ্রিক প্রতিবেশ ক্রমান্বয়ে ভূমির কাছাকাছি আসছে। এ কারণে আমরা দেখতে পাচ্ছি, ডলফিনের সংখ্যা বাড়ছে।

হাওরাঞ্চলের সাতটি জেলাসহ দেশের ভেতরে যেসব হাওর-বাঁওড় ও বিল আছে, সবই জলাভূমির অন্তর্ভুক্ত। একসময় এগুলো মৎস্যসম্পদে ভরা ছিল। আমাদের দেশে একসময় আড়াইশর বেশি প্রজাতির মিঠাপানির মাছ ছিল। সেগুলোর বহু প্রজাতি হারিয়ে গেছে। কারণ, জলাভূমিগুলোর গুণগত মান ও আয়তন কমে যাচ্ছে। পরিবেশদূষণ ও ভরাটের কারণে মাছের উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে। আমাদের দেশে কৃত্রিম জলাশয়ের মধ্যে রয়েছে পুকুর ও দিঘি। কিছু দিঘি 'সাগর' নামেও অভিহিত। যেমন- রামসাগর, নীলসাগর প্রভৃতি। এগুলো হয়তো খাবার পানি সংগ্রহের জন্য তৈরি করা হয়েছিল; কিন্তু আজকে সেগুলো গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমিতে পরিণত। যেমন- কাপ্তাই লেক একটি জলাশয় এবং মৎস্যসম্পদের বিরাট আধার। এসব বদ্ধ জলাভূমিতে প্রাকৃতিকভাবে মৎস্যসম্পদ রক্ষা করা যেতে পারে। প্রাকৃতিক জলাভূমির গুণগত মান রক্ষা করা যেমন প্রয়োজন, তেমনি কৃত্রিমভাবে তৈরি জলাশয়গুলো রক্ষায়ও সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

আমাদের দেশে এখনও যেসব জলাভূমি টিকে রয়েছে, সেগুলো রক্ষায় আর দেরি করা যাবে না। মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্রের দায়িত্ব জলাভূমি রক্ষা করা। ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে যে ১৮(ক) ধারা সংযোজন করা হয়েছে, সেখানে বলা হয়েছে- রাষ্ট্র এখন থেকে দেশের গুরুত্বপূর্ণ জীববৈচিত্র্যপূর্ণ এলাকাগুলো, বনভূমি, জলাভূমি ইত্যাদি রক্ষা করবে। অর্থাৎ জলাভূমি রক্ষার দায়িত্ব ১০ বছর হলো আমরা সাংবিধানিকভাবে গ্রহণ করেছি। আর যদি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা পেতে চাই, তাহলে আরও বেশি জলাভূমি ঘোষণা করা উচিত। সেইসঙ্গে স্থানীয় জনসাধারণের সহযোগিতামূলক কার্যক্রম হাতে নিয়ে জলাভূমিকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে উদ্যোগী হতে পারি। জলাভূমি ঠিকমতো রক্ষণাবেক্ষণ করা গেলে জলাবদ্ধতা বহুলাংশে কমে আসবে। গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমিগুলোকে কেন্দ্র করে উপযুক্ত পর্যটন ব্যবস্থাও গ্রহণ করা যেতে পারে। এতে যেমন মূল্যবান জলাভূমি রক্ষা পাবে, তেমনই উন্নত হতে পারে জীববৈচিত্র্য। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলাও সহজ হবে।

লেখক: পরিবেশ বিশেষজ্ঞ; ইমেরিটাস অধ্যাপক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×