ঢাকা শুক্রবার, ০৩ জুলাই ২০২৬

করোনার প্রভাব

বৈশাখের বাণিজ্য শেষ

বৈশাখের বাণিজ্য শেষ
×

শেখ আবদুল্লাহ

প্রকাশ: ৩১ মার্চ ২০২০ | ১২:৫৯

বাঙালির প্রাণের উৎসব বাংলা নববর্ষ। দলমত ও ধর্মমত নির্বিশেষে পহেলা বৈশাখ এক সর্বজনীন এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনার উৎসব। বাংলা বছরের প্রথম এই দিনটিকে কেন্দ্র করে দেশব্যাপী বর্ণালি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। রঙিন পোশাকে সেজে তরুণ-তরুণীসহ সব বয়সীরা মেতে ওঠেন আনন্দ আয়োজনে। এদিন শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত বসে প্রাণের মেলা। এ উপলক্ষে পোশাক-পরিচ্ছদের পাশাপাশি অন্যান্য খাতের ব্যবসায়ীরা আগে থেকেই প্রস্তুতি নেন। এবারও নিয়েছিলেন। কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে এ বছর নববর্ষ উপলক্ষে ব্যবসায়ীরা যেসব আয়োজন করেছিলেন তা কোনো কাজে লাগছে না। বলা যায় করোনাভাইরাসের আঘাতে বৈশাখের বাণিজ্য শেষ। পহেলা বৈশাখে কোনো জনসমাগম না করার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হয়েছে। এমনকি সামনে ঈদের বাজারও মার খাবে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।
বৈশাখ উপলক্ষে প্রধানত পোশাক-পরিচ্ছদ ও ইলিশের বাজার চাঙা হয়। এর সঙ্গে মিষ্টি, খই-মোয়া, বাতাসার মতো বাঙালির ঐতিহ্যবাহী খাবারের বাজারেও চাহিদা বেড়ে যায়। এসব মিষ্টির জন্য শখের হাঁড়ি বানান কুমোররা। আবার অনেকে বানান বাঁশের ডালি। সারাদেশের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা এ উপলক্ষে হালখাতার আয়োজন করে। সম্প্রতি করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোও একধরনের হালখাতার আয়োজন করে আসছিল। এবারের বৈশাখে এর কোনোটাই আর হচ্ছে না। ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখ। এদিন জনসমাগম এড়িয়ে ডিজিটাল পদ্ধতিতে আনন্দ-উৎসব করার কথা বলা হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে। লোকসমাগম এড়াতে ৯ এপ্রিল পর্যন্ত সরকার টানা ছুটি ঘোষণা করেছে। এরপর শুক্র ও শনিবার সাপ্তাহিক ছুটি। এর পরও করোনা পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে বলে অনেকেই মনে করছেন না।
স্থানীয় বাজারের পোশাক ব্যবসায়ীরা বলছেন, পহেলা বৈশাখ ও ঈদ বিক্রেতাদের কাছে বড় আকর্ষণ। এই দুটি উৎসবকে কেন্দ্র করে সারাবছর প্রস্তুতি চলে। কারণ এ সময় ব্যাপক ব্যবসা হয়। ডিজাইন ও রং ঠিক করে ব্যবসায়ীরা আগে থেকে তৈরি করেন বিশেষ পোশাক। শাড়ি, পাঞ্জাবি, সালোয়ার-কামিজ, বাচ্চাদের জন্য নানা নকশা ও রঙিন পোশাকের আয়োজন থাকে দোকানগুলোতে। এ বছরও ব্যবসায়ীরা প্রস্তুতি শেষ করেছেন। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে শহরের মোড়ে মোড়ে বিলবোর্ড, অনলাইনে বিজ্ঞাপন প্রচার শুরু করা হয়েছে। এ রকম সময়ে দেশে করোনাভাইরাসের আক্রমণে সব আয়োজন মাঠে মারা গেছে।
ছুটির কারণে পহেলা বৈশাখের আগে আর দোকানপাট খোলার ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। আবার মানুষও সতর্কতার জন্য বের হচ্ছে না। অন্যদিকে সবকিছু বন্ধ থাকায় অনেক মানুষের আয় নেই। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মী, নিত্যদিনের কাজের ওপর নির্ভরশীল মানুষ, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সরবরাহকারীদের আয় কমে গেছে অনেক। অনেকের আয় পুরোটাই বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে ঈদ উপলক্ষে কেনাকাটাও কমবে। এটাই স্বাভাবিক বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।
সাদাকালোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ফ্যাশন এন্টারপ্রেনার বাংলাদেশের সাবেক সভাপতি মোহাম্মাদ আবুল কালাম আজাদ সমকালকে বলেন, বৈশাখের বেচাকেনা এ বছর আর হবে না। বৈশাখের বাণিজ্য শেষ। কারণ বৈশাখের আগে দোকানপাট খোলার ব্যবস্থা যেমন নেই, তেমনি বৈশাখের অনুষ্ঠানও হবে না। আর মানুষ যদি কোনো অনুষ্ঠানে অংশ নিতে না পারে, ঘর থেকে বের হতে না পারে, তাহলে পোশাক কিনবে কেন? এ ছাড়া বর্তমান এই করোনা পরিস্থিতিতে মানুষ পোশাক কেনার মনমানসিকতাও হারিয়ে ফেলেছে। সবাই এক ধরনের আতঙ্কের মধ্যে আছে। ফলে বৈশাখের ব্যবসাটা আর হচ্ছে না এ বছর। পাশাপাশি ঈদের বাজারের আশাও ছেড়ে দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। সাধারণত শবেবরাত থেকেই ঈদের বেচাকেনা শুরু হয়। গত কয়েক বছর ধরে শহরের বহু ক্রেতা রোজার আগেই অথবা রমজান মাসের প্রথম সপ্তাহে কেনাকাটা শেষ করে ফেলেন। গরম মৌসুম ও শেষ সময়ের ভিড় এড়াতে এবং সহজে পছন্দের পোশাক বেছে নিতে আগেভাগে বাজার শেষ করেন তারা। এ বছর তা আর হবে বলে মনে হচ্ছে না। সাধারণ ছুটি চলছে। দোকানপাট ও মার্কেট বন্ধ রাখা হয়েছে। মানুষ সতর্ক। ভিড়ের মধ্যে যেতে চাচ্ছে না। ফলে উৎসবকেন্দ্রিক বেচাকেনা নিয়ে এখন আর কেউ ভাবছে না।
দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্র্যান্ড আড়ংয়ের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা আশরাফুল আলম সমকালকে বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে একটি স্থবির অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। তবে দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি হলে ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে। আর তা না হলে পরিস্থিতি কী হবে তা বলা যাচ্ছে না। এর পরিপ্রেক্ষিতে আড়ং সরবরাহকারীদের জন্য একটি প্যাকেজের কথা ভাবছে। যাতে সরবরাহকারীরা আড়ংকে পণ্য সরবরাহ করে মাসিক যে আয় করেন, সেটি যাতে অব্যাহত থাকে। তবে এই প্যাকেজের মডেল, অর্থের পরিমাণ এখনও ঠিক হয়নি। পরিস্থিতি বিবেচনায় এটা ঠিক করা হবে।
দেশের পোশাক ব্যবসায়ীদের সংগঠন ফ্যাশন এন্টারপ্রেইনার বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, সারাদেশে পাঁচ হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠান রয়েছে যারা পোশাক-পরিচ্ছদ বিক্রি করে। এসব প্রতিষ্ঠানের পোশাক তৈরিতে সংযুক্ত আরও কয়েক হাজার মানুষ, যারা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বসে কাজ করছে। সংস্থাটির ধারণা বৈশাখ ও ঈদ উপলক্ষে ব্যবসায়ীরা তিন হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ করে। কাপড়, সেলাই, প্যাকেজিং, পরিবহন, বিজ্ঞাপন, কর্মীদের বেতন-ভাতা বাবদ এ বিনিয়োগ করা হয়। এর মধ্যে সরবরাহকারীদের বিনিয়োগও রয়েছে। করোনাভাইরাসের কারণে এই ব্যাপক বিনিয়োগ আটকে গেল। এসব প্রতিষ্ঠান ও তাদের কর্মীরা অনিশ্চয়তায় পড়েছে। কারণ বৈশাখ উপলক্ষে দোকানগুলোতে পণ্য তোলা হয়েছে। রাজধানীসহ দেশের অন্যান্য বড় শহরের মার্কেটগুলো ও দোকানপাট টানা বন্ধ রয়েছে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া মানুষ ঘর থেকে বের হচ্ছে না। আগামীতে কবে নাগাদ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে অর্থাৎ ক্রেতারা জরুরি প্রয়োজন ছাড়া মার্কেটে আসবেন তাও স্পষ্ট নয়। দোকানগুলোর বেচাকেনা হলেই কর্মীদের বেতন ও সরবরাহকারীদের পাওনা পরিশোধ করেন ব্যবসায়ীরা। ফলে বহুকাল পর এবার পয়লা বৈশাখ উদযাপন হবে না। হলেও ডিজিটাল পদ্ধতিতে কোনো জনসমাগম ছাড়াই।



আরও পড়ুন

×