ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

উচ্চ রক্তচাপ: লক্ষণ ও ঝুঁকি

উচ্চ রক্তচাপ: লক্ষণ ও ঝুঁকি
×

  ডা. রোহিত খান

প্রকাশ: ১২ মে ২০২৬ | ০৭:০১

| প্রিন্ট সংস্করণ

বর্তমান বিশ্বে উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন একটি নীরব ঘাতক হিসেবে পরিচিত। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী প্রায় ১৫০ কোটি মানুষ এই সমস্যায় ভুগছেন। একসময় ধারণা করা হতো যে উচ্চ রক্তচাপ কেবল বয়স্কদের রোগ। এই সময়ে জীবনযাত্রার পরিবর্তনের ফলে অল্প বয়সীদের মধ্যেও এই প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। বিশেষ করে শহুরে জীবনে শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, মানসিক চাপ এবং অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাসের কারণে শহরের মানুষ এ সমস্যায় বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। পুরুষ ও নারী উভয়ের মধ্যেই উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি রয়েছে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নারীর ঝুঁকিও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।

উচ্চ রক্তচাপ ও এর পরিমাপ
হৃৎপিণ্ডের ধমনিতে রক্তপ্রবাহের চাপ যখন স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি থাকে, তখন তাকে উচ্চ রক্তচাপ বলা হয়। রক্তচাপ সাধারণত দুটি মানের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। ওপরের মানটিকে বলা হয় সিস্টোলিক প্রেশার, যা হৃৎপিণ্ড সংকুচিত হওয়ার সময় রক্তনালিতে সৃষ্ট চাপকে বোঝায়। নিচের মানটিকে বলা হয় ডায়াস্টলিক প্রেশার, যা হৃৎপিণ্ডের প্রসারণ বা দুটি স্পন্দনের মধ্যবর্তী সময়ের চাপকে নির্দেশ করে। একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের আদর্শ রক্তচাপ সাধারণত ১২০/৮০ মিলিমিটার মার্কারি ধরা হয়। যদি কারও রক্তচাপ নিয়মিতভাবে ১৪০/৯০ বা এর বেশি থাকে, তবে তাকে উচ্চ রক্তচাপের রোগী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অন্যদিকে, রক্তচাপ যদি ৯০/৬০ বা এর নিচে থাকে, তবে তাকে নিম্ন রক্তচাপ বা লো ব্লাডপ্রেশার বলা হয়। বয়স, শারীরিক অবস্থা এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যগত কারণে এই মানে কিছুটা তারতম্য হতে পারে।

অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপের জটিলতা
উচ্চ রক্তচাপের সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো এটি শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোকে ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত করে। দীর্ঘদিন রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে না থাকলে হৃৎপিণ্ডের পেশি দুর্বল হয়ে যেতে পারে এবং একপর্যায়ে হৃৎপিণ্ড রক্ত পাম্প করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলতে পারে, যাকে হার্ট ফেইলিউর বলা হয়। এছাড়া রক্তনালির দেয়াল শক্ত বা সংকুচিত হয়ে যাওয়ার ফলে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। উচ্চ রক্তচাপ কিডনির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে, যার ফলে কিডনি বিকল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। মস্তিষ্কের রক্তনালি ছিঁড়ে যাওয়া বা রক্তক্ষরণের মাধ্যমে স্ট্রোক হওয়ার ঝুঁকিও অনেক বেশি থাকে। এমনকি চোখের রেটিনায় রক্তক্ষরণ হয়ে দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে উচ্চ রক্তচাপের নির্দিষ্ট কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে প্রাইমারি বা এসেনশিয়াল হাইপারটেনশন বলা হয়।

