সোরিয়াটিক আর্থ্রাইটিসের লক্ষণ ও কারণ
ডা. ফারজানা সুমি
প্রকাশ: ১২ মে ২০২৬ | ০৭:০০
| প্রিন্ট সংস্করণ
সোরিয়াটিক আর্থ্রাইটিস একটি দীর্ঘমেয়াদি রোগ, যা ত্বক ও জয়েন্ট উভয়কেই প্রভাবিত করে। এটি মূলত সোরিয়াসিস বা একধরনের ত্বকের সমস্যা এবং জয়েন্টে ব্যথা ও ফোলাজনিত সমস্যার সঙ্গে সম্পৃক্ত। সোরিয়াসিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে প্রায় ২০-৩০ শতাংশের ক্ষেত্রে জীবনের এক পর্যায়ে সোরিয়াটিক আর্থ্রাইটিস দেখা দিতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে আবার ত্বকের লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার আগেই জয়েন্টের সমস্যা শুরু হতে পারে।
এই রোগে শরীরের রোগ-প্রতিরোধ ব্যবস্থা সঠিক নিয়মে কাজ করে না এবং ত্বক, জয়েন্ট, টেন্ডন, আবার কখনও কখনও মেরুদণ্ডে ব্যথা বা ফোলাভাব সৃষ্টি হয়। সময়মতো চিকিৎসা না নিলে এটি স্থায়ীভাবে জয়েন্টের ক্ষতির কারণ হয়ে ওঠে এবং দৈনন্দিন চলাফেরাতেও ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। সোরিয়াটিক আর্থ্রাইটিসের সাধারণ লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে জয়েন্টে ব্যথা ও ফোলা। বিশেষ করে সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর শক্তভাব অনুভূত হওয়া, যা সাধারণত ৩০ মিনিট বা তার বেশি স্থায়ী হতে পারে। অনেক সময় মেরুদণ্ডও আক্রান্ত হয়। ফলে ঝুঁকে থাকা বা চলাফেরা করা কঠিন হয়ে যায়। ত্বকে লালচে, খসখসে দাগ এবং নখে ছোট গর্ত বা ভেঙে যাওয়ার মতো পরিবর্তনও দেখা দিতে পারে। কিছু রোগীর ক্ষেত্রে হাত-পায়ের আঙুল ফুলে যেতে পারে; যা দেখতে অনেকটা ‘সসেজ’-এর মতো হয়ে যায়। একে মেডিকেলের ভাষায় ড্যাকটাইলাইটিস বলা হয়। এ ছাড়া টেন্ডন যেখানে হাড়ের সঙ্গে যুক্ত থাকে (গোড়ালি, কনুই) সেসব স্থানে ব্যথা হতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার কারণে অনেক রোগী অস্বাভাবিক ক্লান্তিও অনুভব করেন এবং কিছু ক্ষেত্রে চোখে ব্যথা বা লালভাব দেখা দিতে পারে। যাদের সোরিয়াসিস রয়েছে, তাদের মধ্যে এই রোগ হওয়ার ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি, বিশেষ করে যদি পরিবারের কোনো সদস্য এতে আক্রান্ত থাকে। সাধারণত এটি ৩০ থেকে ৫০ বছর বয়সের মধ্যে বেশি দেখা গেলেও, যে কোনো বয়সেই হতে পারে।
বর্তমানে আধুনিক চিকিৎসার মাধ্যমে সোরিয়াটিক আর্থ্রাইটিস অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। চিকিৎসকরা সাধারণত ব্যথা ও ফোলাভাব কমানোর জন্য নন-স্টেরয়েডাল অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি ওষুধ, রোগের অগ্রগতি ধীর করার জন্য ডিজিজ মোডিফায়িং অ্যান্টি-রিউম্যাটিক ওষুধ এবং নির্দিষ্ট রোগ-প্রতিরোধ অবস্থা বিবেচনায় বায়োলজিক থেরাপি গ্রহণের পরামর্শ দিয়ে থাকেন। তবে কিছু ক্ষেত্রে ব্যথাযুক্ত জয়েন্টে ইনজেকশন দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।
সহজ কিছু যত্ন, যেমন–নিয়মিত হালকা ব্যায়াম, ওজন নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, ধূমপান পরিহার ইত্যাদি সোরিয়াটিক আর্থ্রাইটিসের মতো রোগ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সকালে হালকা গরম সেঁক দিলে ব্যথা ও শক্তভাব কিছুটা কমে। তবে অতিরিক্ত তাপ ব্যবহার করা উচিত নয়। এই রোগ সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি। ফলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে চিকিৎসা দীর্ঘসময় ধরে চালিয়ে যেতে হয়, এমনকি উপসর্গ কমে গেলেও। ব্যথার কারণে অনেকেই চলাফেরা বা ব্যায়াম এড়িয়ে যেতে চান, কিন্তু এতে উল্টো জয়েন্ট আরও শক্ত ও পেশি দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। তাই রোগের প্রতি বিশেষ খেয়াল ও যত্নশীল হওয়া উচিত। তবে যে কোনো রোগ প্রতিরোধে সচেতনতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কারণ সঠিক সময়ে শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা শুরু করলে অধিকাংশ রোগীই স্বাভাবিকভাবে জীবনযাপন করতে পারেন।
যদি কারও সোরিয়াসিস থাকে এবং এর সঙ্গে জয়েন্টে ব্যথা, ফোলা বা শক্তভাব দেখা দেয়, তাহলে দেরি না করে দ্রুত রিউমাটোলজিস্টের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
[কনসালট্যান্ট-রিউমাটোলজি, এভারকেয়ার
হসপিটাল ]
- বিষয় :
- রোগ
