ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ঘুমে পায়ের অস্থিরতা, কারণ ও সমাধান

ঘুমে পায়ের অস্থিরতা, কারণ ও সমাধান
×

ডা. মো. আসাদুর রহমান

প্রকাশ: ০৩ মার্চ ২০২৬ | ০৭:১৪ | আপডেট: ০৩ মার্চ ২০২৬ | ১২:২১

| প্রিন্ট সংস্করণ

ঘুম মানুষের জীবনের এক অপরিহার্য শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া। গবেষণায় দেখা গেছে, একজন মানুষ খাবার ছাড়া দীর্ঘসময় টিকে থাকতে পারলেও, টানা ১৭ দিনের বেশি ঘুমহীন থাকা প্রায় অসম্ভব। ভালো ঘুমের অভাব কেবল ব্যক্তিগত ক্লান্তি নয়, বরং সামাজিক ও পেশাগত জীবনকেও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

অনেক সময় আমরা মনে করি নাক ডেকে ঘুমানো মানেই গভীর ঘুম, কিন্তু চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতে, নাক ডাকা বা মুখ হাঁ করে ঘুমানো কখনোই সুস্থ ঘুমের লক্ষণ নয়। একইভাবে, ঘুমের মধ্যে হাত-পায়ের অতিরিক্ত নড়াচড়া বা অস্থিরতা একটি বিশেষ স্বাস্থ্য সমস্যাকে নির্দেশ করে, যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় ‘রেস্টলেস লেগস সিনড্রোম’ (Restless Legs Syndrome বা RLS) বলা হয়।

লক্ষণ ও অনুভূতি
ঘুমে পায়ের অস্থিরতা বা আরএলএস (RLS) হলে পায়ে এক ধরনের অস্বস্তিকর অনুভূতি তৈরি হয়, যা রোগীকে পা নাড়াতে বাধ্য করে। রোগীরা সাধারণত এই অনুভূতিকে বর্ণনা করেন এভাবে:

l পায়ের ভেতরে কিছু একটা কামড়ানোর বা হামাগুড়ি দেওয়ার মতো অনুভূতি।

l পায়ে অবশ ভাব বা এক ধরনের টানটান উত্তেজনা।

l পা চুলকানো বা অস্থিরতা; যা কেবল পা নাড়ালে বা হাঁটাহাঁটি করলে সাময়িকভাবে কমে।

এই সমস্যাটি সাধারণত বিশ্রামের সময় বা রাতে বিছানায় শুতে গেলে প্রকট আকার ধারণ করে। ফলে রোগী দীর্ঘ সময় ঘুমাতে পারেন না এবং বারবার তার ঘুম ভেঙে যায়।

আক্রান্তের হার ও ঝুঁকির কারণ
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ৫ থেকে ১০ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক এবং ২ থেকে ৪ শতাংশ শিশু এই সমস্যায় ভোগে। পুরুষের তুলনায় নারীর মধ্যে এই রোগের প্রকোপ বেশি দেখা যায়। যদিও এটি যে কোনো বয়সে হতে পারে, তবে মধ্যবয়সী বা প্রবীণদের ক্ষেত্রে লক্ষণগুলো বেশি গুরুতর হয়।
এই রোগের সুনির্দিষ্ট কারণ এখনও পুরোপুরি উদঘাটিত না হলেও চিকিৎসকরা কিছু প্রভাবক চিহ্নিত করেছেন:

l বংশগতি: মা-বাবা বা নিকটাত্মীয়ের এই সমস্যা থাকলে সন্তানদের মধ্যেও এটি হওয়ার উচ্চ ঝুঁকি থাকে।

l পুষ্টির অভাব: শরীরে আয়রন বা লোহা এবং ভিটামিন বি-১২ এর ঘাটতি থাকলে পায়ের এই অস্থিরতা বাড়তে পারে।

রাসায়নিক ভারসাম্যহীনতা:

মস্তিষ্কের ডোপামিন নামক রাসায়নিকের ভারসাম্য নষ্ট হওয়া এই রোগের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

l জীবনযাত্রা ও ওষুধ: অতিরিক্ত ক্যাফেইন (চা-কফি), অ্যালকোহল, ধূমপান এবং কিছু নির্দিষ্ট ওষুধ (যেমন: বমির ওষুধ, সর্দি-কাশির ওষুধ বা মানসিক রোগের ওষুধ) এই সমস্যাকে তীব্রতর করে তোলে।

দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব
রাতে সঠিক মাত্রায় গভীর ঘুম না হলে শরীর ও মনের ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এর ফলে:

l রক্তচাপ বৃদ্ধি এবং হৃদরোগের ঝুঁকি তৈরি হয়।

l  ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

l  স্মরণশক্তি হ্রাস পায় এবং মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়।

l  শিশুদের ক্ষেত্রে এটি মনোযোগের অভাব এবং বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়ার কারণ হতে পারে।

l দিনের বেলা অতিরিক্ত ঘুম ঘুম ভাব কর্মদক্ষতা কমিয়ে দেয় এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়।

প্রতিকার ও জীবনযাত্রায় পরিবর্তন
ওষুধের পাশাপাশি কিছু নিয়ম বা ‘স্লিপ হাইজিন’ মেনে চললে এই অস্থিরতা অনেকটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

ঘুমের পরিবেশ: শোবার ঘর অন্ধকার, শান্ত এবং সহনীয় তাপমাত্রায় রাখতে হবে। ঘুমের আগে মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ বা টেলিভিশন দেখা থেকে বিরত থাকা জরুরি। কারণ এসব যন্ত্রের নীল আলো ঘুমের হরমোন ‘মেলাটোনিন’ উৎপাদনে বাধা দেয়।

রুটিন মেনে চলা: প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস করতে হবে। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য অন্তত ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা গভীর ঘুম আবশ্যক।

খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন: বিকেলের পর চা, কফি বা তামাকজাত দ্রব্য বর্জন করতে হবে। রাতের খাবার ঘুমানোর অন্তত দুই ঘণ্টা আগে শেষ করা ভালো।

ব্যায়াম ও ম্যাসাজ: নিয়মিত হালকা ব্যায়াম পেশির টান কমাতে সাহায্য করে। ঘুমানোর আগে কুসুম গরম পানিতে গোসল বা পায়ে হালকা ম্যাসাজ রক্ত সঞ্চালন বাড়িয়ে আরাম দেয়।

প্রয়োজনীয় পরীক্ষা: চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী রক্তে আয়রনের মাত্রা পরীক্ষা করে প্রয়োজনে সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা যেতে পারে।

[লেখক: বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক]

আরও পড়ুন

×