ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

দুর্গাপূজার সংস্কৃতি ও রাজনীতি

দুর্গাপূজার সংস্কৃতি ও রাজনীতি
×

ঈশিতা দস্তিদার

ঈশিতা দস্তিদার

প্রকাশ: ০১ অক্টোবর ২০২৫ | ০৬:২৮ | আপডেট: ০১ অক্টোবর ২০২৫ | ১৪:১২

| প্রিন্ট সংস্করণ

ষোড়শ শতকে মোগল সম্রাট আকবরের শাসনামলে রাজশাহীর এক সামন্ত রাজা কংস নারায়ণ যখন সাড়ম্বরে শারদীয় দুর্গাপূজা উদযাপন শুরু করেন, তখন বাংলা অঞ্চলে হিন্দু সমাজ গোত্র-বর্ণ দ্বন্দ্বে প্রবলভাবে বিভক্ত। দুর্গাপূজার সার্বজনীন উৎসবে পূজায় বৈশ্য-শূদ্রের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। অন্য ধর্মাবলম্বীর উপস্থিতি তো অকল্পনীয়। বিত্তবান শ্রেণির মানুষ পূজার মূল আয়োজক হতো, ব্রাহ্মণ সমাজের বাইরের হিন্দু সমাজ মূলত দর্শকের ভূমিকা পালন করত। 

এ ছাড়া দুর্গাপূজার আয়োজনের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল জমিদারদের আভিজাত্য, বংশমর্যাদা। পাশাপাশি থাকা জমিদারির পারস্পরিক রেষারেষি, প্রতিযোগিতার ছাপও দেখা যেত পূজাকে ঘিরে। সেটা প্রতিমা তৈরি থেকে, মণ্ডপের সাজসজ্জার আতিশয্যে যেমন টের পাওয়া যেত, তেমনি ব্রিটিশ প্রশাসকদের পূজামণ্ডপ দেখিয়ে পেটপুজো ও উপঢৌকনে তুষ্ট করার অভিপ্রায়ও দেখা যেত।

ক্রমে সমাজের ব্যবসায়ীরাও দুর্গাপূজার আয়োজনে যুক্ত হতে শুরু করেন এবং পূর্ববাংলায় দুর্গাপূজার একটা চল দাঁড়িয়ে যায়। পশ্চিমবঙ্গেও ধীরে ধীরে বিস্তৃতি লাভ করে শারদীয় দুর্গোৎসব। প্রথম দিকে পরিবারকেন্দ্রিক থাকলেও উনিশ-বিশ শতকে এসে দুর্গাপূজার আয়োজন সার্বজনীন হয়ে ওঠে। বিশেষত ব্রিটিশ শাসনের অবসান ও জমিদারি প্রথার বিলুপ্তির পর এ উৎসব সর্বসাধারণের স্তরে নেমে আসে। ধনবান ও কুলিনদের আধিপত্য ভেঙে দুর্গাপূজা হয়ে ওঠে সর্বজনের মহাউৎসবে।

যে আসরে একসময় শূদ্র-বৈশ্যদের প্রবেশাধিকার ছিল না, এখন সেখানে তাদের পাশাপাশি হতদরিদ্র মুটেমজুর, কৃষকশ্রেণিও উৎসবের অংশীদার হয়ে উঠেছে। অন্যান্য বিশ্বাসের মানুষও পরোক্ষভাবে যুক্ত হচ্ছে। মন্দিরের বাইরে মাঠে-ময়দানে, হাটে-বাজারেও ছড়িয়ে পড়েছে উৎসব। একক অর্থায়নের জায়গায় চাঁদা তুলে পূজার আয়োজন শুরু হয়েছে অনেক আগেই।

দুর্গাপূজা ঘিরে বাংলার শিল্প ও সংস্কৃতিও বিকশিত হয়েছে। পূজার সময় আশপাশে ছোট-বড় মেলায় বাংলার কুটির শিল্প, গান, যাত্রাপালা ইত্যাদি সাংস্কৃতিক চর্চাও বিস্তার লাভ করেছে। ষাট ও সত্তরের দশকে কলকাতায় বাংলা গানের প্রসিদ্ধি ঘটেছিল শারদীয় দুর্গোৎসব ঘিরে। প্রতিষ্ঠিত সংগীত পরিচালক ও শিল্পীদের ‘পূজার গান’ শোনার অপেক্ষায় থাকত ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব বাঙালি। 

দেশভাগ-পরবর্তী সময়ে দুই বাংলায় দুর্গাপূজার আয়োজনে ফারাক থাকলেও অসাম্প্রদায়িক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক চর্চার প্রচেষ্টা দেখতে পাওয়া যেত। পূজা-সম্মিলনী অনুষ্ঠানে পাড়ায় পাড়ায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সর্বধর্ম সম্মিলনের আবহ তৈরি হতো। নব্বই দশকে চট্টগ্রামে বেড়ে ওঠার সুবাদে এমন অনেক স্মৃতি মনে পড়ে। একদিকে দুর্গাপূজা আসছে, অন্যদিকে পাড়ায় পাড়ায়  চলছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের রিহার্সেল, পাড়ার স্টার শিল্পীরা নিচ্ছেন প্রস্তুতি, নাটকের দলগুলোর চলছে মহড়া। সেসবে ছিল না ধর্ম-সম্প্রদায়ের বিভেদ, আমাদের মননে তখনও ছিল অন্তর্ভুক্তিমূলক আকাঙ্ক্ষা। তখন কাউকে বলতে শুনিনি রবীন্দ্রসংগীত ‘পূজার গান’।