নীরব ঘাতকের উপস্থিতি ও শনাক্তকরণ
উচ্চ রক্তচাপকে নীরব ঘাতক বলা হয়। কারণ অনেক ক্ষেত্রে এর কোনো প্রাথমিক লক্ষণ প্রকাশ পায় না। লক্ষণ না থাকলেও এটি শরীরের ভেতরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোর ক্ষতি করতে থাকে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর ঝুঁকিও বেড়ে যায়। তাই ৪০ বছর বয়সের পর প্রত্যেকেরই নিয়মিত বিরতিতে রক্তচাপ পরীক্ষা করা উচিত। যারা ইতোমধ্যে উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন, তাদের নিয়মিত রক্তচাপ পরিমাপ করা জরুরি। তবে কেবল এক দিন রক্তচাপ বেশি হলেই কাউকে রোগী বলা যায় না। ভিন্ন ভিন্ন সময়ে একাধিকবার রক্তচাপ পরিমাপে মান বেশি পাওয়া গেলে চিকিৎসক উচ্চ রক্তচাপ নির্ণয় করেন।

সাধারণ লক্ষণ
যদিও উচ্চ রক্তচাপের নির্দিষ্ট কোনো লক্ষণ সবসময় দেখা যায় না, তবুও কিছু উপসর্গ দেখা দিলে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন–
l প্রচণ্ড মাথাব্যথা এবং মাথা ভারী লাগা।
lঘন ঘন মাথা ঘোরা বা ভারসাম্যহীনতা অনুভব করা।
l ঘাড়ের পেছনের দিকে ব্যথা হওয়া।
lবমি বমি ভাব বা বমি হওয়া।
l অল্প পরিশ্রমেই হাঁপিয়ে ওঠা।
lঅতিরিক্ত রাগ বা অস্থিরতা অনুভব করা।
l রাতে গভীর ঘুম না হওয়া।
l কানের ভেতরে শোঁ শোঁ শব্দ হওয়া।
lশরীরের কোনো অংশ কাঁপতে থাকা বা সাময়িকভাবে জ্ঞান হারিয়ে ফেলা।
উচ্চ রক্তচাপের কারণ ও ঝুঁকি
উচ্চ রক্তচাপের পেছনে বিভিন্ন শারীরিক ও পরিবেশগত কারণ কাজ করে–
l বয়স বৃদ্ধি, বিশেষ করে ৪০ বছরের পর ঝুঁকি বেড়ে যাওয়া।
l অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা।
l বংশগত প্রভাব বা পরিবারে উচ্চ রক্তচাপের ইতিহাস থাকা।
l শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা এবং নিয়মিত ব্যায়ামের অভাব।
l খাবারে অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ। প্রতিদিন ৬ গ্রামের বেশি লবণ গ্রহণ উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়ায়।
lধূমপান, তামাকজাত দ্রব্য সেবন এবং অতিরিক্ত ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় গ্রহণ।
l দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ ও অনিদ্রা।
lঅতিরিক্ত চর্বিযুক্ত ও অস্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ।

প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের উপায়
সঠিক জীবনযাপন এবং নিয়মিত চিকিৎসার মাধ্যমে উচ্চ রক্তচাপ কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। এজন্য নিচের বিষয়গুলো মেনে চলা জরুরি–
l লবণের ব্যবহার সীমিত করতে হবে এবং পাতে কাঁচা লবণ খাওয়ার অভ্যাস ত্যাগ করতে হবে।
l ধূমপান, মদ্যপান এবং তামাকজাত দ্রব্য সম্পূর্ণ পরিহার করতে হবে।
l শরীরের উচ্চতা অনুযায়ী আদর্শ ওজন বজায় রাখতে হবে।
lপ্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট দ্রুত হাঁটা বা হালকা ব্যায়াম করা উচিত।
l অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা ও মানসিক চাপ কমাতে হবে। প্রয়োজনে যোগব্যায়াম বা বিনোদনমূলক কাজে অংশ নেওয়া যেতে পারে।
l চর্বিযুক্ত ও কোলেস্টেরলসমৃদ্ধ খাবার কম খেতে হবে।
l প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণে তাজা ফলমূল, শাকসবজি ও আঁশযুক্ত খাবার গ্রহণ করতে হবে।
l চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কখনও উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ বন্ধ করা উচিত নয়।
উচ্চ রক্তচাপ পুরোপুরি নির্মূল না হলেও সঠিক জীবনযাপন, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবনের মাধ্যমে এটি কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। সচেতনতা ও নিয়ম মেনে চললে দীর্ঘদিন সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন করা যায়। 
[বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক] 

আরও পড়ুন

×