রোজায় কিডনি রোগীদের জন্য পরামর্শ
ডা. গোলাম ফয়সাল
প্রকাশ: ০৩ মার্চ ২০২৬ | ০৭:১৬ | আপডেট: ০৩ মার্চ ২০২৬ | ১১:১৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
রমজান মাস আত্মসংযম, ধৈর্য্য ও পরিমিতিবোধের মাস। এই পবিত্র মাসে দীর্ঘ সময় রোজা রাখার পর পর্যাপ্ত পানি পান না করার কারণে শরীরে পানির ঘাটতি তৈরি হতে পারে, যা কিডনির ওপর খারাপ প্রভাব ফেলতে পারে। তবে যদি সঠিক খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত পানি পান করা এবং কিছু সতর্কতা মেনে চলা যায়, তবে রোজার মধ্যেও কিডনির সুরক্ষা বজায় রাখা সম্ভব।
রোজায় কিডনি ভালো রাখতে খাদ্য নির্বাচন
রমজানে সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন হয় আমাদের খাদ্যাভাসে। ইফতারিতে হরেক রকম বাহারি খাবার থাকে, যার বেশির ভাগই ভাজাপোড়া, অতিরিক্ত লবণ ও তৈলযুক্ত এবং অস্বাস্থ্যকর উপাদানে তৈরি। ইফতার ও সাহ্রিতে এমন খাবার নির্বাচন করা উচিত; যা শরীরে দীর্ঘসময় ধরে শক্তির জোগান দেয় এবং পানিশন্যতা কমায়। সেজন্য শাকসবজি, ফলমূল এবং পুষ্টিকর খাবার স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। পরিমিত প্রোটিন (মাছ, মুরগি, ডিম, ডাল ইত্যাদি) গ্রহণ করা ভালো। বিশেষ করে পানিযুক্ত ফল ও সবজি যেমন তরমুজ, ডাব, শসা, পেঁপে ইত্যাদি পানিশূন্যতা কমাতে অত্যন্ত সহায়ক। অতিরিক্ত লবণ ও তেল, ফাস্টফুড, প্রসেসড খাবার, কোমল পানীয় ও অতিরিক্ত মিষ্টি খাবার এড়িয়ে চলা উচিত। এগুলো কিডনির ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ সৃষ্টি করে। ফাস্ট ফুড, প্রসেসড খাবার এবং বাইরের তৈরি ইফতারিতে অনেক বেশি কেমিক্যাল, ক্ষতিকারক হেভি মেটাল, ক্ষতিকর রং এবং মাত্রাতিরিক্ত লবণে পরিপূর্ণ থাকে। এগুলো কিডনির ফিল্টারকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, কিডনির স্বাভাবিক রক্তপ্রবাহকে বাধা দেয় এবং উচ্চ রক্তচাপের আক্রান্তের হার বাড়ায়।
ইফতার থেকে সাহ্রি পর্যন্ত পানি পানের পদ্ধতি
সাধারণত সুস্থ মানুষের জন্য ২৪ ঘণ্টায় ২ লিটার থেকে আড়াই লিটার পানি পান করা যথেষ্ট। তবে শরীরের ওজন, গরম আবহাওয়া বা শারীরিক পরিশ্রম বেশি হলে যাতে অনেক ঘাম হয়, সেক্ষেত্রে আরও কিছুটা বাড়তি পানি পান করা যেতে পারে। সারাদিন রোজার পরে একবারে অনেক পানি না খেয়ে, কিছুক্ষণ পর পর পানি পান করাই উত্তম। উদাহরণস্বরূপ, একটি সহজ নিয়ম হতে পারে যে, ইফতারির সময় ২৫০ মিলিলিটার গ্লাসের ১ থেকে ২ গ্লাস পানি, ইফতারির ১ ঘণ্টা পর ১ থেকে ২ গ্লাস পানি, রাতের খাবারের পর ১ থেকে ২ গ্লাস পানি, ঘুমানোর আগে ১ গ্লাস পানি, সাহ্রির সময় ১ থেকে ২ গ্লাস পানি। এভাবে পানি পান করে পানিশূন্যতা বা ডিহাইড্রেশন এড়ানো সম্ভব। পানি পান প্রয়োজনের তুলনায় কম হওয়াতে এ সময়ে প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া, গাড় রং-এর প্রস্রাব, প্রস্রাবে ইনফেকশন, জ্বর এবং কিডনিতে পাথরজনিত সমস্যায় অনেকেই আক্রান্ত হয়ে পড়ছেন।
আমরা সহজভাবে রোগীদের বলি যে, আপনার নিজের প্রসাবের রং খেয়াল করুন। স্বাভাবিক না হয়ে যদি গাঢ় হলুদ বা লালচে হয়ে যায় এবং সঙ্গে উপরে উল্লিখিত যে কোনো লক্ষণ দেখা দেয়, তার মানে পর্যাপ্ত পানি পান করা হয়নি। সঠিক পরিমাণে নিরাপদ পানি পান করলে কিডনিজনিত অনেক রোগ প্রতিরোধ করা যেতে পারে। তবে, সতর্কতার সঙ্গে খেয়াল করতে হবে যে, যে কোনো সমস্যায় অবস্থার উন্নতি না হলে দেরি না করে কিডনি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বা নেফ্রোলজিস্ট-এর পরামর্শ নিতে হবে।
রোজায় কিডনি সুরক্ষায় উপকারী অভ্যাস
ইফতার থেকে সাহ্রি পর্যন্ত অল্প অল্প করে বারবার পানি পান করুন। অতিরিক্ত রোদে বা গরমে ভারী কাজ এড়িয়ে চলুন। নিয়মিত প্রস্রাবের রং লক্ষ্য করুন এবং রং স্বাভাবিক না হলে বেশি পানি পান করুন। পর্যাপ্ত বিশ্রাম, ঘুম ও হালকা ব্যায়াম বজায় রাখুন এবং ধূমপান বর্জন করুন। ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় (চা/কফি) সীমিত রাখুন, কারণ এতে পানিশূন্যতা বেড়ে যায়। ইফতার ও সাহ্রিতে স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ করুন। অতিরিক্ত সাদা চিনি, মিষ্টিজাতীয় খাবার ও খাবারে বাড়তি লবণ খাবেন না।
যে সব ক্ষেত্রে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন
শরীরে কিছু সাধারণ লক্ষণ, যেমন–প্রস্রাব কমে যাওয়া, পা বা মখু ফুলে যাওয়া, জ্বর, তলপেটে বা কোমরে ব্যথা, প্রস্রাবের রং গাড় হলদু বা লালচে হওয়া, মাথা ঘোরা বা অতিরিক্ত দুর্বলতা, বমি, শ্বাসকষ্ট, রক্তচাপ বেশি বা কম ইত্যাদি লক্ষণগুলো দেখা দিলে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। বিশেষ করে যারা দীর্ঘদিন ধরে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ এবং কিডনিজনিত জটিল রোগে ভুগছেন, তারা এই লক্ষণগুলো অত্যন্ত সতর্কভাবে খেয়াল করবেন।
রোজা শরীর ও মনের জন্য উপকারী হলেও আপনার সুস্বাস্থ্য ও কিডনির সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সচেতন থাকুন, সুস্থ থাকুন, পবিত্র রমজান হোক সবার জন্য নিরাপদ ও প্রশান্তিময়।
[কনসালট্যান্ট (নেফ্রোলজি),
কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতাল, রাজারবাগ, ঢাকা]
