জ্বর: ডেঙ্গু না অন্য ভাইরাসজনিত সংক্রমণ
ছবিটি জেমিনি এআই দিয়ে বানানো হয়েছে
ডা. আব্দুল্লাহ শাহরিয়ার
প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৪৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
বর্ষা ও ঋতু পরিবর্তনের সময়ে জ্বর, সর্দি-কাশি, শরীর ব্যথা কিংবা দুর্বলতার মতো উপসর্গ নিয়ে অনেক মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়েন। ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, ইনফ্লুয়েঞ্জা, হাম, রেসপিরেটরি সিনসাইটিয়াল ভাইরাস বা আরএসভি এবং অন্যান্য শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণেও জ্বর হতে পারে। সমস্যা হলো, এসব রোগের প্রাথমিক কিছু উপসর্গ একে অপরের সঙ্গে মিলে যায়। ফলে শুধু জ্বর হয়েছে বলেই রোগের কারণ নিশ্চিত করা যায় না। প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ এবং উপযুক্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে রোগের কারণ নির্ণয় করা জরুরি।
ডেঙ্গুতে জ্বরের সঙ্গে শরীর ব্যথা
বাংলাদেশসহ গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে ডেঙ্গু একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা। এডিস মশার কামড়ের মাধ্যমে ডেঙ্গু ভাইরাস মানুষের শরীরে ছড়ায়। আক্রান্ত মশার কামড়ের সাধারণত ৪ থেকে ১০ দিন পর উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
ডেঙ্গুতে সাধারণত হঠাৎ উচ্চ জ্বরের সঙ্গে তীব্র মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, পেশি ও জয়েন্টে ব্যথা, বমি বমি ভাব এবং ত্বকে র্যাশ দেখা দিতে পারে। তবে শুধু উপসর্গ দেখে নিশ্চিতভাবে ডেঙ্গু শনাক্ত করা যায় না। জ্বর হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা জরুরি–জ্বর কমে গেলে যে রোগী পুরোপুরি বিপদমুক্ত হয়েছেন, তা নয়। অনেক ক্ষেত্রে জ্বর কমার সময় বা পরবর্তী সময়ে রোগের গুরুতর পর্যায় শুরু হতে পারে। তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, দ্রুত শ্বাস নেওয়া, নাক বা মাড়ি থেকে রক্তপাত, বমি বা পায়খানায় রক্ত, অস্বাভাবিক দুর্বলতা, অস্থিরতা কিংবা ত্বক ঠান্ডা ও ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে।
চিকুনগুনিয়ায় বেশি হয় জয়েন্টের ব্যথা
চিকুনগুনিয়াও এডিস মশাবাহিত ভাইরাসজনিত রোগ। সাধারণত হঠাৎ জ্বরের সঙ্গে তীব্র জয়েন্টের ব্যথা এ রোগের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এর পাশাপাশি পেশিতে ব্যথা, মাথাব্যথা, ক্লান্তি, বমি বমি ভাব এবং ত্বকে র্যাশ হতে পারে।
অনেকের ক্ষেত্রে জ্বর কয়েক দিনের মধ্যে কমে গেলেও জয়েন্টের ব্যথা দীর্ঘ সময় ধরে থাকতে পারে। ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার উপসর্গের মধ্যে বেশ কিছু মিল থাকায় শুধু লক্ষণ দেখে দুটি রোগের মধ্যে পার্থক্য করা কঠিন হতে পারে। তাই সন্দেহ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ।
ইনফ্লুয়েঞ্জায় হঠাৎ জ্বর ও কাশি
ইনফ্লুয়েঞ্জা বা ফ্লু একটি সংক্রামক শ্বাসতন্ত্রের ভাইরাসজনিত রোগ। সাধারণত হঠাৎ জ্বর, কাশি, মাথাব্যথা, গলাব্যথা, নাক দিয়ে পানি পড়া এবং পেশি বা শরীর ব্যথা হতে পারে। কারও কারও ক্ষেত্রে ক্লান্তি
ও দুর্বলতাও দেখা যায়
অনেক সুস্থ মানুষ কয়েক দিন থেকে প্রায় এক সপ্তাহের মধ্যে সুস্থ হয়ে ওঠেন। তবে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী এবং দীর্ঘমেয়াদি কিছু রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের গুরুতর অসুস্থতা ও জটিলতার ঝুঁকি বেশি।
