দুর্গোৎসবের স্মৃতি ও সম্প্রীতি
মতিন রায়হান
মতিন রায়হান
প্রকাশ: ০১ অক্টোবর ২০২৫ | ০৬:২৫ | আপডেট: ০১ অক্টোবর ২০২৫ | ১৪:১৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
দুর্গা পূজার প্রসঙ্গ এলেই শৈশবে ফিরে যেতে হয়; তাও ৪০/৪৫ বছর আগের কথা। আমার জন্মগ্রাম কোরবানপুর ছিল কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার হিন্দুপ্রধান গ্রাম। প্রায় নিস্তরঙ্গ গ্রামজীবনে সন্ধ্যা হলেই কুপি কিংবা হারিকেনের আলোয় অন্ধকার তাড়াতে হতো। সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গে শঙ্খ-কাঁসার ধ্বনি। ছড়িয়ে পড়ত আজানের সুমধুর ধ্বনিও। প্রাইমারি স্কুল, হাই স্কুল, বাজার, ইউনিয়ন পরিষদ- সবমিলিয়ে আদর্শ গ্রাম। সম্প্রদায়-সম্প্রীতিও চোখে পড়ার মতো। দুর্গাপূজার দিনগুলোতে হৃৎসম্পর্কটি আরও নিবিড় ও ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠত।
আজ বিশেষভাবে মনে পড়ছে সহপাঠী বন্ধুদের কথা: রণজিৎ, সঞ্জিত, বিমল, উত্তম, তরুণ, তাপস, ননীর কথা। পূজা মানেই স্কুল ছুটি। প্রায় প্রতিদিন বিকেলবেলা বন্ধুরা দল বেঁধে গ্রামের পূজামণ্ডপ ঘুরে ঘুরে দেখতাম কাদের প্রতিমা বেশি সুন্দর। স্কুলে ভালো ছাত্র আর বাবা স্কুলশিক্ষক ছিলেন বলেই সব বাড়িতে জুটত বিশেষ সমাদর। কোনো বাড়িতে গিয়ে মিষ্টি না খেয়ে ফেরা যেত না। শারদীয় দুর্গাপূজা মানেই শরৎকাল আর চারদিকে থইথই বর্ষার জল। বিজয়া দশমীর দিনে গ্রামের বাজারে আয়োজন হতো প্রতিমা প্রতিযোগিতা। আমাদের গ্রাম ছাড়াও আশপাশের দেওড়া, ডালপা, ইষ্টগ্রাম, খোশঘর, হাটাশ, চাপৈর প্রভৃতি গ্রামের দুর্গা প্রতিমাও আসত। এই আনন্দ-উৎসবকে কেন্দ্র করে আগেই গঠন করা হতো বিজয়া উৎসব পরিচালনা কমিটি; সেখানে থাকতেন হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা। বিপুল মানুষের উপস্থিতিতে গমগম করত।
এই উৎসবকে কেন্দ্র করে বাজারে বসত বিচিত্র পসরার মেলা। কয়েক মাইল দূরের কুটি বাজারের ময়রারা মিষ্টি নিয়ে বসতেন। ভ্রাম্যমাণ দোকানে রসগোল্লা, কালোজাম, আমিত্তির ম-ম ঘ্রাণ। কড়াইয়ে ভাজা হচ্ছে গরম জিলাপি। কুটি বাজার থেকে আসা রশিদের পিঁয়াজু, ডালের বড়ার কথাও মনে পড়ছে। খেলনাসহ মনোহারী পসরা সাজিয়ে বসতেন অনেক দোকানি। ধূপ-ধুনার গন্ধ, ঢাক-ঢোলের বৃন্দবাদন, বাঁশি-সানাইয়ের অপূর্ব সুরলহরি অন্যরকম পরিবেশ তৈরি করত। উৎসব পরিচালনা কমিটি পুরস্কারের জন্য প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অর্জনকারী প্রতিমা নির্বাচন করতেন। প্রথম স্থান পাওয়া প্রতিমার জন্য পুরস্কার বড় টেলিভিশন, দ্বিতীয় স্থানের জন্য ছোট টেলিভিশন ও তৃতীয় স্থানের জন্য টেপ রেকর্ডার। আর সান্ত্বনা পুরস্কার হিসেবে অংশগ্রহণকারী সবাইকে দেওয়া হতো দেয়াল ঘড়ি। পুরস্কার থেকে বাদ যেতেন না ঢাক-ঢোল আর বাঁশি শিল্পীরাও। এই উৎসবে অংশ নেওয়া অধিকাংশ প্রতিমার কারিগর ছিলেন নবীনগরের ভোলাচং গ্রামের পাল সম্প্রদায়ের শিল্পীরা।
খোঁজ নিয়ে জেনেছি, বিজয়া দশমীকে কেন্দ্র করে আনন্দ-আয়োজনটি বন্ধ হয়ে গেছে বছর পনেরো আগে। তবে আমাদের গ্রামে এখনও দুর্গোৎসব উদযাপিত হচ্ছে। গ্রামবাসী মিলে বাজারের উত্তরপাশের কালীমন্দিরে আয়োজন করছেন সর্বজনীন দুর্গোৎসব।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হয়তো বদলে গেছে দুর্গোৎসবের ধরনও। গ্রামবিচ্ছিন্ন এই নগরজীবনে বসে এখনও কল্পনায় সেই ফেলে আসা দিনের ছবি আঁকি। দেখি, বন্ধুদের প্রিয় মুখগুলো সম্প্রীতির আলোয় কী উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে! আজও কায়মনে প্রার্থনা, এই সদ্ভাব-সম্প্রীতির আলো ছড়িয়ে পড়ুক ঘরে ঘরে। মানুষে মানুষে রচিত হোক প্রীতি-প্রেমের কাঙ্ক্ষিত বন্ধন। ক্ষুধা-জরা আর যুদ্ধবিধ্বস্ত পৃথিবী ঘুরে দাঁড়াক মানবমিলনের মহামন্ত্রে। জয় হোক মানুষের, মানবতার।
মতিন রায়হান: কবি
- বিষয় :
- শারদীয় দুর্গাপূজা
- দুর্গাপূজা
- পূজা মণ্ডপ