পরবর্তী বছরগুলোয় চট্টগ্রামের পাড়া-মহল্লায় ঈদ পুনর্মিলনীর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন ও সম্মিলনেও ছিল সাম্প্রদায়িক মানসিকতাকে অতিক্রমের প্রচেষ্টা। রবীন্দ্রনাথ, নজরুলের গানের পাশাপাশি পল্লিগীতি, আধুনিক বাংলা গানের আসরের শেষাংশ জুড়ে থাকত ব্যান্ডদলের পরিবেশনা। প্রতিযোগিতা চলত কোন পাড়া কত ভালো আয়োজন করেছে, কোন শিল্পী কত ভালো গেয়েছেন।

বাঙালির সামাজিক-সাংস্কৃতিক জীবন তখনও ধর্মীয় বা শাস্ত্রীয় সংকীর্ণতার গণ্ডিতে আবদ্ধ হয়ে যায়নি। পরবর্তীকালে শারদীয় দুর্গোৎসব জাঁকজমকপূর্ণ ও ঝলমলে রঙে আবির্ভূত হয়েছে বটে, সুর কেটেছে বারবার। মহালয়ার আগেই মূর্তি ভাঙা শুরুর মধ্য দিয়ে আমরা জেনে যাই পূজা আসছে। যে উৎসব সব মানুষের সম্মিলনের আবহ তৈরি করেছিল, তা আজ কেবলই ‘হিন্দুদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব।’ 

মনে পড়ে ১৯৯২ সালে ভারতে বাবরি মসজিদ ভাঙার পরবর্তী দিনগুলোর কথা। সেবার পূজায় আড়ম্বর প্রত্যাহার করা হয়েছিল। গানও বাজেনি, ছিল না সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। আমাদের গৃহকর্মী মমতাজ বিকেলবেলা এসে উপস্থিত। বাসায় থাকা অনিরাপদ বলে সবাইকে ওদের কলোনির এক রুমের ভাড়াঘরে নিয়ে যাবে। সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রতিবেশীর সমব্যথী ভূমিকা বাংলাদেশের ভগ্নপ্রায় হিন্দু সমাজকে এভাবে বারবার আশাবাদী করেছে। যদিও স্বাধীনতার পরের বছর ১৯৭২ সালেই অষ্টমী পূজার দিন সারাদেশে একযোগে পূজামণ্ডপ আক্রান্ত হয়েছিল।

এরপর ১৯৭৯ সালে পঞ্চম সংশোধনীতে সংবিধান থেকে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ বাদ এবং ১৯৮৮ সালের জুনে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা এ দেশের হিন্দু সমাজকে ক্রমাগত বিপন্ন করেছে। রাষ্ট্রীয় অবস্থানের সংকট ও কাঠামোগত অসমতার ছাপ স্পষ্ট হয়েছে সংখ্যাগুরুর মানসপটেও; যা বিপদগ্রস্ত করেছে সংখ্যালঘু সমাজকে। অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত একবার বলেছিলেন, সংখ্যালঘুরা দেশত্যাগ করছে না; তাদের দেশত্যাগে বাধ্য করা হচ্ছে। ১৯৭৫ সালের পর সাংবিধানিক পরিবর্তনের মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ বাঙালি জাতিকে ধর্মের নামে বিভক্ত করা হয়েছে। হিন্দুদের রাষ্ট্রীয় সংখ্যালঘুতে পরিণত করা হয়েছে। হিন্দুরা পাকিস্তান আমলে সমনাগরিকত্ব পায়নি, স্বাধীন বাংলাদেশেও তারা একই পরিস্থিতির শিকার (দৈনিক আমাদের সময় ৩০ মার্চ, ২০২৪)।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরাচার পতনের পরও গত এক বছরে ঘটমান সহিংসতা ৮ শতাংশ হিন্দু সমাজের পাশাপাশি সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের জীবনও সংকটময় করে তুলেছে। উৎসব উদযাপনের জন্য শুধু নয়, বরং স্বাভাবিক জীবনযাপনের জন্য নাগরিক নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা এখন সংখ্যালঘু ও সংখ্যাগুরু সমাজের প্রথম দাবি। 

‘আসুরিক শক্তির বিনাশসাধন এবং শুভশক্তির জয় উদযাপন’ যদি দুর্গাপূজার মূল মন্ত্র হয়, তবে শারদীয় দুর্গোৎসব সমাজের সব অশুভ শক্তিকে পরাহত করে শুভশক্তিকে সামনে নিয়ে আসুক। উৎসবে আয়োজনে বিভেদ নয়, সম্মিলনই হোক আগামীদিনের পাথেয়।

ড. ঈশিতা দস্তিদার : নৃবিজ্ঞানী

আরও পড়ুন

×