ইনফ্লুয়েঞ্জা শুধু শীতকালেই হঢ–এমন ধারণা ঠিক নয়। উষ্ণ ও গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলেও বছরের বিভিন্ন সময়ে ইনফ্লুয়েঞ্জার সংক্রমণ হতে পারে।
শিশুদের ক্ষেত্রে আরএসভি নিয়ে সতর্কতা
রেসপিরেটরি সিনসাইটিয়াল ভাইরাস বা আরএসভি সাধারণত সর্দি-কাশির মতো উপসর্গ তৈরি করে। নাক দিয়ে পানি পড়া, নাক বন্ধ হওয়া, কাশি, হাঁচি ও জ্বর হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে শ্বাস নেওয়ার সময় সাঁই সাঁই শব্দও শোনা যায়।
অধিকাংশ ক্ষেত্রে আরএসভি সংক্রমণ মৃদু থাকে এবং নিজে থেকে ভালো হয়ে যায়। তবে অতি অল্পবয়সী শিশু, বয়স্ক বা অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে সংক্রমণ গুরুতর হতে পারে। এতে ব্রঙ্কিওলাইটিস বা নিউমোনিয়ার মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে।
শিশুর শ্বাসকষ্ট, দ্রুত শ্বাস নেওয়া, পর্যাপ্ত পানি বা দুধ পান করতে না পারা, প্রস্রাব কমে যাওয়া, অস্বাভাবিক নিস্তেজ হয়ে যাওয়া কিংবা উপসর্গ দ্রুত খারাপ হলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।
হামেও জ্বর গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ
হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি ভাইরাসজনিত রোগ। সাধারণত উচ্চ জ্বরের সঙ্গে কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া, চোখ লাল হওয়া ও পানি পড়ার মতো উপসর্গ দেখা দেয়। কয়েক দিন পর মুখ ও ওপরের ঘাড়ের দিক থেকে র্যাশ শুরু হয়ে ধীরে ধীরে শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়তে পারে। হামের সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধের উপায় হলো টিকাদান। টিকা না নেওয়া বা অসম্পূর্ণ টিকাপ্রাপ্ত শিশুদের গুরুতর অসুস্থতা ও জটিলতার ঝুঁকি বেশি। নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, পানিশূন্যতা এবং মস্তিষ্কে প্রদাহসহ বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিতে পারে।
জ্বর হলে কী করবেন?
জ্বর হলে নিজে থেকে অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করা উচিত নয়। কারণ ডেঙ্গু, ইনফ্লুয়েঞ্জা, হাম, চিকুনগুনিয়া ও আরএসভির মতো অনেক রোগ ভাইরাসজনিত এবং অ্যান্টিবায়োটিক ভাইরাসের বিরুদ্ধে কাজ করে না। রোগীর উপসর্গ, বয়স, শারীরিক অবস্থা এবং সম্ভাব্য সংক্রমণের ধরন বিবেচনা করে চিকিৎসক প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা নির্ধারণ করতে পারেন।
জ্বরের সময় পর্যাপ্ত তরল পান করা, বিশ্রাম নেওয়া এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী জ্বর নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করা জরুরি। ডেঙ্গুর সন্দেহ থাকলে বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হবে। রক্তপাত, তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, শ্বাসকষ্ট, অস্বাভাবিক দুর্বলতা বা অন্য কোনো গুরুতর সতর্কসংকেত দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সব জ্বর ডেঙ্গু নয়, আবার সব জ্বর সাধারণ ভাইরাসজনিতও নয়। একই ধরনের উপসর্গ বিভিন্ন রোগে দেখা দিতে পারে। তাই জ্বরকে অবহেলা না করে উপসর্গের ধরন বুঝে এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে রোগের কারণ নির্ণয় করা জরুরি।
পাশাপাশি হাত পরিষ্কার রাখা, অসুস্থ ব্যক্তির সংস্পর্শে সতর্ক থাকা, কাশি-হাঁচির সময় শিষ্টাচার মেনে চলা, এডিস মশার বংশবিস্তার রোধ করা এবং শিশুদের নিয়মিত টিকাদান নিশ্চিত করার মাধ্যমে এসব সংক্রমণের ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
[লেখক: বিভাগীয় প্রধান, শিশু কার্ডিওলজি বিভাগ, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল]
- বিষয় :
- জ্বর